ফিফা ব্যালন ডি’অর ২০১২

আবার সেরা মেসি

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০১৩, ১৯:৫৬
‘ভূমিধস বিজয়’ ব্যাপারটা এতোকাল রাজনৈতিক নির্বাচনেই প্রচলিত ছিল। এবার থেকে সেটা ফুটবলেও ব্যবহার শুরু হয়ে গেল। ফুটবলে এই ‘রাজনৈতিক শব্দ’ আমদানি করে ফেললেন একজন ফুটবলার; গত কয়েক বছর ধরে এই গ্রহের সেরা ফুটবলার, ক্ষুদে জাদুকর, একের পর এক রেকর্ড ভেঙে ফেলা ফুটবলার—লিওনেল আন্দ্রেস মেসি! ২০১২ সালের শেষ দিক থেকেই অনুমানের পালা চলছিল, কে হতে যাচ্ছেন এ বছরের বর্ষসেরা ফুটবলার? কার হাতে উঠতে যাচ্ছে ফিফা ব্যালন ব্যালন ডি’অর ট্রফি? এসব জল্পনা-কল্পনায় যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল; তার ছিটেফোঁটাও ছিল না চূড়ান্ত ভোটিংয়ে। শতকরা ৪১.৬০ শতাংশ ভোট দখলে নিয়ে সেই ভূমিধস বিজয় পেলেন লিওনেল মেসি। বাকী দুই প্রতিদ্বন্দ্বী মিলেও তার কাছাকাছি ভোট পাননি। অবশ্য এই ভোটের হারে নয়; মেসির আসল কৃতিত্ব অন্য জায়গায়। কৌশলগতভাবে, এই নিয়ে টানা চার বার ব্যালন ডি’অর ও ফিফা বর্ষসেরা পুরস্কার জিতলেন আর্জেন্টাইন এই জাদুকর। বলাই বাহুল্য, এমন কীর্তির কাছাকাছিও এর আগে কেউ যেতে পারেননি। মেসির ২০০৯ সালের প্রথম জয়টি ছিল ভিন্ন ভিন্ন দুই সংস্করণে—ফিফা বর্ষসেরা ও ফ্রান্স ফুটবলের দেওয়া ব্যালন ডি’অর। এরপর ২০১০, ২০১১, ২০১২ সালে জিতলেন একীভূত হয়ে তৈরি হওয়া এই ফিফা ব্যালন ডি’অর পুরস্কার। শুধু ব্যালন ডি’অরের বিবেচনায় এর আগে তিনবার করে পুরস্কারটি জিতেছিলেন ফরাসি গ্রেট মিশেল প্লাতিনি, টোটাল ফুটবলের রূপকার ইয়োহান ক্রুইফ এবং ডাচ তারকা মার্ক ফন বাস্তেন। এর মধ্যে প্লাতিনি জিতেছিলেন টানা তিনবার। এবার সবাইকে ছাপিয়ে গেলেন এই সময়ের ‘প্লে স্টেশনের’ সুপার স্টার মেসি। আবার ফিফা বর্ষসেরা পুরস্কারের হিসেবেও রেকর্ড এখন মেসির হাতে। এর আগে তিনবার করে ফিফা বর্ষসেরা হওয়ার রেকর্ড ছিল ব্রাজিলের কিংবদন্তী রোনালদো এবং ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী জাদুকর জিনেদিন জিদানের। তাদেরই এক ঝটকায় ছাপিয়ে গেলেন আর্জেন্টাইন তারকা। উল্লেখ করা যেতে পারে, ব্যালন ডি’অর পুরস্কারের সূচনা হয় ১৯৫৬ সালে। সে বছর ইউরোপের সেরা খেলোয়াড়কে সম্মাননা দেয়ার একটা সিদ্ধান্ত নেয় ফরাসি নামকরা ক্রীড়া বিষয়ক পত্রিকা—ফ্রান্স ফুটবল। পত্রিকার প্রধান ম্যাগাজিন সম্পাদক গ্যাব্রিয়েল হ্যানট সিদ্ধান্ত নেন, ক্রীড়া সাংবাদিকদের ভোটাভুটিতে নির্ধারিত হবে ইউরোপের সেরা ফুটবলার। অন্যদিকে ১৯৯১ সালে বিশ্বের সেরা ফুটবলারকে সম্মানিত করতে এই উদ্যোগের শুরু করে ফিফা। নিয়ম হয়, প্রথমে