জিয়াউর রহমান জিয়ার ছক্কাগুলো দেখে বোঝার উপায় ছিল না ম্যাচটি প্রথম শ্রেণির না টি-টোয়েন্টি। অপরাজিত ১৫২ রানের ইনিংসে ১৫টি ছক্কা ! অল্পের জন্য ছোঁয়া হয়নি প্রথম শ্রেণির ম্যাচের বিশ্বরেকর্ডটিও। যদি জানতেন তাহলে টেল এন্ডারে ব্যাট করা মুরাদ খানকে নিশ্চয়ই বাজে শটে আউট হতে দিতেন না। বিশ্বরেকর্ডের কথা তুলতেই জিয়ার মুচকি হাসি । বিষয়টি জানতেন না বলেই একটু চুপ থেকে বললেন, ‘আফসোস নেই। উপরের সারির ব্যাটসম্যানরা ভালো খেললে হয়তো এ ধরনের ইনিংস খেলার সুযোগও হত না। যাই হোক আজ সেটি হয়ে গেছে। আর আমার সাথে যারাই পার্টনারশীপ গড়েছে, তাদের সহযোগিতা না পেলে হয়তো এই ইনিংস খেলার সুযোগও হত না’।
গতকাল বৃহস্পতিবার মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগের (বিসিএল) প্রথম দিনটি ছিল শুধুই জিয়ার। সাত নম্বরে নেমে ব্যাটিংয়ের যে তাণ্ডব তিনি দেখালেন তা যেন অবিশ্বাস্য। ওয়ালটন মধ্যাঞ্চলের বিপক্ষে দিনশেষে ৩৪৩ রান তুলেছে প্রাইম ব্যাংক দক্ষিণাঞ্চল। সেটি সম্ভব হয়েছে জিয়ার অসাধারণ কীর্তির কারণেই। অসাধারণ কীর্তি তো বটেই, ২০১১ সালে ইংল্যান্ডের গ্রায়েম নেপিয়ার ও নিউজিল্যান্ডের জেসি রাইডার এবং ১৯৯৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার এন্ড্রু সায়মন্ডস প্রথম শ্রেণির ম্যাচে ১৬টি ছক্কা মেরে বিশ্বরেকর্ডের আসনে বসে আছেন। কাল সেই রেকর্ডকে প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছিলেন জিয়া। কিন্তু মেহরাব হোসেন জুনিয়রের বাজে বলে মুরাদ ক্যাচ দিয়ে ফিরলে জিয়ার বিশ্বরেকর্ডও ছোঁয়া হয়নি। নবম উইকেটে মুরাদ খানকে সঙ্গে নিয়ে জিয়ার ৯৩ রানের পার্টনারশীপ। এর মধ্যে জিয়ার রানই ৯৩, মুরাদের ০! রান করেননি তবে যে কাজটি করেছেন, তাই দক্ষিণাঞ্চলের জন্য যথেষ্ট ছিল। মুরাদকে সঙ্গে নিয়ে মধ্যাঞ্চলের প্রত্যেক বোলারকে একাধিক ছক্কা মেরেছেন জিয়া। ৮৮ বলে সেঞ্চুরি ও ১১৭ বলে দেড়শ’ রানের কোটা পার করেন তিনি। যে কোন ক্রিকেটে জিয়ার এটিই প্রথম সেঞ্চুরি। তার সাবলীল ব্যাটিংয়ের কাছে মধ্যাঞ্চলের কোন বোলারদেরই কিছু করার ছিল না।
মধ্যাঞ্চলের একমাত্র সফল বোলার মোশাররফ হোসেন রুবেল। ৫২ রানে নিয়েছেন পাঁচ উইকেট, কাল প্রথমদিনের খেলা শেষে স্বীকার করেছেন বাজে বলের কারণে জিয়ার ব্যাট থেকে এতগুলো ছক্কা এসেছে। তিনি বলেন, ‘আসলে জিয়াকে আমরা রান উপহার দিয়েছি। একই জায়গায় বার বার বল ফেলেছি। বোলাররা আসলে ট্র্যাকের বাইরে চলে গিয়েছে। যেটা করার দরকার ছিল সেটা করতে পারেনি। অবশ্যই জিয়া ভালো ব্যাটিং করেছে, কিন্তু আমরা বাজে বল করেছি’।
