স্মৃতিতে ভাস্বর রোকেয়া হল

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:৩৭
এখানে পুকুরটা ছিল। পুকুরের পাশে গাছের গুঁড়ি। গুঁড়িতে বসে সব বান্ধবীরা মিলে আড্ডা দিতাম। মুড়ি-গুড় খেতাম। খুনসুটি করতাম। বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে বিকালজুড়ে আলাপ করতাম। হলের বাইরে কোন বড় আপু ও বান্ধবীদের প্রেমিকরা এসে অপেক্ষা করত। এই নিয়ে চলত হাস্যরস-কৌতুক। আজ এত বছর পর এগুলো শুধুই স্মৃতি। তারপরও প্রায় ৫০ বছর পর হলে এসে মনে হল, এইতো সেদিন ছিলাম এখানে। সারা জীবন যদি এ প্রাঙ্গণে কাটিয়ে দিতে পারতাম।’ কথাগুলো বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের ষাটের দশকের আবাসিক ছাত্রী শামসুন্নাহার চৌধুরী। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী জীবনের নানা স্মৃতি স্মরণ করে কাতর হয়ে পড়েন তিনি। তবে শুধু শামসুন্নাহার চৌধুরী নন, শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের পুনর্মিলনীতে অংশগ্রহণকারী প্রাক্তন ছাত্রীদের সকলেই স্মৃতি কাতর হয়ে পড়েন। আনন্দে মেতে উঠেন সত্তোরোর্ধ্ব থেকে সম্প্রতি ছাত্রত্ব শেষ করা ছাত্রীরা। সকলে মিলে নেচে, গেয়ে, কৌতুকে, কোরাস গানে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আড্ডায় দিনভর মাতিয়ে রাখেন রোকেয়া হল প্রাঙ্গণ। ‘সুবর্ণ স্মৃতির মধুর আনন্দে এসো মিলি মোরা সৃজনী ছন্দে’ এই আহবান জানিয়ে হলের এ দ্বিতীয় পুনর্মিলনীর আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রোকেয়া হল এলামনাই এসোসিয়েশন। শুক্রবার সারাদিন রোদ উঠেনি। তীব্র শীতকে হার মানিয়ে সকাল সাড়ে আটটা থেকেই হল মাঠে ভিড় করতে শুরু করেন প্রাক্তন ছাত্রীরা। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে শুরু হয় পুনর্মিলনীর আনুষ্ঠানিক উত্সব। সম্মাননা প্রদান করা হয় মেহেরুন্নেসা চৌধুরী, বেগম মাকসুদা (মরণোত্তর), এভারেষ্ট বিজয়ী নিশাত মজুমদার ও ওয়াসফিয়া নাজরীনকে। বিশেষ সম্মাননা দেয়া হয় ডাকসু’র প্রথম সভানেত্রী জাহানারা বেগমকে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে হলের প্রাক্তন ছাত্রী ও কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘জীবনের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বলব, অনেক চড়াই উত্রাই পেরিয়ে এ অবস্থায় আসতে হয়েছে। আমার হলের দিনগুলি ছিল বান্ধবীদের সাথে হাসি-কান্না-আনন্দের দিন। আন্দোলনের দিন। ডাকসুর জিএস থাকাকালে আমার হলে প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। এটি তখনকার পাকিস্তানের মোনায়েম-সরকারের নির্দেশে হয়েছিল। তারপরও দমে যাইনি। বাধা পেরিয়ে স্বাধীনতা ও অধিকারের সংগ্রাম করেছি। আমরা সাহস করে বাধা পেরিয়েছি বলেই একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি। তা না হলে দেশ এতদূর এগোতো না।’ অনুষ্ঠানের উদ্বোধক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘অনেক বাধা সত্ত্বেও দেশের অগ্রগতি অর্জনের ও সাফল্যের বড় অংশীদার নারীরা। নারীদের জন্যই দেশ এগিয়ে গেছে। এলামনাই এসোসিয়েশনের উপদেষ্টা অধ্যক্ষা সৈয়দা শামসে আরা হোসেনের সভাপতিত্বে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন এসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক রওশন আরা ফিরোজ, রোকেয়া হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক নাজমা শাহীন, বিশ্ববিদ্যালয়ের এলামনাই এসোসিয়েশনের মহাসচিব রকীবউদ্দীন আহমেদ, রোকেয়া হল এলামনাই এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মরিয়ম বেগম। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা গীতি আরা সাফিয়া বলেন, হলের পুকুর পাড়ে বসে বান্ধবীরা মিলে আড্ডা মারতাম। মুড়ি খেতাম। গলা খুলে গান গাইতাম। দারুণ উচ্ছল ছিল সে দিনগুলি। সংসদ সদস্য বেবী মওদুদ বলেন, আমাদের সময় ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক ছিল অনেক মধুর ও দায়িত্বশীল। এখন সে অবস্থা নেই। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ভাঙে মিলন মেলা।