ফিফার ফুটবল কমিটি একটি শর্টলিস্ট ঘোষণা করবে। সেখান থেকে ভোট দিয়ে সেরা খেলোয়াড় নির্বাচন করবেন প্রতিটি জাতীয় দলের অধিনায়ক ও কোচ। পরে ২০১০ সালে জোহানেসবার্গে ফিফা ও ফ্রান্স ফুটবলের মধ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পন্ন হয়। সিদ্ধান্ত হয়, পরের বছর থেকে যৌথভাবে প্রদান করা হবে একটি পুরস্কার-ফিফা ব্যালন ডি’অর। বছর জুড়ে মেসির দুরন্ত পারফরম্যান্সে অনেকটা আগে থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, এবারও ট্রফি উঠতে যাচ্ছে তার হাতে। এ বছর একাধিক বিশ্বরেকর্ড নিজের পায়ের তলে দলে ফেলেন মেসি। লা লিগায় সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড করেছেন, ইউরোপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড করেছেন। সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডের পেছনে ছোটার পথে পেলের এক বছরের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড ভেঙে ফেলেছেন। শেষ পর্যন্ত বাকী ছিল জার্ড মুলারের করা এক বছরে ৮৫ গোলের রেকর্ড। তর্কসাপেক্ষে যেটি আবার এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড। সে গোলও ভেঙে দেন মেসি। শেষ পর্যন্ত গত মৌসুমে বার্সেলোনার পক্ষে ৭৯ ও আর্জেন্টিনার পক্ষে ১২ গোল করেন। মানে এক বছরে মেসির গোল সংখ্যা ৯১! এই নজিরবিহীন গোলমেশিনের ছুটে চলায় এবার তার হাতে পুরস্কার ওঠায় আর বিস্ময়ের কিছু ছিল না। নতুন এই ব্যবস্থায় পুরস্কারটি মূলত শেষ পর্যন্ত ভোটাভুটিতেই ঠিক হয়। প্রথমে ফিফার টেকনিক্যাল কমিটি এবং ফ্রান্স ফুটবলের বিশেষজ্ঞরা ২৩ সদস্যের একটি প্রাথমিক দলের নাম ঘোষণা করে। এবার সাংবাদিকদের ভোটে সেটিকে কমিয়ে আনা হয় ১০ সদস্যে। এরপর এই সংক্ষিপ্ত তালিকার ওপর বিশ্ব জুড়ে সব জাতীয় দলের অধিনায়ক, কোচ এবং ৯৬ জন বিশিষ্ট সাংবাদিক ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেন সেরা তিন ফুটবলারকে। সবশেষে এই তিন ফুটবলারের মধ্যে আবার ভোটাভুটি করে ঠিক হয় সেরা ফুটবলারের নাম। আর এই ভোটে মেসি পেয়েছেন ৪১.৬০ শতাংশ ভোট। সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ২৩.৬৮ শতাংশ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় এবং ইনিয়েস্তা ১০.