সোহরাব হোসেন

শুদ্ধ সুরের সাধক

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০১৩, ১৯:০১
সোহবার হোসেনের একটি দীর্ঘ সাক্ষাত্কার নিয়েছিলাম ২০০৬ সালের মে মাসে। সেই থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ শেষ দিন পর্যন্ত। আমাদের প্রিয় এই মানুষটি সমপ্রতি চলে গেছেন না ফেরার দেশে। চিরতরে স্তব্ধ হয়েছে তাঁর মধুর কণ্ঠ। দীর্ঘ আট দশক নজরুলসংগীত চর্চায় নিজেকে নিয়োজিত রেখে জীবনভর সুর বিলিয়ে গেছেন এই নিরহঙ্কার শুদ্ধ সুরের সাধক। কণ্ঠস্বরের তন্ময়তা এবং অনন্যসাধারণ গাম্ভীর্য তাঁকে কিংবদন্তি স্তরে পৌঁছে দিয়েছিল। তাঁর প্রয়াণে দেশ নজরুলসংগীতের এক মহত্ শিল্পী, শিক্ষক ও অভিভাবককে হারিয়েছে। এ এক অপূরণীয় ক্ষতি, আমরা শোকে কাতর! সোহরাব হোসেনের জন্ম ১৯২২ সালের ৯ এপ্রিল, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার আয়েশাতলা গ্রামে; এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। বাড়িতে গানবাজনার তেমন কোনো চল ছিল না। তবুও সেই শৈশবে তিনি সুরের মায়ায় মোহিত হন। তিনি একবার বলেছিলেন, ‘বাবার পরিবারে নয়, মায়ের দিক থেকে গানের টান প্রাণে পৌঁছেছে। আমি তখন বেশ ছোট, একবার নানা, আমার খালাতো ভাই—আমার চেয়ে এক বছরের বড়—তার হাত ধরে এবং আমাকে কোলে নিয়ে আমাদের বাড়িতে আসেন। আমার চাচাতো ভাইয়েরা নানার কাছে গান শোনার বায়না ধরল। নানা গাইলেন “একবার বিদায় দে মা”—ক্ষুদিরামকে নিয়ে রচিত এই গান আমি প্রথম শুনে অবাক হই। ভারি চড়া ছিল নানার গলা। তখন তো অত বুঝতাম না। সেই ছোটবেলায় সংগীতের প্রতি আমার ঝোঁক ছিল কিন্তু শেখার উপায় ছিল না। আমার পরিবার ছিল গোড়া মুসলমান। এলাকার মাতব্বরের ছেলে গানটান করবে—এটা ছিল অবিশ্বাস্য ব্যাপার।’ তার পরও সংগীত তিনি ভালোবেসেছিলেন। সংগীতে তাঁর হাতেখড়ি হয় রানাঘাটের সংগীতশিক্ষক জয়নুল আবেদীনের কাছে, পাঁচ বছর বয়সে। অতপর তাঁর উত্থান ঘটে ধীরে ধীরে এবং অবিসংবাদিতভাবে। রবীন্দ্রনাথের সাগরসঙ্গমে যে চুন্নি নদীর উল্লেখ রয়েছে, সে নদীর পাশে ছিল তাঁদের বাড়ি। চুন্নি নদীর ঘাটে গোপী নামের এক মাঝি ছিল। গোপীই তাঁকে নদী পার করে দিতেন। একদিন গোপী মাঝি নৌকা আনতে দেরি করায় সোহরাব হোসেন পাড়ে বসে গান ধরেন। সে গান শোনেন তাঁর এলাকার জমিদার ক্ষীরোদ পাল চৌধুরী। ওই সময় নদীয়া মহকুমায় তাঁর নয় লাখ টাকার জমিদারি ছিল। তিনিই একদিন সোহরাব হোসেনকে ডেকে পাঠান। বৃদ্ধ জমিদার তাঁকে দেখে আবারও গান শুনতে চেয়েছিলেন। তখন তাকে ‘মা তোর বরণ কালো কিসে মাগো বল’ এই শ্যামাসংগীত গেয়ে শোনান সোহরাব। গান শেষে তিনি লক্ষ করেন, জমিদার কাঁদছেন। পরে জমিদার নিজ-উদ্যোগে ওস্তাদ কিরণ দে চৌধুরীর কাছে সোহরাবের গান শেখার ব্যবস্থা করে দেন। সোহবার হোসেন তখন পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র। বাড়ির কাছারি ঘরে থাকেন। রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে তিনি লুকিয়ে গান শিখতে যান। ওই গোপী মাঝিই তাঁকে নদী পার করে দেন। একদিন নৌকা না পেয়ে তিনি নদী সাঁতরে পার হয়েছিলেন। সোহরাব হোসেনের বয়স যখন নয় বছর, তখন রানাঘাটের এক আসরে কাজী নজরুলের কণ্ঠে ‘কারার ওই লৌহ কপাট’ গানটি শোনেন। কাজী সাহেব কংগ্রেসের টুপি পরতেন। যখন গান গাইতেন, তখন তাঁর ঝাঁকড়া চুল মাথার ওপর দিক থেকে সামনে ঝুুঁকে পড়ত। সেই ভালোলাগা থেকে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, নজরুলসংগীত চর্চা করবেন। পরিবারের লোকজন তাঁর সংগীতপ্রীতির বিষয়টি ভালোভাবে দেখত না। এমনকি, পড়ালেখা বন্ধ করে দিয়ে তাঁকে ব্যবসার কাজে নামিয়ে দেওয়া হয়। এরপর শিক্ষক কিরণ দে চৌধুরীর মাধ্যমে কলকাতায় গিয়ে শ্রীরঙ্গম থিয়েটারে মাসে ১২ আনা বেতনে গান গাওয়ার কাজ পান তিনি। ওই সময় তিনি গান শুনতে যেতেন শিল্পী পূরবী দত্তের বাড়িতে। গানের প্রতি তাঁর এতই আকর্ষণ ছিল যে, গ্রামোফোন রেকর্ড শুনে তিনি তাত্ক্ষণিক তা গলায় তুলে ফেলতেন। সোহরাব হোসেন সেই সময় ইন্দুবালা, গিরীশ চক্রবর্তী, কৃষ্ণচন্দ্র দের সাহচর্য লাভ করেন। তাঁর পরিচয় হয় শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদের সঙ্গে। আব্বাসউদ্দীন সাহেব কাজী নজরুলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। নজরুলের অধিকাংশ হামদ, নাত, গজল আব্বাসউদ্দীনের কণ্ঠে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। তিনি সোহরাবকে পেয়ে অত্যন্ত খুশী হয়ে গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন। আব্বাসউদ্দীনও আপন জনের মতো একটি চিঠি লিখে সোহরাব হোসেনকে মেগাফোন কোম্পানিতে পাঠিয়েছিলেন। তখন মেগাফোনের অধিকর্তা ছিলেন জি এন ঘোষ। তাঁর বাড়ি ছিল ঢাকার মানিকগঞ্জে। তিনি আব্বাসউদ্দীনের চিঠি পেয়ে এবং সোহরাবের কণ্ঠে গান শুনে ওই দিনই গান রেকর্ডের জন্য চুক্তিপত্র করেন। পরে তাঁর কণ্ঠে ধারণকৃত রেকর্ড প্রচার হলে ধীরে ধীরে তাঁর পরিচিতি বাড়তে থাকে। ১৯৪৬ সালে কলকাতায় সরকারের পাবলিক রিলেশন ডিপার্টমেন্টে তাঁর চাকরি হয়। সারা দিন কর্মক্ষেত্রে অক্লান্ত পরিশ্রমের পরও নিয়মিত গানের তালিম নিতেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের দুদিন পর বদলি হয়ে তিনি ঢাকায় চলে আসেন। প্রথমে আশ্রয় নেন নীলক্ষেত ব্যারাকে, পরে ৪১ জিন্দাবাজার লেনের একটি বাড়িতে। বাড়িটি ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু এবং আব্বাসউদ্দীনের নামে বরাদ্দ ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত খসরু সাহেব ও আব্বাসউদ্দীন সাহেব ওই বাড়িতে থাকেননি। সেখানে আশ্রয় নেন শিল্পী বেদারউদ্দীন আহমদ, শেখ লুত্ফর রহমান, ওস্তাদ খাদেম হোসেন খান, মমতাজ আলী খান, শমসের আলী ও সোহরাব হোসেন। একদিকে ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ, শিল্পী শচীন দেববর্মণ ও অঞ্জলি মুখার্জির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অন্যদিকে আব্বাসউদ্দীন সাহেবের অভিভাবকত্ব। তাঁদের সান্নিধ্যলাভে সোহরাব হোসেনের জীবনের মোড় পাল্টে যায়। ওই সময় আব্বাসউদ্দীন সাহেব তাঁকে তালিম দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশনের জন্য নিয়ে যেতেন। এ ছাড়া তিনি নিয়মিত রেডিওতে গান গাইতেন। সোহরাব হোসেনের জীবনে শিল্পী আব্বাসউদ্দীনের অবদান নানা দিক থেকে স্মরণযোগ্য। তাঁরই প্রেরণা ও উত্সাহে সোহরাব হোসেন ঝুঁকেছিলেন নজরুলসংগীতের দিকে। শিখলেন আকারমাত্রিক স্বরলিপির নিয়মকানুন। আবার তিনিই নিয়ে যান গ্রামোফোন কোম্পানিতে। আব্বাসউদ্দীন সাহেব আমৃত্যু তাঁর পাশে ছিলেন। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ঋণ তিনি সবসময় প্রকাশ করেছেন। কবি জসীমউদ্দীনও তাঁর পাশে ছিলেন একান্তভাবে। তাঁদের সান্নিধ্যলাভে নিজেকে তিনি গড়ে নিয়েছিলেন নতুনভাবে। সোহরাব হোসেন প্রায়ই বলতেন, ‘আমি অত্যন্ত সৌভাগ্যবান। জমিদার ক্ষীরোদ পাল চৌধুরী, আব্বাসউদ্দীন, জসীমউদ্দীনের মতো মহত্ মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি।’ পরবর্তীকালে তিনি যুক্ত হন পূর্ব পাকিস্তানের সেরা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বুলবুল ললিতকলা একাডেমি এবং জাগো আর্ট সেন্টারের সঙ্গে, সংগীতশিক্ষক হিসেবে। সেখানে ছাত্রছাত্রীদের তিনি গান শেখাতেন। ছায়ানটের সূচনাকালে নিজে যুক্ত হন একজন উদ্যোক্তা হিসেবে। আর এই ছায়ানটে ছাত্রদের শিখিয়েছেন আমৃত্যু। তিনি ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। সরকারি চাকরি করলেও সংগীতই ছিল তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। রেডিও, টেলিভিশন, মঞ্চে নজরুলের জন্ম-মৃত্যুদিবসে সোহরাব হোসেনের উপস্থিতি অনিবার্য। চলচ্চিত্রেও তিনি প্লে-ব্যাক করেছেন। রবিন ঘোষের সুরে এহতেশাম পরিচালিত ‘রাজধানীর বুকে’ ছবিতে প্লে-ব্যাক করেছিলেন তিনি। এ ছাড়া তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হলো ‘মাটির পাহাড়’, ‘যে নদী মরু পথে’, ‘গোধূলির প্রেম’, ‘আগন্তুক’, ‘শীত বিকেল’ ও ‘এ দেশ তোমার আমার’। অভিনয়েও পারদর্শী ছিলেন সোহরাব হোসেন। কার্জন হল মঞ্চে নাটকে