এ বছর নয়টি ওয়ানডের মধ্যে পাঁচটি জিতেছে বাংলাদেশ। শতকরা ষাট ভাগ সাফল্য, টেস্ট খেলুড়ে কোনো দেশের এ বছর এমন সাফল্য নেই। শুধু তাই নয়, এ বছর বাংলাদেশ যতগুলো ওয়ানডে জয় পেয়েছে সবগুলোই বর্তমান ও সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের বিরুদ্ধে।
তুলনামূলক বিচারে বাংলাদেশ ক্রিকেট ২০১২ সালটি ভালভাবেই পার করেছে। বছরের শুরুটা যেমন ভালো হয়েছে তেমনি শেষটাও। এশিয়া কাপে ইতিহাসের সেরা সাফল্য রানার্স আপ দিয়ে শুরু আর শেষ হলো ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে টেস্ট ও টি-টোয়েন্টিতে না পারলেও ওয়ানডেতে সিরিজ জয় দিয়ে। মাঝখানের সময়টুকুও যে খারাপ কেটেছে তা নয়। দুর্বল স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টি ম্যাচ জিতেছে ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত সংস্করণটির বিশ্বকাপের আগে। সব মিলিয়েই এসব সাফল্যে বছরটি শেষ করায় অধিনায়ক হিসেবে স্বস্তির নিঃশ্বাসই ফেলতে পারছেন মুশফিকুর রহিম। এ বছরে আরো আলোড়ন তোলে ওয়ানডেতে বিশ্বের সেরা ও টেস্টে বিশ্বের দ্বিতীয় সেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের বিয়ে। দশ নম্বরে নেমে টেস্টে আবুল হাসান রাজুর সেঞ্চুরি ও অভিষেক টেস্টে সোহাগ গাজীর নয় উইকেট নেয়া ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটের আশা জাগানিয়া অধ্যায়। ব্যতিক্রমী ঘটনাও আছে বছরটিতে। এর মধ্যে অন্যতম হলো- খেলোয়াড়দের অসদাচরণ, আম্পায়ারদের বিরুদ্ধে ওঠা ম্যাচ পাতানোর অভিযোগ এবং বছরের শুরুতে প্রথমবারের মতো আয়োজিত বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) কোনো কোনো ম্যাচ পাতানো ছিল বলে ওঠা অভিযোগের ঘটনা। এরপরও বলা চলে যে কোনো বিচারে ক্রিকেট ২০১২ সালটি ভালভাবেই কাটিয়েছে।
দেশের মাটিতে এশিয়া কাপ দিয়ে বাংলাদেশ দল ওয়ানডে শুরু করে। পাকিস্তানের কাছে হারলেও মুশফিকুর রহিমের দল এরপর যা করেছে তা রীতিমত স্বপ্নের মতো। ভারত শ্রীলংকার মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের হারিয়ে প্রথমবারের মতো এশিয়া কাপের ফাইনালে নাম লেখায় বাংলাদেশ; কিন্তু দুর্ভাগ্য মুশফিকদের। মাত্র দুই রানে হেরে রানার্স-আপের ট্রফি নিয়েই সান্ত্বনা খুঁজতে হয় তাদের।
ওয়ানডের পালা শেষে টি-টোয়েন্টির বিশ্বকাপের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ গিয়েছে ইউরোপে। এমনকি বিসিবি একাদশ নামে ক্যারিবীয় অঞ্চলে একটি টুর্নামেন্টও খেলতে যায় মুশফিকরা। আয়ারল্যান্ড, স্বটল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ছয় খেলার চারটিতে জিতে টি-টোয়েন্টি র্যাংকিংয়ে তৃতীয় অবস্থানে উঠে এসেছিল স্বাগতিকরা। শেষ ম্যাচটি জিততে পারলে অস্ট্রেলিয়া-ভারতের মতো ক্রিকেট এলিটদের হঠিয়ে র্যাংকিংয়ে এক নম্বর আসনটিও দখলে নিতে পারতো তারা; কিন্তু দুর্ভাগ্য, নেদারল্যান্ডসের কাছে হেরে যায় বাংলাদেশ। ইউরোপীয় অভিজ্ঞতা নিয়ে শ্রীলংকায় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলতে গেলেও নিউজিল্যান্ড ও পাকিস্তানের কাছে হেরে প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নিয়ে দেশে ফিরতে হয় মুশফিকদের।
