ধসে গেছে স্পেনের রিয়েল এস্টেট মার্কেট। এ অবস্থায় যেসব বিদেশি অন্তত ১ লাখ ৬০ হাজার ইউরোতে একটি বাড়ি কিংবা ফ্ল্যাট কিনবে তাদেরকে রেসিডেন্সি পারমিট (বসবাসের অনুমোদন) দেয়ার পররিকল্পনা করছে স্পেনের সরকার। উদ্দেশ্য একটাই— রিয়েল এস্টেট মার্কেটকে পুনরুজ্জীবিত করা। কারণ, কযেক লক্ষ বাড়ি কিংবা ফ্ল্যাট পড়ে আছে অবিক্রীত অবস্থ্ায়। স্পেনের বাণিজ্য সচিব জেমস গার্সিয়া-লেগাজ সম্প্রতি জানিয়েছেন, বিশেষত চীন ও রাশিয়ার বিনিয়োগকারীদের টার্গেট করেই তাদের এমন চিন্তা-ভাবনা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাসিন্দা না হওয়ার কারনে এখন পর্যন্ত তারা বাড়ি কিনতে গেলে নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়। গার্সিয়া-রেগাজ আরো জানান, ইউরো জোনের অন্য দুই বিপর্যস্ত অর্থনীতির দেশ পর্তুগাল ও আয়ারল্যান্ডের পদাংক অনুসরন করেই রেসিডেন্সি পারমিট সহজ করার বিষয়ে নমনীয় হতে যাচ্ছে স্পেন। হাউজিং মার্কেটকে উদ্দীপ্ত করতে স্পেনের সামনে এ ছাড়া আর কোন রাস্তা নেই।
স্পেন সাধারনত ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশের নাগরিকদেরকে ৯০ দিনের ভিসা প্রদান করে। নতুন প্রস্তাবনায় রেসিডেন্সি পারমিটের মেয়াদ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে সত্য; কিন্তু এটি সত্য যে, অসীম সময়েরর কথা মোটেও ভাবা হচ্ছে না এবং তাদেরকে কাজ করারও অনুমতি দেয়া হবে না। স্প্যানিশ সরকার নতুন প্রস্তাবনাটি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করার পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। তবে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী একটি কথা বলেছেন, বিদেশীদের আকৃষ্ট করানো ছাড়া বাড়ির মূল্য কিছুতেই উঠানো যাবে না, যেমনটি আগে ছিল। সরকারের উপাত্ত অনুযায়ী, স্পেনে ৭ লাখ বাড়ি পড়ে আছে অবিক্রীত অবস্থায়। হাউজিং সেক্টরের ব্যাপকভাবে স্ফীত হওয়ার পর ২০০৮ সালে মহামন্দা শুরু হওয়াই এর কারন । ফলশ্রুতিতে নির্মাণ ক্ষেত্রে নেমে এসেছে চরম স্থবিরতা। অথচ এটিই ছিল দেশের অর্থনীতির মূল ইঞ্জিন বা চালিকা শক্তি। দেশের ব্যাংকগুলো কুঋণের ভারে এখন পঙ্গুপ্রায়। ব্যাংকিং সমস্যা চরম আকার ধারন করে গত মে মাসে। সরকার নিয়ন্ত্রিত রিয়েল এস্টেট ঋণদাতা প্রতিষ্ঠাণ ‘বাংকিয়া’ পৌঁছে যায় প্রায় দেউলিয়ার কাতারে। বাংকিয়ার সম্পত্তি সংশ্লিষ্ট ক্ষতি এবং অন্যান্য ছোটখাটো ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারনে ব্যাংকিং খাতের উত্তোরনের জন্য ইউরো জোনের কাছে ১০০ বিলিয়ন ডলার চাওয়া হয়েছে।
