সীমিত সম্পদে সাফল্যের পাল্লাই ভারী

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:৫৮
স্বাস্থ্য খাতে সীমিত সম্পদের মধ্যে সাফল্য অনেক। ব্যর্থতা কম। অতীতের চেয়ে এ বছর স্বাস্থ্যখাতে সাফল্য বেশি তা বিদেশ অর্থনীতিবিদরা মতামত দিয়েছেন। এরমধ্যে রয়েছে ভারতের নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অর্মত্য সেনও। তিনি গত সোমবার ভারতে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতাকালে এবং এর আগে দুই দফা বলেছিলেন যে, বাংলাদেশে শিশু মৃত্যু, মাতৃমৃত্যু, ইপিআই কর্মসূচিসহ স্বাস্থ্যখাতে সাফল্য সূচক বেশি। সীমিত সম্পদের মধ্যে এতবড় অর্জন এটা ভারতের শিক্ষণীয় বিষয় বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। এর আগে কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী আন্তর্জাতিক অটিজম সম্মেলনেও বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত নিয়ে অনুরূপ মতামত দিয়েছেন। পাশাপাশি কিছু জটিলতা ও বিভিন্ন কারণে ব্যর্থতা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুরুতে কর্মস্থলে চিকিত্সকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার বেশ কয়েক দফা নির্দেশনা দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও চিকিত্সকরা কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে আসছেন। মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের শীর্ষ কর্মকর্তারা এর সত্যতা স্বীকার করে বলেছেন যে, এ বিষয়ে ব্যর্থতা রয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের শূন্যপদ পূরণে এবং সেখানে অস্ত্রোপচার ৯৫ ভাগ বন্ধ রয়েছে। চারদলীয় জোট সরকার এ বিষয়ে সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। বর্তমান মহাজোট সরকারও ব্যর্থ হয়েছে। সাড়ে ৮ হাজার চিকিত্সক ও ১২ হাজার সিনিয়র স্টাফ নার্সসহ সহস াধিক বেকার রয়েছেন। রোগীদের চাহিদার তুলনা ডাক্তার নার্সের সংখ্যা অপ্রতুল। ৪ হাজার ৭৪৪টি সিনিয়র স্টাফ নার্সের পদ নতুন করে সৃষ্টি করা হয়েছে। শূন্য রয়েছে ১২০০ পদ। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় আসার পর পরই সিনিয়র স্টাফ নার্সদের এন্টি পেয়েন্টে দ্বিতীয় শ্রেণী কর্মকর্তা পদ মর্যাদায় উন্নীত করার ঘোষণা দেন। তা বাস্তবায়িত হয়ে গেছে। কিন্তু প্রচলিত নিয়োগ সংশোধন না করায় সিনিয়র স্টাফ নার্সদের নিয়োগ ঝুলে গেছে। শুধু তাই নয়, বিভাগীয় প্রার্থীর ক্ষেত্রে বয়স শিথিলযোগ্য। ৩০টি ক্যাডার সার্ভিস ও নন ক্যাডার সার্ভিসের ক্ষেত্রে এ নিয়ম রয়েছে। শুধু সিনিয়র স্টাফ নার্স নিয়োগের ক্ষেত্রে পে সংশোধিত বিধিমালার প্রস্তাবনা বিভাগীয় প্রার্থীর ক্ষেত্রে বয়স শিথিলযোগ্য তা উল্লেখ নেই। এছাড়া নানা জটিলতা করে সিনিয়র স্টাফ নার্সদের প্রস্তাবিত বিধিমালা চূড়ান্ত করার প্রস্তুতি নেয় মন্ত্রণালয়। নার্স সংগঠন নেতৃবৃন্দের তীব্র আপত্তি আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে তা নিরসন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অপরদিকে সাতটি নার্সিং কলেজও শিক্ষকদের পদোন্নতি দেয়। তারা সকলে সিনিয়র স্টাফ নার্স। চলতি দায়িত্বে শিক্ষকরা বিভিন্ন পদে রয়েছেন। বিধিমালা চূড়ান্ত না করায় শিক্ষকদের মধ্যে পদোন্নতি নেই। এক শ্রেণীর সরকার বিরোধী কর্মকর্তার নানা অজুহাত ও তালবাহানার কারণে চার বছর পার হয়ে যায় বলে কর্মকর্তারা স্বীকার করেন। যে ক্ষেত্রে সাফল্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, অধিদফতর ও স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে চার বছরে যে সব খাতে উন্নয়ন হয়েছে তা বিস্তারিত তথ্য জানিয়েছে। পাঁচ বছরের নীচে শিশু মৃত্যু হ্রাস পেয়ে বর্তমানে প্রতি হাজারে ৫৩তে দাঁড়িয়েছে। ২০০৭ সালে প্রতি হাজারে শিশু মৃত্যুর হার ছিল ৬৫ জন। ৪ বছরে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে ৮০.