মূলত মধ্যাঞ্চলের বোলারদের বাজে বল কাজে লাগিয়েছেন জিয়া। আটজন বোলার ব্যবহার করেছে মধ্যাঞ্চল, প্রতিটি বোলারকে একের অধিক ছয় মেরেছেন। তার বেশিরভাগ ছয় এসেছে লং অন ও মিড অনের উপর দিয়ে। তবে মধ্যাঞ্চলের টিম ম্যানেজম্যান্ট ইলিয়াস সানিকে দোষী করতে পারে। মিড উইকেটে জিয়ার ৭৫ রানের সময় সানি ক্যাচ ফেলে দেন। এই একটি লাইফ ছাড়া জিয়ার ১৫২ রানের ইনিংসে কোন বাজে শট ছিল না। ছক্কাগুলো মেরেছেন, সবগুলো বাউন্ডারি রোপের অনেক বাইরে পড়েছে। মোহাম্মদ আশরাফুল দুই-একটি লুজ বল দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন বটে, কিন্তু জিয়া সেই ফাঁদে পা না দিয়ে উল্টো ছক্কা মেরেছেন। তার এই ছক্কা মারার রহস্য কি? জানতে চাওয়া হলে জিয়ার উত্তর, ‘আমি মারার বল হলেই শুধু মারি। এবং যেগুলো মারি সেটা একশ’ভাগ নিশ্চিত হয়েই মারি। ছক্কা মারার কোন রহস্য নেই, অন্যান্য খেলোয়াড়ের মত আমি স্বাভাবিক জিম করি। স্বাভাবিক খাওয়া-দাওয়া করি। এর চেয়ে বেশি কিছু নয়’।
এর আগে সকালে ঘন কুয়াশার কারণে নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা ১৫ মিনিট দেরিতে খেলা শুরু হয়। সকাল সাড়ে দশটায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন বেলুন উড়িয়ে বিসিএলের উদ্বোধন করেন। সকাল থেকে অবশ্য দক্ষিণাঞ্চলের টপ অর্ডাররা রানের জন্য ধুঁকছিল। লাঞ্চের আগে ৬৮ রানে দুই উইকেট হারালেও লাঞ্চের পর প্রথম বলে শাহাদাতের বলে উইকেট কিপারের হাতে ইমরুল কায়েস যেভাবে ক্যাচ তুলে দিলেন তাতে তার ক্রিকেটীয় জ্ঞান নিয়েই কথা উঠতে পারে। ৯১ মিনিট ব্যাট করে ৪২ রানে ফিরে গেছেন তিনি। মো: মিথুনও উইকেটে সেট হয়ে ৯৯ মিনিট ব্যাট করে ৩৭ রানে বিদায় নিয়েছেন। তুষার ইমরান ফিরে গেছেন ৩০ রানে। দক্ষিণাঞ্চল চা-বিরতিতে যায় ৮ উইকেটে ২২৭ রান নিয়ে। এরপর দিনের শেষ সেশনে জিয়ার নান্দনিক শট শুরু। মুরাদ আউট না হলে হয়তো কাল শুধু ছক্কার বিশ্বরেকর্ড নয় আরো কিছু রেকর্ডের মালাও পরতে পারতেন। তবে এতদিন শুধু টি-টোয়েন্টি ব্যাটসম্যানের তকমাটি ছিল তার সাথে। এখন শুধু অপেক্ষা লংগার ভার্সন ক্রিকেটে নিজেকে পরিচিত করা। বিশ্বের অন্যান্য ব্যাটসম্যানের মত জিয়ারও স্বপ্ন টেস্ট ব্যাটসম্যান হতে। কাল সেই স্বপ্ন তিনি লুকাননি। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি ব্যাটসম্যানের মত আমারও স্বপ্ন টেস্ট ব্যাটসম্যান হওয়ার’।
