পণ্ডিত রবি শঙ্কর

সংগীতই আমাকে ‘গুরু’ বানিয়েছে

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০১৩, ১৯:০২
প্রশ্ন: জর্জ হ্যারিসন আপনার খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। আপনার সাথে তাঁর প্রথম সাক্ষাত্ হয়েছিল ১৯৬৬ সালে। বিটলসের গায়কেরা তখন সংগীতসাধনায় এক অলৌকিক সহযোগিতা খোঁজ করছিল বলে শোনা যাচ্ছিল। এই অনুসন্ধান যথার্থ ছিল বলে কি আপনি মনে করেন? রবি: আমি তাদের সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতাম না। শুধু জানতাম, এই চারজন একটি জনপ্রিয় দলের সদস্য। কিন্তু শুরুতে এদের মধ্যে একমাত্র জর্জই আমাকে বিমোহিত করেছিল। কারণ, সে আমার কাছে সংগীতসম্পর্কে জানতে চাইত। পুনর্জন্ম এবং ধর্মীয় আরও নানা বিষয়ে তার অনেক কৌতূহল ছিল। এভাবেই সে আমার খুব কাছাকাছি এল এবং সংগীতের বেশ কিছু দিকসহ সেতার শিখতে শুরু করল। প্রশ্ন: আপনি কি এর আগে হ্যারিসনের কোনো গান শুনেছিলেন? রবি: আমি এর আগে তার গান শুনিনি। অনেক পরে আমার ভাইপো-ভাইঝিরা আমাকে তার গান শুনিয়েছিল। গানের বোধ, কম্পোজিশনসহ সেতারের বাজনা—সত্যিই দারুণ ছিল তাঁর! তবে এটা এক অন্যরকম সুরধ্বনি। লন্ডনে থাকতে সে আমার কাছ থেকে সামান্য কিছু শিখেছিল। আমি তাকে খোলাখুলি বলেছিলাম—তোমার গান মানুষ পছন্দ করে, এসব দেখে তুমিও খুশি; কিন্তু আমি পুরোপুরি খুশি হতে পারছি না। কারণ, সেতারের শব্দটা আমার মন মতো হচ্ছিল না। তারপর সে আমার কাছে এসব জানতে ও শিখতে আগ্রহী হয়ে উঠলো। প্রশ্ন: আপনি পাশ্চাত্য বাদকদের সাথে বাজিয়েছিলেন। আপনিই প্রথম ভারতীয়, যিনি পাশ্চাত্য বাদকদের সাথে বাজিয়েছেন এবং তাঁদের সাথে আপনি বাজিয়েছেন নানান তালে—শাস্ত্রীয় ও রক উভয় মাধ্যমেই বাজিয়েছেন। কীভাবে করলেন এটা? রবি: আমি একটু সংশোধনী দিই, রক বা জ্যাজ মিউজিশিয়ানদের সাথে বাজানোর অনেক আগে আমি ইউরোপে এসেছিলাম। আমার খুব প্রিয় বন্ধু লর্ড ইয়েহুদি মেনুহিন—একজন বিখ্যাত বেহালাবাদক। তাঁর সাথে ১৯৫২ সালে বাজিয়েছিলাম। তখন আমাদের তিনটা অ্যালবাম বেরিয়ে গিয়েছে। সে সেতার শিখেছিল এবং বহু গানে আমাদের ভারতীয় সংগীতে প্রভাবিত হয়ে সুর দিয়েছিল —বালা যায়, ভারতীয় ধর্মদর্শনে প্রভাবিত হয়ে। আমি অনেক পরীক্ষা করেছি। আমি একে ফিউশন বলতে রাজি নই, আবার মিশ্রণও বলতে চাই না। পাশ্চাত্য সংগীত ভারতীয় সংগীতের স্পর্শে এসে একধরনের ককটেলে রূপান্তরিত হয়, যা মানুষের আগ্রহ বাড়িয়ে তোলে। আমি কিছু একটা করতে চেয়েছিলাম। ভারতীয় সংগীতের একধরনের নিজস্বতা আছে। যা রাগ বা তালের সাথে শতভাগ সামঞ্জস্যপূর্ণ। মূলত, খাঁটি