ম্যাথুস থেকে মেসি

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:৩৮
সামান্য একটা গোল বলের মতো দেখতে ট্রফি। মাত্র ৩১ সেন্টিমিটার উঁচু এবং ২৩ সেন্টিমিটার ব্যাসের গোলক। চাইলে এমন গোলক আপনিও একটা বানিয়ে নিতে পারেন। অথচ সেই ‘গোলক’ কার হাতে উঠবে, তা নিয়ে কী প্রবল উত্তেজনা! এই উত্তেজনা আজকের নয়। কমবেশি অর্ধ্বশতাব্দী ধরে পৃথিবী আচ্ছন্ন হয়ে আছে গোলাকার এই ট্রফির উত্তেজনায়। কারণ ট্রফিটির নাম-ব্যালন ডি’অর; বর্তমানে ফিফা ব্যালন ডি অ’র। বলাই বাহুল্য ফিফা ব্যালন ডি’অর নামের বর্তমান পুরস্কারটি; যেটি গতকাল রাতে দেওয়া হল; সেটি আসলে এক্কেবারে নবীন একটি পুরস্কার। ২০১০ সাল থেকে এই পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু পুরস্কারটির পেছনে আছে ফ্রান্স ফুটবল ম্যাগাজিনের সৃষ্টি করা ব্যালন ডি অ’র ট্রফির ইতিহাস’ ১৯৫৬ সাল থেকে চলে আসা ইতিহাস। ব্যালন ডি অ’র এবং ফিফার বর্ষসেরা ফুটবলার পুরস্কার ২০১০ সালে এক ব্যাপক আনুষ্ঠানিকতার ভেতর দিয়ে একাকার হয়ে গেছে। সে বছর থেকে জুরিখে দেওয়া হচ্ছে যৌথ আয়োজনের এই পুরস্কার। ফলে বর্তমান পুরস্কারটি জানতে গেলে পুরোনো দুটি পুরস্কারকে বুঝে আসাটা দরকার। ব্যালন ডি’অর পুরস্কারের সূচনা হয় ১৯৫৬ সালে; একেবারেই ঘরোয়াভাবে। সে বছর ইউরোপের সেরা খেলোয়াড়কে সম্মাননা দেওয়ার একটা সিদ্ধান্ত নেয় ফরাসি নামকরা ক্রীড়া বিষয়ক পত্রিকা-ফ্রান্স ফুটবল। পত্রিকার প্রধান ম্যাগাজিন সম্পাদক গ্যাব্রিয়েল হ্যানট সিদ্ধান্ত নেন, ক্রীড়া সাংবাদিকদের ভোটাভুটিতে নির্ধারিত হবে ইউরোপের সেরা ফুটবলার। স্বল্প পরিসরে সাংবাদিকদের ভোট নিয়ে সেবার পুরস্কারটা তুলে দেওয়া হয় ব্ল্যাকপুলের হয়ে এফএ কাপজয়ী ইংলিশ তারকা স্ট্যানলি ম্যাথুসের হাতে। পরিসরটা ছোট ছিল। কিন্তু সেই পরিসরেই ম্যাথুসের হাত থেকে শুরু হয়ে গেল এক ইতিহাস। পুরস্কারের প্রথম পর্যায়ে শর্ত ছিল, বিজয়ীকে অবশ্যই ইউরোপিয়ান নাগরিক হতে হবে এবং ইউরোপিয়ান লিগে খেলতে হবে। এই শর্তের কারণেই পেলে ও ম্যারাডোনা কখনো পুরস্কারের বিবেচনায় আসেননি। পেলে ইউরোপে খেলেনইনি। আর ম্যারাডোনা ইউরোপিয়ান ছিলেন না। ১৯৯৫ সালে ফ্রান্স ফুটবল সিদ্ধান্ত নেয়, তারা অ-ইউরোপীয়দেরও এই পুরস্কারের জন্য বিবেচনা করবে; তবে খেলোয়াড়কে অবশ্যই ইউরোপিয়ান লিগে খেলতে হবে। এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গে ভোট দেওয়ার যোগ্য সাংবাদিকদের তালিকাও বাড়িয়ে ৫৬ করে ফেলা হয়। ওই বছরই ইন্টার মিলানের লাইবেরিয়ান তারকা জর্জ উইয়া পুরস্কার জিতে নেন ক্লিন্সমানকে হারিয়ে। ২০০৭ সালে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি