জয়িতার অর্থ যে জয় করতে পারে, বিজয়ী। প্রান্তিক নারীদের উত্পাদিত পণ্য ঢাকার ধানমন্ডির রাপা প্লাজার একটি ফ্লোরে বিক্রির ব্যবস্থা করেছে সরকার। উদ্দেশ্য তাদের জীবনযুদ্ধে বিজয়ী করা। আর একজন প্রতিবন্ধী নারী উদ্যোক্তা যখন নানা প্রতিবন্ধকতা ঠেলে তার পণ্য উত্পাদন করে নিজের জীবন যাপন করেন, অন্য প্রতিবন্ধী নারীর কর্ম সংস্থান করেন, তখনতো তিনিও বিজয়ী। তারও উত্পাদিত পণ্য নিয়ে জয়িতায় অংশ নেয়ার অধিকার আছে, এমন দাবির প্রেক্ষিতে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব তারিক-উল-ইসলাম ‘জয়িতা’য় প্রতিবন্ধী নারী উদ্যোক্তাদের জন্য একটি স্টল বরাদ্দের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। গতকাল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে একশনএইড বাংলাদেশের সহযোগিতায় অ্যাকসেস বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘প্রতিবন্ধী নারী ক্ষুদ্র উদ্যোক্ত উন্নয়নে সরকারি বেসরকারি সংস্থার ভূমিকা’ শীর্ষক গোল টেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এই সিদ্ধান্তের কথা জানান।
অ্যাকসেস বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন এর সভাপতি সিএম তোফায়েল সামির সভাপতিত্বে বৈঠকে বিশেষ অতিথি ছিলেন অনন্যা সম্পাদক তাসমিমা হোসেন, একশনএইড বাংলাদেশের পরিচালক আসগর আলী সাবির। সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন অ্যাকসেস বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন এর সহ-সভাপতি মহুয়া পাল এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক আলবার্ট মোল্লা। এতে বাজেটে নারী উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে বরাদ্দকৃত ১০০ কোটি টাকার মধ্যে প্রতিবন্ধী নারী উদ্যোক্তাদের অন্তর্ভুক্তিকরণ, প্রতিবন্ধী নারী উদ্যোক্তাদের পণ্য বাজারজাতকরণ এবং জয়িতায় স্টল বরাদ্দ, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে এসএমমি ফাউন্ডেশনের ‘জাতীয় এসএমমি নারী উদ্যোক্তা পুরস্কার’ এ প্রতিবন্ধী নারী উদ্যোক্তাদের অন্তর্ভুক্তকরণ,বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ঋণ সুবিধা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তাদের পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা, সরকারি বেসরকারি ঋণ গ্রহণসহ প্রশিক্ষণ, বিপণনে প্রবেশগম্যতাসহ ১০টি দাবি করা হয়। সভার শুরুতে অ্যাকসেস বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন সম্মাননা প্রাপ্ত দশ জন প্রতিবন্ধী নারী উদ্যোক্তার উপর নির্মিত একটি ভিডিও চিত্র দেখানো হয়।
তারিক-উল-ইসলাম আরও বলেন, এই দশ জন শুধু নয় অনেক প্রতিবন্ধী নারী আজ জীবন সংগ্রামে অবতীর্ণ। তার সরকার নারীদের বিউটিফিকেশন ট্রেনিং, মোবাইল সার্ভিসিং ট্রেনিং দিচ্ছে । ট্রেনিং প্রাপ্ত নারীরা কাজ করছেন। জয়িতায় নারীদের সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। এসকল সুবিধার আওতায় প্রতিবন্ধী নারীদের আনা হবে।
তাসমিমা হোসেন বলেন, এসব প্রতিবন্ধী নারীর অনেকে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে প্রতিবন্ধী হয়েছেন, তাদের কাউকে যৌতুকের জন্য স্বামী ট্রেনের নিচে ফেলেছে, ছাদ থেকে ফেলে প্রতিবন্ধী করেছে । সেই অবস্থা থেকে ফিরে তারা এখানে এসেছে। আমাদের সকলেরই তাদের সহযোগিতা করতে হবে। এক্ষেত্রে গণমাধ্যম বড় একটি ভূমিকা পালন করতে পারে। আমি দেখেছি বোম্বে সুপার স্টার আমির খান একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সুবিধা বঞ্চিতদের জন্য তাদের পলিসিতে পরিবর্তন এনেছেন। আমরা বিজ্ঞাপন চিত্রের মাধ্যমে, স্বল্প দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের মাধ্যমেও সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারি। তিনি বলেন, আমাদের সরকার ও বেসরকারি সংস্থাসহ যে সকল প্রতিষ্ঠান ও মন্ত্রণালয় এই কার্যক্রমের সাথে জড়িত তাদের সচেতন করতে হবে। একটু একটু করে তাদের জন্য কিভাবে কোন কাজ প্রয়োজন তা জানাতে হবে। আমরা আজও সব ভবনে প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করতে পারিনি। রাজউককে এই বিষয়ে সচেতন করতে হবে। তিনি বলেন, আমরা যারা এসব ক্ষেত্রে কাজ করছি তাদের সরকার কি করে তার দিকে চেয়ে না থেকে কি করতে হবে সে বিষয় জানাতে হবে। আড়ং এর মত বড় বড় প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধী নারী উদ্যোক্তাদের পণ্য বিক্রি করাসহ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।
লিওনার্ড চেসার ডিসএবেলিটি নির্বাহী পরিচালক ড. আনিসুজ্জামান বিশ্ব ব্যাংকের পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশের ২০ শতাংশ দারিদ্র্য হ্রাস পেলেও ৫ কোটি লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে । এর মধ্যে প্রতিবন্ধী নারীও আছে। তারা বলেছে প্রতিবন্ধী নারীর উন্নয়ন ছাড়া দেশের উন্নতি তথা বিশ্বের উন্নয়ন সম্ভব নয়।
জয়িতার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জেট আই ফারুক বলেন, আমাদের কেন সরকার অর্থমন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংককে মনে করিয়ে দিতে হবে দেশে প্রতিবন্ধী নারী আছে। কেন তারা নিজেদের কার্যক্রমে তাদের অন্তর্ভুক্ত করবে না? অনুষ্ঠানে ঢাকার কেয়া জানান, কিভাবে তারা কোন কাজ নিয়ে গেলে একবার সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়, একবার নারীশিশু মন্ত্রণালয়ে ঘোরাঘুরি করতে হয়। ময়মনসিংহ থেকে আসা তাহমিনা জানতে চান কেন তারা বৈষম্যের শিকার হবেন ? তাদের কাজ দেখে যদি বোঝা যায় এটা কোন প্রতিবন্ধীর কাজ, তাহলেই সে প্রতিবন্ধী ও বৈষম্য মেনে নিতে রাজি নুতবা নয়।