অবশ্য অচিরেই নিজেদের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ায় মুশফিকরা। ক্যারিবীয়দের বিরুদ্ধে সিরিজটি বাংলাদেশের ক্রিকেটামোদীরা অনেক দিন মনে রাখবে। প্রায় এক বছর পর টেস্ট খেলতে নেমে বাংলাদেশ দল মরণ কামড় দিয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজকে যা সহজে ভুলতে পারবেন না ক্রিস গেইল, মারলন স্যামুয়েলস, ড্যারেন স্যামিরা। গাজীর নয় উইকেটে ক্যারিবিয়ানরা মিরপুর টেস্টে হারতে হারতে বেঁচে যায়। অপরদিকে খুলনা টেস্টে আবুলের সেঞ্চুরিও ক্রিকেট ইতিহাসে খোদাই হয়ে থাকবে। পাঁচ ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজটিও কম নাটকীয় ছিল না। প্রথম দুইটিতে বাংলাদেশ এবং পরের দুইটি ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতে নিলে সিরিজের শেষ ম্যাচটি হয়ে পড়ে নির্ধারণী। বাংলাদেশ সেটাও জিতে ইতিহাস গড়ে রাখল।
এ বছর নয়টি ওয়ানডের মধ্যে পাঁচটি জিতেছে বাংলাদেশ। শতকরা ষাট ভাগ সাফল্য, টেস্ট খেলুড়ে কোনো দেশের এ বছর এমন সাফল্য নেই। শুধু তাই নয়, এ বছর বাংলাদেশ যতগুলো ওয়ানডে জয় পেয়েছে সবগুলোই বর্তমান ও সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের বিরুদ্ধে। এছাড়াও নয়টি টি-টোয়েন্টি খেলে জয় পেয়েছে চারটিতে। ২০১২ সালের মতো সাফল্যমণ্ডিত বছর কেটেছে আরো দুইবার। ২০০৬ ও ২০০৯ সালে। এর মধ্যে ২০০৯ সালে ১৯টি ওয়ানডে খেলে বাংলাদেশ দলের ১৪টিতে জয় পাওয়া এখন পর্যন্ত সেরা কীর্তি। সে বছর ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে স্বাগতিকদের টেস্ট সিরিজেও হারিয়েছিল বাংলাদেশ। অপরদিকে ২০০৬ সালে ২৪টি ওয়ানডের মধ্যে ১৮টি জিতেছিল বাংলাদেশ দল। বছর শেষের আগেই জাতীয় দলের আরেকটি ইতিবাচক অর্জন হলো ওয়ানডে র্যাংকিংয়ে আট নম্বরে উঠে আসাকে।
ক্রিকেট মাঠের বাইরেও বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য এটি হলো সাফল্যের বছর। আইসিসির সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিসিবির সাবেক সভাপতি আ হ ম মোস্তফা কামাল এমপি। ২০১৪ সালে বর্তমান সভাপতি অ্যালান আইজাকের স্থলাভিষিক্ত হবেন তিনি।
এসব অর্জনকেই আবার ম্লান করে দেয় বিপিএলে সাবেক ক্রিকেটার শরিফুল হক প্লাবনের বিরুদ্ধে এবং আম্পায়ার নাদীর শাহকে নিয়ে ভারতের এক টেলিভিশন চ্যানেলে ওঠা ম্যাচ পাতানোর অভিযোগ। ভারতে বাংলাদেশ এ দলের হয়ে খেলতে গিয়ে মাঠে শাহরিয়ার নাফীসের অসাদাচরণ, মাঠের ভিতরে তামিম ইকবাল ও মোহাম্মদ আশরাফুলের হাতাহাতিও ছিল দেশীয় ক্রিকেটকে কালিমালিপ্ত করার মতো ঘটনা। বিপিএলের প্রথম আসর শেষ হওয়ার পরও খেলোয়াড়দের পাওনা পরিশোধ না করায় দেশে-বিদেশে সমালোচিত হয়েছে বিষয়টি। বছরের শেষটায় এসে মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার কারণে ক্রিকেট বোর্ড ভেঙ্গে এডহক কমিটি গঠিত হওয়াও ছিল আলোচিত বিষয়। এতসব অর্জনের মধ্যেও নিরাপত্তাহীনতার কারণে বিদেশি দলগুলোর পাকিস্তানে খেলতে অস্বীকৃতির মধ্যে মুশফিক বাহিনীকে সেদেশে খেলতে যেতে বাধ্য করছে বলে ক্রীড়ামোদীরা গভীর দুশ্চিন্তায় আছেন।
আশা করা যায়, আসছে বছরে দেশের ক্রিকেট অতিক্রান্ত ৫২ সপ্তাহের অর্জনগুলোকে ধরে আরো এগিয়ে যাবে।