স্পেনে বন্ধকিঋণ প্রদানের অক্ষমতা ক্রমেই বাড়ছে। ব্যাংক অফ স্পেন জানিয়েছে, গত সেপ্টেম্বরে কুঋনের স্তর টোটাল লোন পোর্টফোলিওর ১০.৭ শতাংশে (১৮২ বিলিয়ন ইউরো) পৌঁছে। রিয়েল এস্টেট বিশেষজ্ঞ ও মাদ্রিদের বিজনেস স্কুল আইএএসই-এর অধ্যাপক জোসে লুইস সুয়ারেজ রেসিডেন্সি পারমিট দেয়ার বিষয়টিকে সঠিক পদক্ষেপ বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, স্পেনে সেকেন্ডারি হোম মার্কেটের উজ্জ্বল ভবিষ্যত রয়েছে এবং এটা শুধুমাত্র বিদেশীদের কারনে। গত বছর বিদেশী ক্রেতারা স্পেনে আগের বছরের তুলনায় বাড়ি কিনেছে ৬ শতাংশ বেশি। রাশিয়ানরা কিনেছে ১৭৫৭টি ইউনিট’ যা আগের বছরের চেয়ে ২৮ শতাংশ বেশি । চীনাদের ক্রয় ৭ শতাংশ বাড়লেও তা বিদেশীদের মোট বাড়ি ক্রয়ের মাত্র ৪ শতাংশ।
মাাদ্রিদের ইনস্টিটিউটো ডি এমপেরেসা বিজনেস স্কুলে নিযুক্ত আরেক রিয়েল এস্টেট বিশেষজ্ঞ মিগুয়েল হার্নান্দেজ সরকারের পরিকল্পনা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, এতে হয়তো চীনা ক্রেতারা খুব বেশি আকৃষ্ট হবে না । রাশিয়ানরা এরই মধ্যে কোস্ট ডেল-এর মতো ছুটি কাটানোর অঞ্চলগুলোয় বাড়ি ক্রয়ে ব্যাস্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু উপকুলীয় ও অন্যান্য আবাসিক অঞ্চলগুলো বাদ দিয়ে চীনাদের ঝোঁক শিল্প অঞ্চলগুলোর দিকে বেশি। এ নিয়েই সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। কারন, স্প্যানিশ সরকার শিল্প অঞ্চলগুলোয় চীনাদের জায়গা করে দিতে খুব একটা ইচ্ছুুক নয়।
উত্তর ইউরোপের অবসরভোগী হাজার হাজার রৌদ্রপিয়াসী এরই মধ্যে স্পেনে বসবাস করছে। বাড়ির মূল্য বৃদ্ধিতে যারা এক সময় মূল ভূমিকা রেখেছিলো। কিন্তু অর্থনীতির রমরমা ভাব কেটে যাওয়ায় ইউরোপের লোকেরা আর আগের মতো স্পেনে আসছে না। সুয়ারেজ মনে করেন, ইউরোপীয়দেরকে গৌণ ভেবে মূলত টার্গেট করা উচিত চীনাদের।কারন, মহামন্দা তাদের অর্থনীতিতে বলতে গেলে প্রভাবই ফেলতে পারেনি। প্রয়োজনে তাদের শিল্পাঞ্চলেও জায়গা করে দেয়া উচিত। বাড়ি কিংবা জায়গা ক্রয়ের জন্য চীনাদের মধ্যে হিড়িক পড়লে আগের অবস্থায় চলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে স্পেনের হাউজিং সেক্টরের। অবশ্য রাশিয়ার ক্রেতাদেরকেও খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। তাদের অর্থনীতিও এগুচ্ছে দ্রুতগতিতে। সুয়ারেজ আরো বলেছেন, এ ছাড়াও অনেক পদক্ষেপ গ্রহন করার প্রয়োজন রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো, হাউজিং ডিস্ট্রিবিউশান চ্যানেলের সংস্কার। রিয়েল এস্টেট ব্রোকারদের জন্য উদ্দীপনা প্যাকেজও ঘোষণা করা যেতে পারে। তবেই নিশ্চিত করে বলা যাবে, ফের চাঙা হতে যাচ্ছে স্পেনের রিয়েল এস্টেট খাত।
-আইএইচটি অনুসরণে
