এক রমণীর ছবি

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০১৩, ১৯:০৩
আমার দিদিমা আর সবার দিদিমার মতোই একজন বুড়ো মহিলা ছিলেন। গত কুড়ি বছর ধরে আমি তাঁকে চামড়া কুঁচকানো বুড়ি হিসেবেই দেখে আসছি। লোকজন বলে, তিনি একসময় যুবতী ছিলেন, সুন্দরী ছিলেন এবং তাঁর একজন স্বামীও ছিল। কিন্তু এখন এসব বিশ্বাস করতেই কষ্ট হয়। ড্রইংরুমে চুল্লির ওপরের তাক বরাবর দেয়ালে আমার দাদুর একটা ছবি টাঙানো ছিল। তিনি বড় পাগড়ি ও ঢিলেঢালা পোশাক পরতেন। তাঁর লম্বা সাদা দাড়ি বুকের শ্রেষ্ঠ অংশটুকু ঢেকে রাখত আর দেখে মনে হয়, তাঁর বয়স একশ বছর তো হবেই। তাঁর চেহারা দেখে মনে হয় না, তাঁর স্ত্রী ও সন্তান থাকতে পারে। তাঁর চেহারাই বলে দেয়, তাঁর গণ্ডা গণ্ডা নাতি-নাতনি। আমার দিদিমার যুবতী ও সুন্দরী থাকার ব্যাপারটা অনেকটা বৈপ্লবিক চিন্তার মতোই। দিদিমা ছোটবেলায় যেসব খেলা খেলতেন, আমাদের সে কথা শোনাতেন। এসব আমাদের কাছে অবিশ্বাস্য ও দিদিমার জন্য বেমানান মনে হয়েছে। নাতিদের নিয়ে বলা তাঁর গল্প আমরা যেভাবে নিতাম, তাঁর খেলার গল্পও আমাদের কাছে এর বেশি কিছু ছিল না। দিদিমা বরাবরই একটু খাটো, মোটা এবং একটু সামনে ঝুঁকে পড়া। তাঁর মুখমণ্ডলে একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত কুঁচকানো দাগের ছড়াছড়ি। আমরা খুবই নিশ্চিত, তাঁকে যেমন দেখেছি, আগেও তেমনই ছিলেন। দিদিমা এতই বুড়ো যে, তাঁর পক্ষে আর বুড়ো হওয়া সম্ভব নয়। তিনি সুন্দর ছিলেন বরাবরই, আকর্ষণীয় কখনো নয়। ধবধবে নিদাগ সাদা কাপড় পরে তাঁর সাম্য ঠিক রাখতে এক হাতে কোমরে ভর দিয়ে লেংড়ে লেংড়ে বাড়িতে ঘুরে বেড়াতেন আর অন্য হাতে জপমালার দানা গুণতেন একটির পর একটি। তাঁর রজতশুভ্র চুল তাঁর পাণ্ডুর ও কুঞ্চিত মুখমণ্ডলের ওপর অবিন্যস্তভাবে ছড়িয়ে থাকত আর ঠোঁটে সবসময় ছিল অশ্রুত প্রার্থনা। তিনি পার্বত্যাঞ্চলে শীতের ল্যান্ডস্কেপের মতো, চারদিকে পরিব্যাপ্ত এক সাদা স্নিগ্ধতা—যা কেবল শান্তি ও তৃপ্তির নিঃশ্বাস নেয়। আমি আর আমার দিদিমা ভালো বন্ধু। আমার বাবা-মা যখন শহরে বসতি স্থাপন করতে গেলেন, আমাকে রেখে গেলেন তাঁরই কাছে। তখন থেকেই আমরা একত্রে আছি। আমাকে সকালে ঘুম থেকে ডেকে তুলতেন, স্কুলের জন্য তৈরি করতেন। একঘেয়ে স্বরে তিনি তাঁর প্রাতঃকালীন প্রার্থনা করতেন, আমাকে গোসল করানো, কাপড় পরানোর সময়ও প্রার্থনা করতেন এই আশায় যে, আমি তা শুনব এবং মুখস্ত করব। আমি তাঁর কথা শুনতাম, কারণ তাঁর কণ্ঠস্বর আমার ভালো লাগত। তবে প্রার্থনা মুখস্ত করার জন্য তিনি আমাকে