৯১ শতাংশ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন। তবে পুরস্কার জেতার পরে মেসি তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন লা লিগা কিংবা চ্যাম্পিয়নস লীগে বার্সেলোনা যদি শিরোপা জিততে না পারে তবে তার এই রেকর্ড অর্থহীন হয়ে যাবে। মেসি বলেন, ‘আরো একবার এই পুরস্কার জেতা সত্যিই অসাধারণ একটি ব্যাপার। তার উপর টানা চতুর্থবারের মত পাওয়াটা অবশ্যই বিশেষ কিছু। আমি এই পুরস্কার আমার বার্সা সতীর্থদের সাথে ভাগ করে নিতে চাই- বিশেষ করে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার সাথে, যিনি আজ এখানে আমার সাথে আছেন। তার সাথে প্রতিদিন অনুশীলন করতে পেরে আমি সত্যিই গর্বিত। একইসাথে আমি আর্জেন্টাইন সতীর্থদের কথাও স্মরণ করতে চাই। অধিনায়ক এবং কোচ যারা আমাকে ভোট দিয়েছেন তাদেরকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমার পরিবার, বন্ধু এবং অবশ্যই আমার স্ত্রী ও ছেলেকে যে আমার জীবনের সবচেয়ে সেরা উপহার, সবাইকে ধন্যবাদ জানাতে চাই।’ বার্সা কোচ টিটো ভিয়ানোভা মেসির এই কৃতিত্বে আগেভাগেই তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘লিও’র মধ্যে এমন গুণ আছে যে, সে যখন খেলতে নামে তখন মনে হয় সে এখনও ছোট। একজন তরুণ খেলোয়াড়ের মতই সে সবসময় নিজেকে মেলে ধরে। একজন কোচ হিসেবে তাকে কখনই কোন কিছু বলে দিতে হয় না।’ ফিফা বর্ষসেরা এই গালা অনুষ্ঠানে পুরুষদের পাশাপাশি নারী বিভাগেও সেরাকে পুরস্কৃত করা হয়ে থাকে। লন্ডন অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জয়ী যুক্তরাষ্ট্রের মহিলা দলের অন্যতম সদস্য এ্যাবি ওয়ামব্যাচ পাঁচবারের শিরোপা জয়ী ব্রাজিলিয়ান তারকা মার্তাকে পিছনে ফেলে এবারের বর্ষসেরা খেতাব ছিনিয়ে নিয়েছেন। এ ছাড়া বর্ষসেরা কোচ হয়েছেন স্পেনের আবার ইউরোজয়ী কোচ ভিসেন্তে দেল বস্ক। তবে সবার প্রাপ্তিকে ছাপিয়ে গেছেন একজন লিওনেল মেসি। সেরা ফুটবলার ১ম লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনা/বার্সা ৪১.৬০% ২য় ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো পর্তুগাল/রিয়াল ২৩.৬৮% ৩য় আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা স্পেন/বার্সা ১০.৯১% সেরা নারী ফুটবলার ১ম অ্যাবি ওয়ামব্যাচ যুক্তরাষ্ট্র ২০.৬৭% ২য় মার্তা ব্রাজিল ১৩.৫০% ৩য় অ্যালেক্স মরগ্যান যুক্তরাষ্ট্র ১০.৮৭% সেরা কোচ ১ম ভিসেন্তে দেল বস্ক স্পেন ৩৪.৫১% ২য় হোসে মরিনহো রিয়াল মাদ্রিদ ২০.৪৯% ৩য় পেপ গার্দিওয়ালা বার্সেলোনা ১২.৯১% সেরা নারী দলের কোচ ১ম পিয়া সানদহেগ যুক্তরাষ্ট্র ২৮.৫৯% ২য় নরিও সাসাকি জাপান ২৩.৮৩% ৩য় ব্রুনো বিনি ফ্রান্স ৯.০২% ফিফা পুসকাস অ্যাওয়ার্ড (সুন্দরতম গোল) ১ম মিরোস্লাভ স্টচ স্লোভাকিয়া ২য় রাদামেল ফ্যালকাও কলম্বিয়া/অ্যাটলেটিকো ৩য় নেইমার ব্রাজিল/সান্তোস ফিফা প্রেসিডেন্সিয়াল পুরস্কার ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার ফিফা ফেয়ার প্লে পুরস্কার উজবেস্কিস্তান