ইসলামে নারীর শ্রেষ্ঠত্ব সম্মান মর্যাদা অপরিসীম

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০১৩, ১৮:৫৮
কুরআন মজীদ কেবল একটি আইন সংকলন নয়। কুরআন মজীদের বক্তব্য ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণবিহীন কতগুলো শুষ্ক আইন-কানুন ও বিধি-বিধান নয়। কুরআন মজীদে যেমন আইন-কানুন আছে, তেমনি এতে ইতিহাসও আছে, উপদেশও আছে, সৃষ্টিপ্রকৃতির ব্যাখ্যাও আছে এবং আরো হাজারো বিষয় আছে। কুরআন মজীদ একদিকে যেমন অনেক বিষয়ে কর্মসম্পাদন সংক্রান্ত আইন-কানুন প্রদান করেছে, অন্যদিকে এর অন্য স্থানে সৃষ্টিলোকের অস্তিত্বকে ব্যাখ্যা করেছে। যমীন, আসমানসমূহ, উদ্ভিদরাজি, প্রাণিকুল ও মানুষের সৃষ্টিপ্রকৃতির রহস্য এবং বিভিন্ন ধরনের জীবন, বিভিন্ন ধরনের মৃত্যু, সম্মান, লাঞ্ছনা, উন্নতি-অগ্রগতি, অধঃপতন, সম্পদ ও প্রাচুর্য এবং দারিদ্র্যের রহস্য বর্ণনা করেছে। কুরআন মজীদ কোনো দর্শনের গ্রন্থ নয়, কিন্তু এ গ্রন্থ বিশ্বজগত, মানুষ ও সমাজ- এই তিনটি বিষয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট বক্তব্য রেখেছে। কোরআন স্বীয় অনুসারীদেরকে শুধু আইন শিক্ষা দেয় না এবং শুধু কতগুলো উপদেশ ও নসিহত প্রদান করে না, বরং সৃষ্টি প্রকৃতির ব্যাখ্যা পেশ করে স্বীয় অনুসারীদেরকে বিশেষ চিন্তাপদ্ধতি ও বিশ্বদর্শন শিক্ষা দেয়। সম্পদের মালিকানা, রাষ্ট্র ও শাসন ব্যবস্থা, পারিবারিক অধিকার ইত্যাদি সম্পর্কে ইসলামী বিধিবিধানের ভিত্তি হচ্ছে মূলত এই সৃষ্টি প্রকৃতি ও বস্তুজগতেরই ব্যাখ্যা মাত্র। কুরআন মজীদে যেসব বিষয় ব্যাখ্যা করা হয়েছে তার মধ্যে নারী ও পুরুষের সৃষ্টিপ্রকৃতি অন্যতম। কুরআন এ ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বন করেনি এবং অর্থহীন কথার ফুলঝুরি ছুটানো যাদের অভ্যাস তাদের জন্যে নারী ও পুরুষ সম্পর্কে মনগড়া দর্শন রচনার এবং ইসলামের নারী-পুরুষ সংক্রান্ত বিধি-বিধানের উত্স নারীর প্রতি অবজ্ঞাসূচক দৃষ্টিভঙ্গি বলে দাবী করার জন্যে ময়দান ছেড়ে দেয়নি। ইসলাম বিভিন্নভাবে নারী সম্পর্কে স্বীয় মতামত ব্যক্ত করেছে। আমরা যদি দেখতে চাই যে, কুরআন মজীদের দৃষ্টিতে নারী ও পুরুষের সৃষ্টিপ্রকৃতি কী, তাহলে আমাদের জন্যে অন্যান্য ধর্মীয় গ্রন্থে নারী ও পুরুষের প্রকৃতি সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে কীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে তার প্রতি দৃষ্টি দেয়ারও প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের দেখতে হবে যে, কুরআন মজীদ নারী ও পুরুষকে এক অভিন্ন সৃষ্টিপ্রকৃতির অধিকারী গণ্য করেছে, নাকি দু’টি ভিন্ন সৃষ্টিপ্রকৃতির অধিকারী মনে করেছে? কুরআন মজীদ বিভিন্ন আয়াতে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বলেছে যে, নারীকে পুরুষের অভিন্ন উত্স থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং পুরুষদের প্রকৃতির অভিন্ন প্রকৃতি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। কুরআন প্রথম মানুষ সম্পর্কে বলেছে- তিনি তোমাদের সকলকে এক অভিন্ন নফ্স্ থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার জুটিকে তার থেকেই সৃষ্টি করেছেন (সূরা আন্-নিসা’: ১)। এছাড়া সমস্ত মানুষ সম্পর্কে আল্লাহ্তা’আলা বলেন যে, আল্লাহ্তা’আলা স্বয়ং তোমাদের অভিন্ন উত্স থেকেই তোমাদের জন্যে জুটি সৃষ্টি করেছেন (সূরা আন্-নিসা’, সূরা আলে ‘ইমরান ও সূরা আর্- রূম্)। কতক ধর্মীয় গ্রন্থে যে বলা হয়েছে, নারীকে পুরুষের সৃষ্টি-উপাদানের তুলনায় নিম্নমানের সৃষ্টি-উপাদান থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে, অথবা নারীকে যে পরজীবী ও পুরুষের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন গণ্য করা হয়েছে, অথবা যে বলা হয়েছে, প্রথম মানুষের স্ত্রীকে তাঁর শরীরের বাম পাশের একটি অংশ থেকে সৃষ্টি করা হয়েছ্লে কুরআন মজীদে এ সম্পর্কে কোনো কথাই নেই। কিন্তু এ সত্ত্বেও উত্স ও প্রকৃতি প্রসঙ্গে নারী সম্পর্কে ইসলামে কোনরূপ অবজ্ঞাসূচক মতামত নেই। কুরাআন মজীদ তার প্রচুরসংখ্যক আয়াতে সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছে যে, পরকালীন পুরস্কার ও আল্লাহ্তা’আলার নৈকট্য নারী বা পুরুষ হওয়ার সাথে সম্পর্কিত নয়, বরং ঈমান ও আমলের সাথে সম্পর্কিত, তা সে ঈমান ও আমল পুরুষেরই হোক বা নারীরই হোক। কুরআন মজীদ মহান ও পবিত্র পুরুষদের পাশাপাশি মহান ও পবিত্র নারীদের কথাও উল্লেখ করেছে; হযরত আদম (আ.) ও হযরত ঈসা (আ.)-এর স্ত্রী এবং হযরত মূসা (আ.) ও হযরত ঈসা (আ.)-এর মাতাকে সপ্রশংসভাবে উল্লেখ করেছে। [চলবে]