অভিনয় করেছেন। তুলসী লাহিড়ীর ‘ছেঁড়া তার’ নাটকে অভিনয় করে দর্শকনন্দিত হয়েছিলেন তিনি। গত শতকের পঞ্চাশের দশকে নজরুলসংগীতের পরিচয় কী হবে, তা নিয়ে রীতিমত আন্দোলন হয়। ওই আন্দোলনের নেতৃত্বেও তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন। ওই সময় রেডিওতে নজরুলের গান প্রচার হলে ঘোষণায় বলা হতো— কথা ও সুর কাজী নজরুল ইসলাম। তখন আব্বাসউদ্দীন আহমদ, গিরীশ চক্রবর্তী, হাবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী, বেদারউদ্দীন আহমদ—প্রমুখ রেডিও কর্তৃপক্ষকে লিখিত দরখাস্ত দিয়েছিলেন। তাঁদের দাবি ছিল, নজরুলের গান ‘নজরুলসংগীত’ হিসেবে প্রচার করা হোক—আজও সেটিই হচ্ছে। নজরুলের গানের পরিমাণ প্রায় সাড়ে তিন থেকে ৪ হাজার। কিন্তু নজরুলসংগীতের সম্পূর্ণ সংকলন আজও প্রকাশিত হয়নি। তাঁর সব গানের স্বরলিপিও প্রকাশিত হয়নি। সংগীতজ্ঞ ব্রহ্মমোহন ঠাকুর, সুধীন দাশ, সালাউদ্দীন আহমেদ, রশীদুন্ নবী রচিত প্রায় হাজারখানেক গানের স্বরলিপি এতদিনে প্রকাশিত হয়েছে। আজও নজরুলসংগীতের শুদ্ধরূপ নিয়ে সংগীতশিক্ষার্থীদের প্রায়ই সমস্যায় পড়তে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাণী ও সুরগত বিভ্রান্তি লক্ষ করা যায়। কবি নিজেও কখনো কখনো একই গানের বাণী ও সুর সংশোধন করেছিলেন। শুদ্ধ বাণী ও সুরে নজরুলসংগীত প্রচারে আজীবন সংগ্রাম করেছেন সোহরাব হোসেন। তিনি বলতেন, নজরুলসংগীত বিশেষজ্ঞ ও স্বরলিপিকারদের দিয়ে স্বরলিপি প্রয়ণয় করতে হবে। অন্যদিকে ত্রুটি শোধরাতে নজরুলের সান্নিধ্যধন্য শিল্পীদের রেকর্ড [আদি গ্রামোফোন, মেগাফোন, হিজ মাস্টার ভয়েসে রেকর্ডকৃত] শুনতে হবে। নজরুল ইনস্টিটিউটের শুদ্ধ নজরুলসংগীত চর্চা ও স্বরলিপি প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। অসংখ্য সংগীত-কর্মশালার প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। দেশের অনেক গুণী ও জনপ্রিয় শিল্পী সোহরাব হোসেনের সান্নিধ্যে সংগীতের তালিম নিয়েছেন। তাঁর শিক্ষার্থীদের মধ্যে আছেন সংগীতজ্ঞ সন্জীদা খাতুন, শিল্পী খায়রুল আনাম শাকিল, আতিকুল ইসলাম, সাদিয়া মল্লিক, শাহীন সামাদ, মাহমুদুর রহমান বেণু—প্রমুখ। আমাদের শিল্পীসমাজ তাঁর কাছে ঋণী। সংগীতে অনবদ্য অবদানের জন্য তিনি স্বাধীনতা পদকসহ অন্যান্য সম্মাননা লাভ করেন। বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের জন্মলগ্ন থেকেই তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। আমৃত্যু সংগীতের সঙ্গে যুক্ত থেকে সোহরাব হোসেন বদলে দিয়েছেন আমাদের সংগীতরুচি। তাঁর কর্মোদ্দীপনা আমাদের জীবনে অম্লান থাকবে। চিরকাল সশ্রদ্ধায় উচ্চারিত হবে এই সুর-জাদুকরের নাম ।