জ্বালাতেন না। তারপর নিয়ে আসতেন আমার কাঠের শ্লেট, এটা ধুয়ে তাতে হলুদ চকের প্লাস্টার লাগাতেন। পোড়ামাটিতে তৈরি একটি কালির নল-খাগড়ার কলম, সব একত্রে বেঁধে একটি পুঁটলিতে আমার হাতে তুলে দিতেন। পুরু শুকনো রুটিতে মাখন লাগিয়ে তাতে চিনি ছিটিয়ে আমাদের নাস্তা হতো। তারপর আমরা স্কুলে যেতাম। তিনি গ্রামের কুকুরগুলোর জন্য কিছু শুকনো বাসি চা-পাতা সাথে নিতেন। আমার দিদিমা সবসময় আমার সাথে স্কুলে যেতেন, কারণ স্কুলটা ছিল মন্দিরসংলগ্ন। পুরোহিতই আমাদের বর্ণমালা পড়াতেন ও সকালের প্রার্থনা করাতেন। শিক্ষার্থীরা বারান্দার দু-পাশে দাঁড়িয়ে সুর করে বর্ণমালা পড়ত কিংবা কোরাসে প্রার্থনা করত। আমার দিদিমা মন্দিরের ভেতরে বসে ধর্মগ্রন্থ পড়তেন। যখন আমাদের দুজনের পড়া শেষ হতো, আমরা একসাথে হেঁটে হেঁটে ফিরে আসতাম। মন্দিরের দরজায় গ্রামের কুকুরগুলোর সাথে আমাদের দেখা হতো। বাড়ি পর্যন্ত আমাদের অনুসরণ করত, ঘো ঘো করত আর আমাদের ছুড়ে দেওয়া চা-পাতার জন্য নিজেদের মধ্যে মারামারি করত। আমার মা-বাবা যখন শহরে ভালো করেই বসত গাড়লেন, আমাদের নিয়ে যেতে লোক পাঠালেন। আমাদের বন্ধুত্বে সেটাই এক টার্নিং পয়েন্ট। শহরে এসে আমরা দুজন যদিও একই রুমে ঘুমাতাম, তিনি আমার সাথে আর স্কুলে আসতেন না। আমি মোটরবাসে একটি ইংরেজি স্কুলে যেতে শুরু করি। রাস্তায় কোনো কুকুর ছিল না। দিদিমা আমাদের শহুরে বাড়ির আঙিনায় চড়ুই পাখিদের খাওয়াতে শুরু করলেন। বছর যতই গড়াল, আমাদের দেখাদেখি ততই কমে এল। প্রথম দিকে কিছু সময় তিনি আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতেন। স্কুলের জন্য তৈরি করতেন। স্কুল থেকে ফেরার পর শিক্ষক কী পড়িয়েছেন—জানতে চাইতেন। আমি তাঁকে শোনাতাম কিছু ইংরেজি শব্দ, পাশ্চাত্যের বিজ্ঞান ও সভ্যতার কিছু কথা, মাধ্যাকর্ষণ বল, আর্কিমিডিসের তত্ত্ব, পৃথিবী গোলাকার—ইত্যাদি। এতে তিনি অসন্তুষ্ট হতে থাকেন। তিনি আমাকে আর কোনোভাবে পড়াশোনায় সাহায্য করতে পারছেন না। ইংরেজি স্কুলে যা পড়ানো হয়, তাতে তাঁর কোনো আস্থাই নেই; তিনি খুবই অসন্তুষ্ট যে, এখানে ঈশ্বর ও ধর্মের কোনো শিক্ষা নেই। একদিন বাড়ি ফিরে ঘোষণা করলাম, আমাদের এখন সংগীতশিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। তিনি খুবই বিচলিত হয়ে পড়লেন। তিনি মনে করেন, সংগীত লাম্পট্যের আবেদন সৃষ্টি করে। তিনি নিশ্চিত, সংগীতের একচ্ছত্র অধিকার বেশ্যা ও ভিক্ষুকদের—এটা কেনো ভদ্রলোকের বিষয় নয়। এটা জানার পর তিনি কদাচিত্ আমার সাথে কথা বলেছেন। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে শুরু করলাম, আমাকে একটি নিজস্ব রুম দেওয়া হলো। ফলে আমাদের দুজনের যে সাধারণ যোগসূত্র, তা ছিন্ন হলো। আমার দিদিমা নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়ে তাঁর নিঃসঙ্গতা মেনে নিলেন। তিনি তাঁর চরকায় সুতাকাটার কাজ করতেন, কারও সাথে কথা বলতে বেরোতেন না। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি চরকায় কাজ করতেন আর প্রার্থনা করতেন। বিকেলে কেবল একটু আয়েশ করে চড়ুই পাখিদের খাওয়াতে বের হতেন। বারান্দায় পাম রুটি ছোট ছোট টুকরো করতেন, শত শত চড়ুই তাঁকে ঘিরে চেঁচামেচিতে একটি যথার্থ পাগলাগারদের সৃষ্টি করত। কিছু পাখি এসে তাঁর পায়ে বসত, কিছু তাঁর ঘাড়ে; কিছু পাখি এমনকি তাঁর মাথায়ও বসত। তিনি মুচকি হাসতেন কিন্তু পাখি তাড়িয়ে দেননি কখনো। সারা দিনের মধ্যে এই আধঘণ্টা ছিল তাঁর জন্য সবচেয়ে সুখের সময়। আমি যখন উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি জানি, আমার সিদ্ধান্তে তিনি মুষড়ে পড়বেন। আমি পাঁচ বছর দূরে থাকব, আর তাঁর এই বয়সে কী হয়, কেউ বলতে পারে না। কিন্তু আমার দিদিমা জানেন। তিনি মোটেও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েননি। তিনি আমাকে রেল স্টেশনে বিদায় জানাতে এলেন। তিনি কোনো কথা বলেননি কিংবা কোনো উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেননি। প্রার্থনায় তাঁর ঠোঁট নড়েছে। তাঁর মন প্রার্থনায় বিলীন হয়ে গেছে। তাঁর আঙুল জপমালার পুঁতি গুণছে। নিঃশব্দে তিনি আমার কপালে চুমো খেলেন, যখন আমি বিদায় নিলাম, আমার কপালে তাঁর সিক্ত ঠোঁটের ছোঁয়া আমাদের দুজনের শারীরিক সংযোগের শেষ চিহ্ন হিসেবে লালন করতে থাকলাম। যা আশঙ্কা ছিল, ঘটেনি। পাঁচ বছর পর আমি যখন বাড়ি ফিরে এলাম, তাঁর সাথে আমার স্টেশনেই দেখা হলো। তাঁর বয়স মনে হয় এক দিনও বাড়েনি। এখনো তাঁর আমার সাথে কথা বলার সময় নেই। তিনি যখন আমাকে তাঁর বাহুতে জড়িয়ে ধরেছেন, আমি শুনতে পাই, তিনি তাঁর প্রার্থনার মন্ত্র আবৃত্তি করে যাচ্ছেন। এমনকি আমি যেদিন ফিরে এলাম, সেই দিনটিতে তাঁর সবচেয়ে সুখের সময় কেটেছে আরও দীর্ঘক্ষণ পাখিদের খাইয়ে, আদর করে পাখিদের গালাগাল দিয়ে। সন্ধ্যায় তাঁর ওপর একটি পরিবর্তন নেমে এল। তিনি প্রার্থনায় বসলেন না, তিনি প্রতিবেশী মহিলাদের ডেকে জড়ো করলেন। পুরোনো একটি ড্রাম এনে গান গাইতে শুরু করলেন। অনেকক্ষণ ধরে তিনি জীর্ণ ড্রামের ঝুলে পড়া পিঠে পিটিয়ে গেলেন এবং যোদ্ধাদের বাড়ি ফেরার গান গাইলেন। নিজের ওপর বেশি চাপ নেওয়া ঠিক হবে না—এই বলে আমরা তাঁকে নিরস্ত করতে চেষ্টা করি। আমার জানা মতে, সেই প্রথম তিনি প্রার্থনা করলেন না। পরদিন সকাল থেকেই তিনি অসুস্থ। হালকা জ্বর, ডাক্তার বললেন—সেরে যাবে। কিন্তু আমার দিদিমা ভাবলেন ভিন্ন কথা। তিনি আমাদের ডেকে বললেন—তাঁর সময় ঘনিয়ে এসেছে। তিনি আরও বললেন, জীবন শেষ হবার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি একটি প্রার্থনায় যোগ দেননি, এখন কথা বলে আর সময় নষ্ট করতে চাচ্ছেন না। আমরা তাঁর কথার প্রতিবাদ করলাম। কিন্তু তিনি আমাদের প্রতিবাদ অগ্রাহ্য করলেন। তিনি প্রশান্তভাবে বিছানায় শুয়ে প্রার্থনার মন্ত্র পড়ছেন, আর জপমালা গুণছেন। আমরা সন্দেহ করার আগেই তার ঠোঁটের স্পন্দন থেমে গেল। তাঁর নিষ্প্রাণ আঙ্গুল থেকে জপমালা পড়ে গেল। একান্তে শান্তিময় বিবর্ণ ছায়া তাঁর মুখমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা জেনে গেছি, তিনি আর নেই। আমরা তাঁকে বিছানা থেকে তুলি, আচার অনুযায়ী তাঁকে নিচে নামিয়ে রেখে লাল শবাচ্ছাদনে ঢেকে দিই। কয়েক ঘণ্টা শোকবিহ্বল থাকার পর আমরা শেষকৃত্যের আয়োজন করতে বেরিয়ে যাই। সন্ধ্যায় আমরা শক্ত খাটিয়া নিয়ে তাঁর কক্ষে প্রবেশ করি। শেষকৃত্যের জন্য তাঁকে তুলে নেওয়া হবে। সূর্য অস্ত যাচ্ছে। অস্তমান সূর্যের রশ্মি আমার দিদিমার কক্ষে ও বারান্দায় সোনালি আলোর আভা ছড়িয়ে দিয়েছে। আমরা উঠানের অর্ধেক গিয়ে থামলাম। সমস্ত বারান্দা, তাঁর কক্ষ এবং লাল আচ্ছাদনে ঢাকা তাঁর মৃতদেহের নিকট পর্যন্ত হাজার চড়ুই পাখি মেঝেতে বসে আছে। কোনো কিচিরমিচির শব্দ নেই। পাখিগুলোর জন্য আমাদের দুঃখ লাগল। আমার মা পাখির জন্য রুটি নিয়ে এলেন। রুটি ভেঙে ছোটো ছোটো টুকর করলেন। আমার দিদিমা যেভাবে পাখিদের খাবার ছিটিয়ে দিতেন, তিনিও সেভাবে ছিটিয়ে দিলেন। চড়ুই পাখিরা খাবারের দিকে তাকিয়েও দেখল না। যখন আমরা দিদিমার মরদেহ নিয়ে বেরিয়ে গেলাম, পাখিরা নিঃশব্দে উড়ে গেল। সুইপার পরদিন সকালে রুটির সব গুঁড়ো ঝাঁট দিয়ে ময়লা রাখার পাত্রে এনে তুলল। খুশবন্ত সিং (জন্ম ১৯১৫) দেশ-বিদেশে সবচেয়ে বেশি পঠিত ভারতীয় ঔপন্যাসিক, ঐতিহাসিক ও সাংবাদিক। ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত ‘ট্রেন টু পাকিস্তান’ তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। তিনি বহুসংখ্যক স্মরণীয় গল্পের লেখক। ‘হিস্ট্রি অব শিখ’ একটি প্রামাণ্য ইতিহাসগ্রন্থ। তিনি পাঞ্জাবি ও উর্দু ভাষার সেরা লেখকদের অনেক রচনা অনুবাদ করেছেন। খুশবন্ত সিং ইংরেজি ভাষায় লেখেন।]