ভারতীয় সংগীতের রাগ ও তাল যথাসম্ভব ঠিক রেখে, অ-ভারতীয় বাদক ও বাদ্যযন্ত্র দিয়ে বিশেষ সুর ও ব্যঞ্জনা তৈরি করতে চেয়েছিলাম। আমার আশা ছিল এ থেকে ভালো কিছু বেরিয়ে আসবে। অবশ্য এ জন্য আমাকে অনেক সমালোচনাও সহ্য করতে হয়েছিল। কিন্তু এখন মানুষের চিন্তা-ভাবনা বদলেছে। আমি যা ৩০-৪০ বছর আগে করেছিলাম, তা এখনো আমাকে সম্মানিত করছে। প্রশ্ন: আপনি গুরু হিসেবে পরিচিত। সঙ্গীতের পাশাপাশি আপনি মাদকের বিরুদ্ধেও সোচ্চার। এ ব্যাপারে কিছু বলুন। রবি:আমি মদ্যপান বা এ ধরনের ব্যাপারগুলো থেকে দূরে থাকতাম। আমি খুব ভালো একটা প্ল্যাটফর্ম পেয়েছিলাম। ভারতের এক মহারাজা আমার খুব সমাদর করেছিলেন। কিন্তু পরে, ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে আমার খুব ঘনিষ্ট বন্ধুদের সাথে এসব নিয়ে মনোমালিন্য হয়। জর্জ আমার ছাত্র ছিল এবং আমি ছিলাম তার গুরু। অবশ্য এর পেছনে ধর্মীয় বিষয়ও ছিল। সংগীতই আমাকে ‘গুরু’ বানিয়েছে। হ্যাঁ, আমি সবসময় বলতাম মদ, মাদক, এল.এস.ডি—এসব পরিত্যাগের জন্য। তারা অনেকেই এগুলোতে আসক্ত ছিল। তারা চিত্কার করত, খারাপ ব্যবহার করত। তাদের সংগীতের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বলতাম। বোঝাতে চাইতাম, সংগীতের এক বিশেষ ক্ষমতা, যার মাধ্যমে তুমি অনেক উঁচুতে পৌঁছাতে পারবে—এমনকি খোলা আকাশে উড়ে বেড়ানোও সম্ভব... প্রশ্ন: সংগীতের কোন দিকটি মানুষকে এসব থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করত বলে আপনি মনে করেন? রবি: আমি এ সম্পর্কে লিখেছি। আমি বহুবার বলেছি যে, মন্টির ভেতরে পছন্দ করার মতো একটা কিছু ছিল। সবই দুই আঙুলের রহস্য। আর তরুণ-তরুণীরা এই রহস্যে মোহিত হতো। দুই আঙুল—ভালোবাসার প্রতীক, দেখতে অনেকটা ‘ভি’-এর মতো—যা শুধু সুরে সুরে শান্তি আর ভালোবাসার কথাই বলে। আর সংগীত নেই কোথায়? এটা একটা ঘটনাপ্রবাহের মতো। পিকনিক পার্টি থেকে শুরু করে সবখানেই সংগীত। এমনকি দেখতে ভালো নয়, এমন অনেক কিছুতেই সংগীতের ছন্দ আছে। প্রশ্ন: আপনি মাদক খুব অপছন্দ করেন। আচ্ছা, মজা করেই জানতে চাচ্ছি, আপনি যদি শুনতে পান, যুদ্ধ আর মাদকের বদলে সবখানে, সবার মধ্যে মানবিক সম্প্রীতি বিরাজ করছে, তখন কেমন লাগবে আপনার? রবি: চমত্কার! চমত্কার! আমি ধর্মীয় ভণ্ডামি—এই তন্ত্র-মন্ত্র—এসব সত্যি সত্যি ঘৃণা করি। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ আমাকে অসুখী করে তোলে। যে যার কাজ করুক, যে যার মতো থাকুক, মানুষ নিজেকে ভালো রাখুক, তার চারপাশের মানুষকে ভালো রাখুক। আমি চাই, খুব করে চাই—মানুষের ভেতরের সব ক্রোধ দূর হোক।