২০১২ সালে প্রথমদিনের সূর্য উদিত হয়েছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অশুভ বার্তা নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে নানা ঘটনার জন্ম দিয়েছে ২০১২। বছর জুড়ে বিভিন্ন প্রকার অস্থিতিশীলতা ছিল এর নিত্যসঙ্গী। হত্যা, সংঘর্ষ, রাজনৈতিক সংকট, প্রকৃতিগত মৃত্যুসহ নানা কারণে পুরো বছর দেশবাসীর কাছে অতি আলোচিত ছিল এ বিশ্ববিদ্যালয়।
৯ জানুয়ারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে নেমে আসে একটি হূদয়স্পর্শক অধ্যায়। ক্যাম্পাসের আকাশ ছেয়ে যায় কালো মেঘে। পুরো ক্যাম্পাস মুহূর্তেই পরিণত হয় শোকের মাতমে। কারণ, ততক্ষণে বাগান থেকে ঝড়ে গেছে একটি গোলাপ। অজানায় হারিয়ে গেছে বসন্তের একটি কোকিল। খালি হয়েছে মায়ের বুক। বাবার কাঁধে উঠেছে সন্তানের লাশ। ধূলিসাত্ হয়েছে একটি পরিবারের স্বপ্ন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ৩৭তম ব্যাচের মেধাবী ছাত্র যোবায়ের। ৮ জানুয়ারী ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কলা ভবনের সামনে থেকে ড. ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের পিছনে নিয়ে যান। তারা তাকে নির্মম নিষ্ঠুর প্রহারে অচেতন করে তারাই সাভার হাসপাতালে রেখে আসে। সেখান থেকে নেয়া হয় রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে। পরদিন ৯ তারিখ সোমবার সকালে তিনি চলে যান না ফেরার দেশে। সবেমাত্র অনার্স পরীক্ষা শেষ হয়েছিল তার। শুরু হয়েছিল জীবনকে নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখা। কিন্তু তা অধরাই থেকে যায়। ফিরতে হয় লাশ হয়ে।
পরদিন প্রায় ২০০০ অধিক শিক্ষার্থী ক্লাস বর্জন করে বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে। সাথে যোগ দেন শিক্ষক সমাজ। চলতে থাকে আন্দোলন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে দীর্ঘদিন মানববন্ধন, মৌন ছিল, কালো ব্যাচ ধারণ, পথসভা, পথনাট্যসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় আন্দোলন অব্যাহত রাখে। আন্দোলন তীব্রতা পায় ২৫ এপ্রিল রাত ১টায় উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক তালিম হোসেন ও নুহু আলমকে আশুলিয়া থানা-পুলিশ গ্রেফতার করলো। রাত সোয়া দুইটায় প্রায় অর্ধশতাধিক শিক্ষক উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি আলী আকন্দের উপর অধ্যাপক তালিম হোসেন ও নুহু আলমের বিরুদ্ধে লাঞ্ছনার অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরদিন ছাত্রলীগদ্বারা সাংস্কৃতিক জোটের নেতা-কর্মীদের উপর হামলা হলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে যোগ দেয়। ছাত্র-শিক্ষক ও বিভিন্ন সংগঠনের চাপের মুখে উপাচার্য অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবিরের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে এ আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটে।
এদিকে ২ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশের গুলির প্রতিবাদে আবারও ক্যাম্পাস উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। জানা যায়, ২ আগস্ট রাত সাড়ে ১০টার দিকে ছাত্রলীগের মূল ধারার নেতা তাহমিদুল ইসলাম লিখনের ওপর হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হলের নাহিদুর রহমান (নৃবিজ্ঞান-৩৯ব্যাচ) কে সন্দেহজনকভাবে আটক করে পুলিশ। এরপর হলের বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ বাঁধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এ সময় পুলিশের ছোঁড়া গুলিতে ফার্মেসি বিভাগের ৩৯তম ব্যাচের রাকিব, গণিত বিভাগের ৪১তম ব্যাচের রবিন, ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজির ৩৯তম ব্যাচের মারুফ, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ৩৯তম ব্যাচের নাহিদ এবং পরিসংখ্যান বিভাগের ৪০তম ব্যাচের ছাত্র বশির আহত হন।
বিদায় নিয়েছে ২০১২ সাল। উঠেছে নতুন বছরের সূর্য। নতুন বছরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ২০১২ সালের ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি চায় না। কলুষমুক্ত নতুন বছরের প্রত্যাশা শিক্ষার্থীদের একান্ত কাম্য।
