এমন বিস্ময়কর দৃশ্য ক্রিকেট আগে দেখেছে কি না, সন্দেহ। অস্ট্রেলিয়া দল তখন নিশ্চিত জয়ের জন্য ব্যাট করছে; উইকেটে আছেন মাইকেল ক্লার্ক ও ম্যাথু হেইডেন। অথচ এই অবস্থায় সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডের ১০ হাজারের ওপরে দর্শক সবাই উঠে দাঁড়িয়ে ‘উইকেট, উইকেট’ বলে চিত্কার করছেন! সিডনির সবাই রাতারাতি অস্ট্রেলিয়া বিদ্বেষী হয়ে গেলেন! না, সিডনির মানুষ তাদের প্রিয় ক্রিকেটারকে আরেকবার উইকেটে দেখার জন্য নিজের দলেরই একটি উইকেট পতন প্রার্থনা করে চিত্কার করছিলেন। এই চিত্কার চা-বিরতির মিনিট চল্লিশেক আগে গর্জনে পরিণত হল। তখন পুরো সিডনি জুড়ে একটাই আওয়াজ— হাসি, হাসি, হাসি।
শেষ পর্যন্ত মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে হাসিকে নিজেকে এই বিব্রতকর পরিস্থিতি থামাতে হল। অনুরোধ করতে হল, দর্শকরা যেন নিজের দলের উইকেট পতনের এই প্রার্থনা বন্ধ করেন। কিন্তু চিত্কার কি তাতে বন্ধ হয়! অবশেষে দর্শকের প্রবল আনন্দ-উল্লাসের ভেতর দিয়ে আউট হয়ে ফিরে এলেন মাইকেল ক্লার্ক। আর পুরো সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ড দু’ পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে অভিবাদন জানাল জীবনে শেষবারের মতো টেস্ট ক্রিকেট মাঠে ব্যাট হাতে নামতে থাকা মাইকেল হাসিকে। শুধু টেস্ট ক্রিকেট নয়, সম্ভবত নজিরবিহীন এই অভিবাদনের ভেতর দিয়ে জীবনে শেষবারের মতো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ব্যাট করতে নামলেন অস্ট্রেলিয়ানদের প্রিয়তম ক্রিকেট— মিস্টার ক্রিকেট মাইক হাসি।
হ্যাঁ, গতকাল সিডনি টেস্টের শেষ দিন সকালে আসলে একরকম নিশ্চিত হয়ে গেছে, মিস্টার ক্রিকেট ডাক নামের মাইক হাসির টেস্ট-ওয়ানডে সব ধরনের ক্যারিয়ারেরই এটা শেষ দিন। নিজে আগেই জানিয়েছেন, এটা তার শেষ টেস্ট। সে জন্য প্রস্তুতই ছিল ক্রিকেট বিশ্ব। তবে ওয়ানডে ক্রিকেট এই মৌসুমের শেষ পর্যন্ত খেলতে চেয়েছিলেন হাসি। কিন্তু তাকে এদিনই ঘোষিত ওয়ানডে দলে আর রাখেননি নির্বাচকরা। এরপর ভারত ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দলেও ব্যতিক্রম কিছু না ঘটলে থাকবেন না। ফলে হাসির আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শেষ দিনই ছিল কাল।
এই টেকনিকাল শেষটা মেনেই নিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার সোনালী প্রজন্মের অন্যতম সেরা এই ব্যাটসম্যান। তিনি বলছেন, নির্বাচকরা তার সঙ্গে আলাপ করেই সিদ্ধান্তটা নিয়েছেন। তার নির্বাচকদের যুক্তি তার কাছে সঠিক মনে হয়েছে, ‘নির্বাচকরা আমার সঙ্গে আলাপ করেছেন। তাদের চিন্তাটা ঠিক আছে। আমি বুঝতে পারছি, তারা এখন ২০১৫ বিশ্বকাপ নিয়ে ভাবছেন। ফলে আমি এটা মেনে নিয়েছি।’ হাসি মেনে নিলেও তার ভক্তদের জন্য এটা মেনে নেয়া কঠিন ছিল। অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেটে ইতিহাস তৈরি করে ফেলা এই ব্যাটসম্যানের বিলম্বিত অভিষেক নিয়ে অস্ট্রেলিয়ানদের ক্ষোভের সীমা নেই। অস্ট্রেলিয়ার সোনালী প্রজন্মের তুখোড় ব্যাটসম্যানদের দাপটে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ডাক পাওয়ার আগে ১৫ হাজার প্রথম শ্রেণীর রান করে ফেলেছিলেন। ততোদিনেই বয়স ৩০ পার হয়ে গেছে। তারপরও ফিরে ক্রান্তিলগ্নে অসামান্য সব ইনিংস খেলেছেন। ৫০-এর ওপরে গড় নিয়ে ক্যারিয়ার শেষ করেছেন। সবচেয়ে বড় কথা ভেঙে পড়তে থাকা অস্ট্রেলিয়াকে দফায় দফায় মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছেন। সেই হাসির বিদায় হয়ে গেল।
হাসি নিজে অবশ্য এমন বিদায় নিয়ে খুবই আনন্দিত। বিশেষ করে প্রিয়তম ভেন্যু সিডনিতেই শেষ করতে পেরে বুকটা ভরে যাচ্ছে তার, ‘কী অসাধারণ শেষ, তাই না! সিডনি আমার প্রিয়তম ভেন্যুগুলোর একটা। সেখানে শেষ হল আমার। আমি গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, বিদায় ক্রিকেট।’ আমরাও বলতে পারি, বিদায় মিস্টার ক্রিকেট।