আনে ফ্রান্স ফুটবল কর্তৃপক্ষ। তারা সিদ্ধান্ত নেয়, ব্যালন ডি’অর হবে বৈশ্বিক পুরস্কার। বিশ্বের যে কোনো খেলোয়াড়কে যে কোনো লিগের পারফরম্যান্সের জন্য এই পুরস্কার দেওয়া যেতে পারে। এই ব্যবস্থাকে আসলেই বৈশ্বিক করতে ভোটার সাংবাদিকের সংখ্যা ৫৬ থেকে এক লাফে ৯৬ করে ফেলা হয়। এই বাড়তি ৪০ জন সাংবাদিকই নির্বাচন করা হয় ইউরোপের বাইরে থেকে। এভাবে ব্যালন ডি’অর হয়ে বিশ্বসেরা ফুটবলারের চূড়ান্ত স্বীকৃতি। কিন্তু ততোদিনে বর্ষসেরা ফুটবলারের আরেকটি বড় স্বীকৃতির প্রচলন হয়ে গেছে-ফিফা বর্ষসেরা ফুটবলার। ১৯৯১ সালে বিশ্বের সেরা ফুটবলারকে সম্মানিত করতে এই উদ্যোগের শুরু করে ফিফা। নিয়ম হয়, প্রথমে ফিফার ফুটবল কমিটি একটি শর্টলিস্ট ঘোষণা করবে। সেখান থেকে ভোট দিয়ে সেরা খেলোয়াড় নির্বাচন করবেন প্রতিটি জাতীয় দলের অধিনায়ক ও কোচ। এই ব্যবস্থায় প্রথম ফিফা বর্ষসেরা পুরস্কার পান লোথার ম্যাথুস; তার মানে দুটি পুরস্কারেরই প্রথম জয়ীর নাম ম্যাথুস! কিন্তু ঝামেলাটা দেখা দিল, ব্যালন ডি’অর এবং ফিফা বর্ষসেরা; দুটি পুরস্কারই সাধারণত একই খেলোয়াড়ের হাতে উঠতে থাকল। সর্বশেষ ৫ বছর টানা দুই সংস্করণেই জয়ী ফুটবলারের নাম এক। এর চেয়েও বড় কথা হল, এতে বিশ্ব একটা দ্বিধায় পড়ে গেল-কোনটি আসলে শ্রেষ্ঠ সম্মাননা? এই সমস্যার নিরসনে ২০০৭ সাল থেকেই ফ্রান্স ফুটবল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একটা সমঝোতায় আসতে চাচ্ছিল ফিফা। অবশেষে ২০১০ সালে বিশ্বকাপ চলা অবস্থায় জোহানেসবার্গে ফিফা ও ফ্রান্স ফুটবলের মধ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পন্ন হয়। সিদ্ধান্ত হয়, পরের বছর থেকে যৌথভাবে প্রদান করা হবে একটি পুরস্কার—ফিফা ব্যালন ডি’অর। এবার ভোটিং ব্যবস্থায় আসে বিরাট পরিবর্তন। প্রথমে ফিফার টেকনিক্যাল কমিটি এবং ফ্রান্স ফুটবলের বিশেষজ্ঞরা ২৩ সদস্যের একটি প্রাথমিক দলের নাম ঘোষণা করে। এবার সাংবাদিকদের ভোটে সেটিকে কমিয়ে আনা হয় ১০ সদস্যে। এরপর এই সংক্ষিপ্ত তালিকার ওপর বিশ্ব জুড়ে সব জাতীয় দলের অধিনায়ক, কোচ এবং ৯৬ জন বিশিষ্ট সাংবাদিক ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেন সেরা তিন ফুটবলারকে। সবশেষে এই তিন ফুটবলারের মধ্যে আবার ভোটাভুটি করে ঠিক হয় সেরা ফুটবলারের নাম। ২০১০ সালে এই পরিবর্তন আসার আগে ব্যালন ডি’অর এবং ফিফা বর্ষসেরা; দুই সংস্করণেই শেষ বিজয়ী ছিলেন মেসি। তারপর যৌথ সংস্করণের প্রথম দুটি আসরেও জয়ী ছিলেন মেসি। কাল রাতেও কি তা হয়েছে? সে ক্ষেত্রে বলাই যায়, এ পুরস্কার স্ট্যানলিদের হাত থেকে মেসি যুগে চলছে এখন!