বর্তমান সরকারের সময়কালে সামষ্টিক অর্থনীতি আরো শক্তিশালী হয়েছে, তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবেলা করে দেশের প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে সামষ্টিক ও রাজস্ব নীতি গ্রহণে সাবধানতা অবলম্বন করার প্রয়োজন হবে বলে উল্লেখ করেছে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)। বর্তমান সরকারের গত চার বছরে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি মূল্যায়নে এক প্রতিবেদনে জিইডি এ বিষয় উল্লেখ করেছে। এতে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতি সার্বিক মন্দা অতিক্রম করছে। অন্যদিকে উন্নত বিশ্বে প্রত্যাশা মোতাবেক পুনরুদ্ধার কার্যক্রম চলছে না। উন্নত দেশসমূহে বিপুল বাজেট ঘাটতি, উচ্চ সরকারি ঋণ ও বেকারত্বের হার বৃদ্ধিসহ ইউরো অঞ্চলের কয়েকটি দেশের সার্বভৌম ঋণ সমস্যা ও ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি বৃদ্ধির কারণে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির গতিকে ঝুঁকিপূর্ণ করেছে। অন্যদিকে বিকাশমান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দ্রুত পুনরুদ্ধারের সাথে মূল্যস্ফীতির চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় কিছু নিম্নমুখী ঝুঁকি এখনও রয়ে গেছে, যা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর প্রতিবেদনে ফুটে উঠেছে। যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি উন্নত দেশের চলতি হিসাবে বিশাল আকারের ঘাটতি এবং জ্বালানি তেল রপ্তানিকারক দেশ ও চীনসহ কয়েকটি বিকাশমান অর্থনীতির চলতি হিসাবে বিশাল আকারে উদ্বৃত্ত বিশ্ব অর্থনীতিকে ভারসাম্যহীন করে তুলেছে। এ ভারসাম্যহীনতা কমিয়ে আনার ব্যর্থতা বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে নাজুক অবস্থায় ফেলতে পারে। এছাড়া আইএমএফ-এর পক্ষ থেকে আশঙ্কা করা হয়েছে ২০১০ সালে বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যেখানে ৫ শতাংশ ছিল, তা ২০১২ সালে সাড়ে ৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতি আরেক দফা মন্দার কবলে পড়তে পারে বলে অর্থনীতিবিদগণ আশংকা করছেন। যদিও বিদ্যমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা বর্তমান সরকারের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধিকে তেমন একটা সংকটাপন্ন অবস্থায় ফেলতে পারেনি। তবুও প্রবৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত রাখার জন্য বাংলাদেশেকে সামষ্টিক ও রাজস্ব নীতি গ্রহণে সাবধানতা অবলম্বন করার প্রয়োজন হবে।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ৬ জানুয়ারি ২০০৯ তারিখে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। ২০০৮-০৯ অর্ধ সময় বাজেট বাস্তবায়নের পর বতর্মান সরকার ৪টি পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করেছে।
৪ বছরে অগ্রগতি নিয়ে জানতে চাইলে জিইডি সদস্য ড. শামসুল আলম ইত্তেফাককে বলেন, স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীকে সামনে রেখে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রথমবারের মত দীর্ঘমেয়াদি রূপকল্প হিসেবে ‘বাংলাদেশ প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০১০-২১)’ শীর্ষক পরিকল্পনা দলিল প্রণয়ন করেছে। এ পরিকল্পনার মৌলিক উদ্দেশ্য হচ্ছে উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন এবং ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্যআয়ের দেশে পরিণত করা, যেখানে দারিদ্র্য সর্বনিম্ন পর্যায়ে অবস্থান করবে এবং অর্থনৈতক উন্নয়নে আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস পাবে। ইতিপূর্বে অবশ্য সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সাথে সঙ্গতি রেখে তত্ত্বাবধায়ক সরকার অনুমোদিত দারিদ্র্য নিরসন কৌশলপত্রটি (২০০৯-১১) সংশোধন করা হয়। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রায় দীর্ঘ ১০ বছর পর প্রণয়ন করা হয়। বাজেট বরাদ্দের সাথে বিগত বছরগুলোতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন হার ছিল উল্লেখযোগ্য। ২০০৮-০৯ অর্থ বছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন হার ছিল ৮৬ শতাংশ, পরবর্তী বছরগুলোতে যা যথাক্রমে ৯১ শতাংশ, ৯২ শতাংশ এবং ৯২ শতাংশ ছিল। উন্নয়ন বাজেটের বরাদ্দ অনেকাংশে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার চাহিত বরাদ্দ অনুসারে করা হলেও কোন কোন ক্ষেত্রে বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণে সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ হ্রাস পেয়েছে।
মোট দেশজ আয় ও প্রবৃদ্ধি: অগ্রগতির প্রতিবেদনে দেখা যায়, বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ২০০৮-০৯ অর্থ বছরে জিডিপি ছিল ৮৯ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা পূর্ববর্তী অর্থ বছরে ছিল ৭৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার; অর্থাত্ এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ জিডিপি বৃদ্ধি পেয়েছে (বৃদ্ধির হার ৯.৮%)। অন্যদিকে বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণকালে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০১০-১১ অর্থ বছরে ৬ দশমিক ৭-এ উন্নীত হয়। সার্বিক বিশ্ব অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় উল্লেখযোগ্য দুটি দেশ জার্মানি ও ইন্দোশিয়ার সাথে কেবল বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল অবস্থায় অব্যাহত প্রবৃদ্ধি অর্জন করে যাচ্ছে।