২ ভাগ শিশুক আনা হয়েছে। ২০০৭ সালে এই হার ছিল ৭৫ ভাগ। মাতৃমৃত্যু হ্রাস পেয়ে বর্তমানে প্রতি লাখে জীবিত জন্মে ১৯৪ জন। ২০০১ সালে ছিল প্রতিলাখে মৃত্যুহার ৩২০ জন। ২০১৫ সাল নাগাদ প্রতি লাখে ১৪৩ পৌঁছানোর কর্মসূচি চলছে। সংক্রামক ব্যাধি বা যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, কালা জ্বর, এভিয়ান, ইনফ্লুয়েঞ্জা, এনথ্রাক্স, নিপাহ, সার্স, ডেঙ্গুসহ অন্যান্য রোগ নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। যক্ষ্মা নিরাময়ের হার ৯২ ভাগ ও পূর্বে ছিল ৮৭ ভাগ। ম্যালেরিয়া ২০১১ সালে ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০০৮ সালে এ রোগে মৃত্যু হয়েছে ১৫০ জনের। কালাজ্বরে ২০১১ সালে মৃত্যু শূন্যতে নেমে এসেছে। এইচআইভি সংক্রমনের হার ১ ভাগের নীচে রাখা সম্ভব হয়েছে। গড় আয়ু ২০০৮ সালে ৬৫ বছর ছিল। বর্তমানে ৬৭.৭তে হয়েছে। জন্মনিয়ন্ত্রনে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতিগ্রহণের হার ২০০৭ সালে ছিল ৫৮ এবং বর্তমানে ৬১.২-এ উন্নীত হয়েছে। এখাতে সাফল্য অনেক অপুষ্ঠি জনিত কম ওজনের শিশু ২০০৭ সালে ৪১ ভাগ এবং বর্তমানে কমে ৩৬ ভাগ হয়েছে। ভিটামিন-এ গ্রহণের হার বর্তমানে ৯৫ ভাগে উন্নীত হয়েছে। পুষ্টি সেবায় অর্জন অনেক ওষুধ শিল্পে পূর্বে ৯২ ভাগের তুলনায় এ সরকারের আমলে দেশীয় চাহিদার ৯৭ ভাগ স্থানীয়ভাবে উত্পাদিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ ৮৭টি দেশে ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। গ্রামীণ স্বাস্থ্য সেবা উন্নয়নে ১২ হাজার ২১৭টি কাজ ও সিটি ক্লিনিক চালু করা হয়েছে। স্বাস্থ্য জনশক্তি নিয়োগ ও উন্নয়নে এ সরকার ৪১৩৩ জন চিকিত্সক (এডহক) এবং বিসিএসের মাধ্যমে ১৫৯৭ চিকিত্সক ও ১৭৪৪ সিনিয়র স্টাফ নার্স নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সাত হাজার ডাক্তার, পাঁচ হাজার নার্স ও তিন হাজার মিডওইয়াফ নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। মেডিক্যাল কলেজ, নার্সিং কলেজ ও ইনস্টিটিউটে আসন সংখ্যা দেড় গুণ বৃদ্ধি করা হচ্ছে। আরও নতুন চারটি মেডিক্যাল কলেজ অনুমোদন দেয়া হয়েছে। বেসরকারি খাতে ৩৩টি হেলথ টেকনোলজি ও ৬৬টি মেডিক্যাল অ্যাসিসট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায় ১৩৬টি সাব সেন্টার ও ১২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মিত হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৩১ বেড থেকে ৫০ বেডে উন্নীত করা হয়। ঢাকায় কুর্মিটোলায় ৫শ বেডের জেনারেল হাসপাতাল ও আগারগাঁও অত্যাধুনিক ৩শ শয্যার নিউরো সায়েন্স ইনস্টিট্বুিট চালু করা হয়। এছাড়া স্বাস্থ্য সেবা ও ডিজিটাল স্বাস্থ্য সেবা জনগণের দোড়গোড়ায় পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে সফলতা ব্যাপক। অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করা হয়েছে বলে কর্মকর্তারা দাবি করেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. আ ফ ম রুহুল হক বলেন, সীমিত সম্পদের মধ্যে বর্তমান সরকার স্বাস্থ্য খাতে আশানুরূপ উন্নতি হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. খন্দকার সিফায়েত উল্লাহ বলেন, শিশু স্বাস্থ্য উন্নয়নে সন্তোষজনক হওয়ায় জাতিসংঘ কর্তৃক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পুরস্কৃত করেছে। স্বাস্থ্য খাতে আরও দুইটি খাতে পুরস্কার পেয়েছে। অতীতে স্বাস্থ্য খাতে সাফল্যে নেই ও পুরস্কার ছিল না বলে দিসি জানান।