১২ ওভার বাকি থাকলেও দিনশেষে আলো স্বল্পতার কারণে মধ্যাঞ্চল ব্যাট করতে পারেনি।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
প্রাইম ব্যাংক দক্ষিণাঞ্চল প্রথম ইনিংস: ৭৩ ওভারে ৩৪৩/১০ (জিয়া অপরাজিত ১৫২, ইমরুল ৪২, মিথুন ৩৭, তুষার ৩০, রাব্বি ২৫, গাজী ১৫, রুবেল ১৫, এনামুল ১১, মোশাররফ ৫/৫২, শাহাদাত ২/৬৮)।
জহুরুলের ব্যাটিংয়ে উজ্জ্বল উত্তরাঞ্চল
বগুড়া প্রতিনিধি \ বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগের (বিসিএল) উদ্বোধনী দিনের খেলায় গতকাল দারুণ সূচনা করেছে বিসিবি উত্তরাঞ্চল। প্রথম দিন শেষে প্রথম ইনিংসে তাদের সংগ্রহ ৪ উইকেটে ২৯৪ রান। জহুরুল ইসলাম অমি সর্বোচ্চ ৭৯ রান করেন। তাপস বৈশ্য ৪০ রানে নিয়েছেন ৩ উইকেট।
সকালে টসে জিতে ইসলামী ব্যাংক পূর্বাঞ্চল অধিনায়ক অলক কাপালি ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন। ইনিংসের নবম ওভারের তাপস বৈশ্যের প্রথম বলে ব্যক্তিগত ৩ রানে সরাসরি বোল্ড হয়ে যান জুনায়েদ সিদ্দিকী। দলের রান তখন মাত্র ২২। এরপর ফরহাদ হোসেন এসে আরেক ওপেনার অমির সাথে জুটি গড়েন। এই দুইজন লাঞ্চ পর্যন্ত উত্তরাঞ্চলকে ১ উইকেটে ৭২ রান এনে দেন। লাঞ্চের পর অমি ৯৭ বলে ফিফটি করেন। অপরাজিত থাকা ফরহাদ হোসেন হাফ সেঞ্চুরি করেন ৭৬ বলে। এই দুইজনের ১৩১ রানের পার্টনারশিপ ভাঙ্গেন তাপস বৈশ্য।
অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম ও নাঈম ইসলাম। জাতীয় দলের এ দুই অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানের কল্যাণে উত্তরাঞ্চল চা বিরতিতে যায় ৩ উইকেটে ১৭৫ রান নিয়ে। দুর্ভাগ্য মুশফিকের, হাফ সেঞ্চুরি থেকে মাত্র দুই রান দূরে থাকতে এনামুল হক জুনিয়রের স্পিনে কাবু হলেন তিনি। স্পিনের ধাঁধায় পড়ে লেগ বিফোর উইকেট হয়ে মাঠ ছাড়েন জাতীয় দলের অধিনায়ক। সাজঘরে ফেরার আগে নাঈমের সাথে ৮৭ রানের পার্টনারশীপ উপহার দেন জাতীয় দলের অধিনায়ক। মুশফিকের বিদায়ের পর নাসির হোসেনকে সাথে নিয়ে দিন শেষ করেন নাঈম। অভিজ্ঞ এই ব্যাটসম্যান অপরাজিত আছেন ৫৮ রানে। নাসিরের সংগ্রহ ২২। ইসলামী ব্যাংক পূর্বাঞ্চলের পক্ষে তাপস বৈশ্য ৩টি এবং এনামুল হক জুনিয়র ১ উইকেট নেন।
আলো স্বল্পতার কারণে নির্ধারিত ৩ ওভার ৫ বল বাকি থাকতেই দিনের খেলা শেষ হয়। খারাপ আবহাওয়ার কারণে খেলা দেরিতে শুরু হয়েছিল।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
বিসিবি উত্তরাঞ্চল প্রথম ইনিংস: ২৯৪/৪, জহুরুল ৭৯, ফরহাদ হোসেন ৬০, মুশফিকুর রহীম ৪৮, নাঈম ইসলাম ৫৮*, নাসির হোসেন ২২*, তাপস বৈশ্য ৪০/৩।