রপ্তানি আয়:২০০৮-০৯ অর্থ বছরে ১৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় হয়েছে এবং সর্বশেষ ২০১১-১২ অর্থ বছরে বাংলাদেশ ইতিহাসে সর্বোচ্চ ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় করতে সক্ষম হয়েছে। তবে গত চার বছরে রপ্তানি খাতে গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৬.৫ শতাংশ।
বৈদেশিক কর্মসংস্থান:প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০৮-০৯ সনে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ মানুষ বিদেশে কর্মসংস্থান লাভ করে। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা এবং বাংলাদেশের প্রধানতম শ্রমবাজার মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা রাজনৈতিকভাবে অস্থির থাকা সত্ত্বেও বর্তমান সরকারের সমন্বিত প্রয়াসের ফলে গত চার বছরে ২২ লাখ শ্রমিক বিদেশে গমন করেছে। শুধু ২০১১-১২ অর্থ বছরেই ৬ লাখ ৯১ হাজার ৪০২ জনের বৈদেশিক কর্মসংস্থান হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি:আইএমএফ-এর সার্বিক বিশ্ব পণ্য মূল্যসূচক অনুযায়ী ২০১০ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সময় ৩২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি প্রধানত ২০১০ সালের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে প্রকট হলেও সাম্প্রতিক সময় উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা জ্বালানি তেলের মূল্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামঞ্জস্যপূর্ণ মুদ্রানীতি গ্রহণ করা হলে মূল্যস্ফীতির ক্রমবর্ধমান হার নামিয়ে আনা সম্ভব বলে উল্লেখ করা হয়।
দারিদ্র্য নিরসন:২০০৫ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪০ শতাংশ। ২০১০ সালে দারিদ্র্যের হার হ্রাস পেয়ে হয়েছে ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। প্রতি বছর দারিদ্র্য কমছে ২ দশমকি ৪৬ শতাংশ হারে, এ হিসেবে ২০১২ সালে দারিদ্র্যের প্রাক্কলিত হার হবে ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ। সেই সংগে আয়-বৈষম্য না বেড়ে কিছুটা নিম্নমুখী রয়েছে। ২০০৮-০৯ অর্থ বছরে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনি কর্মসূচিতে ব্যয় হয় ১২ হাজার ১৯৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, যা ছিল উক্ত বছরের জিডিপির ১ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং বাজেটের ১৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ। পরবর্তী বছরসমূহে এ খাতে ব্যয় উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ২০১২-১৩ অর্থ বছরে বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২২ হাজার ৭৫০ কোটি ৫৫ লাখ টাকা যা প্রাক্কলিত জিডিপির ২ দশমিক ১৮ শতাংশ এবং বাজেটের ১১ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি:সর্বশেষ প্রকাশিত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অর্জন সম্পর্কিত প্রতিবেদন ২০১১-এ দেখা যায় বাংলাদেশে ইতিমধ্যে ‘প্রাথমিক শিক্ষায় প্রকৃত ভর্তির হার’ এবং ‘প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় লৈঙ্গিক সমতা আনয়ন’ বিষয়ক যথাক্রমে ২ ও ৩ এমডিজি লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। বাংলাদেশ ‘চরম দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নির্মূলকরণ’ সংশি¬ষ্ট ১নং এমডিজি; ‘সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন’ সংক্রান্ত ২নং এমডিজি এবং ‘৫ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যুহার কমানো’ সংক্রান্ত ৪নং এমডিজি অর্জনের পথে অগ্রগামী রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ‘মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়ন’ সংক্রান্ত ৫নং এমডিজি, ‘এইচআইভি/এইডস, ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের বিস্তার কমিয়ে আনা’ সংক্রান্ত ৬নং এবং ‘পরিবেশগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণ’ সংক্রান্ত ৭নং এমডিজি অর্জনের পথে রয়েছে। তবে জাতীয় আয়ে সর্বনিম্ন (২০ শতাংশ) জনসংখ্যার সম্পদের হিস্যা বৃদ্ধি; ক্ষুধা দূরীকরণ; জনসংখ্যা অনুপাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি; ‘প্রাথমিক শিক্ষা পূর্ণকরণ’ এবং এমডিজি ৬ ও ৭-এর বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশকে আরও প্রচেষ্টা নিতে হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
‘বৈশ্বিক সহযোগিতা’ সংক্রান্ত ৮নং এমডিজি পর্যালোচনায় প্রতিফলিত হয় যে, বিশ্বের উন্নত দেশসমূহ এবং বাংলাদেশসহ অন্যান্য দরিদ্র দেশসমূহের মধ্যে এমডিজি অর্জনের ব্যাপারে আরও কার্যকরী সহযোগিতার কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
