স্বপ্নের বীজ রোপণের বছর

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:৩২
সাম্প্রতিক বছরগুলোর মতো ২০১২ সালেও দেশীয় ফুটবল হতাশা বয়ে আনে। নেপালে ও শ্রীলংকায় দুইটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে ব্যর্থ হয় জাতীয় ফুটবল দল। থাইল্যান্ডে খেলতে গিয়ে বাজে ভাবে হারে বাংলাদেশ দল। তবে মালয়েশিয়ায় একমাত্র প্রীতি ম্যাচে ১-১ গোলে ড্র করার কৃতিত্ব দেখায় জাতীয় দল। এসব ব্যর্থতার মধ্যেই অতিক্রান্ত হতে যাওয়া বছরটিতে বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য আশা জাগানিয়া পরিকল্পনার কথা শোনান বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি কাজী মো. সালাহউদ্দিন। এদেশের ফুটবলের লক্ষ্যহীন পথ চলাকে দৃশ্যত নতুন পথের দিশা দিতে ভিশন ২০২২ ঘোষণা করেন তিনি। এর মোদ্দা কথা, ওই বছর কাতারে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা চালানো। কাতার ফুটবলকে লক্ষ্য রেখে এগিয়ে যেতে কার্যক্রম শুরু হবে বাংলাদেশের ফুটবলের। ভিশন ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ ফুটবলের চূড়ান্ত আসরের টিকিট পাওয়ার লক্ষ্য নয়। কাতারকে সামনে রেখে ফুটবল রোড ম্যাপ তৈরি করার। এই ব-দ্বীপে ফুটবল চর্চা নতুন নয়। পায়ে পায়ে ফুটবল ঘুরছে শত বছর ধরে। স্বাধীনতার আগে থেকেই নিয়মিত ফুটবল লিগ হয়েছে এই অঞ্চলে। আর স্বাধীনতার পর থেকে নিজস্ব ছকে, নিজস্ব আয়োজনে নিয়মিত লিগ খেলা হয়েছে। দেশ স্বাধীনের পর ৭২ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক ফুটবলে পা রাখতে শুরু করে। বাংলাদেশের অমলেস, সালাহউদ্দিন, এনায়েত, বাবলু, মো. মহসিন, ওয়াসিম, চুন্নু, সান্টুদের ফুটবল নৈপুণ্য আন্তর্জাতিক ফুটবল বিশেষজ্ঞদের নজরে পড়েছিল। এরপর ঢাকায় ভুরি ভুরি আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্টও হয়েছে। আয়োজন আর জনপ্রিয়তা এবং এদেশের ফুটবল দর্শকদের উত্তেজনা অন্যান্য ফুটবল দেশগুলোকে আকৃষ্ট করেছিল। তারা অপেক্ষায় থাকতো বাংলাদেশের ফুটবল টুর্নামেন্টে আমন্ত্রণ পাওয়ার জন্য। শুধু উত্তর কোরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়াই নয়— এদেশের ফুটবল টুর্নামেন্টে ইউরোপীয়ান ক্লাবও খেলে গেছে ঢাকায়। শেখ মো. আসলামের হ্যাটট্রিক আছে ইউরোপিয়ান ক্লাবের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাস ছিল, মর্যাদার আসন ছিল, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যে কোনো ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজনে ছিল মুন্সিয়ানা। মাঠে ছিল খেলোয়াড়দের উজ্জ্বল নৈপুণ্য। গ্যালারি ভরা ছিল দর্শক। পুরো দেশ মেতে উঠত ফুটবল উত্তেজনায়। বিশ্ব ফুটবল সংস্থাগুলোর সুন্দর দৃষ্টি ছিল এখানে। সব কিছু থাকার পরও বাংলাদেশের ফুটবল উন্নতি হয়নি। উল্টো পেছনের পথে গেছে। এদেশের সংস্কৃতি থেকে হারিয়ে গেছে ফুটবল। কারণ? কারণ একটাই ফুটবল নিয়ে লক্ষ্য ছিল না। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের বছরব্যাপী কার্যক্রমগুলোকে সীমিত আয়োজনের মধ্যেই আটকে ছিল। আন্তর্জাতিক ফুটবলে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর কোনো পরিকল্পনা ছিল না। ফুটবলে বাংলাদেশ কোথায় যেতে চায়? সেই লক্ষ্য ছিল না। অথচ ৭৮ সালে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৯ যুব ফুটবল টুর্নামেন্টে আসলাম, ওয়াসিমদের পারফরম্যান্স বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের নীতি নির্ধারকদের জানিয়ে দিয়ে ছিল রোড ম্যাপ তৈরি করার এখনই সময়; কিন্তু সেটা বুঝতে পারেননি, বা করতে পারেননি তত্কালীন কর্মকর্তারা। ফুটবল কর্মকর্তারাও সরকারের নজর কাড়তে পারেননি। ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারবেন না তারা। যখন আন্তর্জাতিক ফুটবলে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সে বাংলাদেশের মাথা ছোট হয়ে আসছিল তখনো নড়ে উঠেনি বাফুফে। ফুটবলে সরকারেরও উদাসীনতা ছিল। এশীয় ফুটবল অঞ্চল থেকে বাংলাদেশ সংকুচিত হয়ে ঠেকেছিল সাফ অঞ্চলে। শেষ পর্যন্ত সামান্য সাফ গেমস ফুটবল বাংলাদেশের কাছে হয়েছিল সোনার হরিণ। ৯৯ সালে কাঠমান্ডুতে সোনার হরিণের দেখা পেলেও ফুটবল নিয়ে কোনো নতুন স্বপ্নের রোড ম্যাপ হয়নি। ২০০৩ সালে ঢাকায় সাফ চ্যাম্পিয়নশীপ পেল বাংলাদেশ। ফাইনালের দিন স্টেডিয়ামের বাইরে তখন ১৫ হাজার দর্শক। চ্যাম্পিয়ন হলো বাংলাদেশ। তারপরও গা ঝাড়া দিয়ে উঠতে পারেননি ফুটবল কর্মকর্তারা। একটা উত্সবকে ঘিরেই শুরু হয় স্বপ্নের জাল বুনন। ৯৫ মিয়ানমার টুর্নামেন্টসহ তিনটি শিরোপা পেয়েও বাংলাদেশ যেন সেই তিমিরেই পড়ে রইল। শেষ পর্যন্ত সালাহউদ্দিন এসে বললেন লক্ষ্যহীন ফুটবল এগোবে না। নির্ধারিত লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে গেলে বাংলাদেশ একটা ভালো স্থানে যেতে পারবে। নড়েচড়ে বসল বাংলাদেশের প্রথম পেশাদার ফুটবলার কাজী সালাহউদ্দিন। উদ্যোগ নেয়া হলো অনেক স্বপ্নের ফুটবল একাডেমি গড়ার কাজ। রাজসিক ঘোষণা দিলেন কাতার বিশ্বকাপ ফুটবলকে সামনে রেখে আগামী দিনের খেলোয়াড় তৈরি করবেন। জেলা ফুটবল থেকে খেলোয়াড় আনবেন। জেলা ফুটবল চাঙ্গা করবেন। তার জন্য নিয়ে এসেছেন স্পন্সর। একাডেমির জন্য আসছেন ডাচ কোচ। আগামী দিনের খেলোয়াড় গড়ে তুলতে কাজ করবেন তারা। পুরো দেশের ফুটবলটাকে একটা রোড ম্যাপের মধ্যে এনে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য পথ আঁকছেন। কাতার বিশ্বকাপ ফুটবল শুধু একটি লক্ষ্য, এটিকে সামনে রেখে বাংলাদেশ এশিয়ার ফুটবলে আবার জায়গা করে নেবে সেটাই তো হওয়া উচিত আমাদের প্রথম লক্ষ্য। আর এটাই হচ্ছে বাংলাদেশের ফুটবলের স্বপ্নের বীজ রোপণ, ২০১২।