জ্যাকি চ্যান একাধারে একজন অভিনেতা, অ্যাকশন কোরিওগ্রাফার, চলচ্চিত্র প্রণেতা, রঙ্গ অভিনেতা, চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্য লেখক, উদ্যোক্তা, কণ্ঠশিল্পী ও স্ট্যান্ট পারফর্মার। পাশাপাশি তিনি একজন সাংস্কৃতিক আইকন হিসেবে পরিচিত। নব্বই দশকের অ্যাকশন ছবির এই সুপার হিরো শুধু অভিনয়ই নয়, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিভিন্ন দিকেও পদচারণা মুখর করেছেন। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি একজন পপ সংগীতশিল্পী। চীনে একজন ক্যান্টোপপ ও ম্যান্ডোপপ তারকা হিসেবেও তিনি জনপ্রিয়। তার বেশ কিছু নিজস্ব অ্যালবাম রয়েছে। এ ছাড়াও তার অভিনীত অনেক চলচ্চিত্রের থিম সংয়েও তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন। বাস্তব উপস্থিতির পাশাপাশি অনেক কার্টুন ও ভিডিও গেমেও জ্যাকি চ্যানের উপস্থিতি বিদ্যমান।
জ্যাকি চ্যান-প্রেমীদের জন্য দুঃখের সংবাদ হলো যে, এই খ্যাতিমান অ্যাকশন হিরো আর কখনোই তার জাদুকরী স্ট্যান্ট ক্ষমতা দেখাবেন না কোনো চলচ্চিত্রে। তিনি তার ক্যারিয়ারের শেষ অ্যাকশনধর্মী চলচ্চিত্রটিতে অভিনয় করে ফেলেছেন। তিনি শেষবারের মতো অভিনয় করলেন তার নতুন সিনেমা ‘সিজি টুয়েলভ :চাইনিজ জোডিয়াক’-এ। সিনেমাটিতে বরাবরের মতোই অ্যাকশন দৃশ্যগুলোয় কোনো স্ট্যান্টম্যান ব্যবহার না করে, নিজেই অভিনয় করেছেন তিনি। এগুলোর মধ্যে ছিল একপাল হিংস্র কুকুরের ধাওয়া খেয়ে দৌড়ানোসহ, অস্ট্রেলিয়ার সুউচ্চ আগ্নেয়গিরি মাউন্ট ইয়াসুর মুখ থেকে ভেতরে ঝাঁপিয়ে পড়া। আগ্নেয়গিরির ওই দৃশ্যটি নিয়ে জ্যাকি বলেন, ‘আমি যখন আগ্নেয়গিরিটির চূড়ায় পৌঁছাই, আমার মুখ থেকে একটাই শব্দ তখন বেরিয়েছিল, তা হলো ‘ওয়াও’। এর সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। আমি এটির ব্যাপারে আগে থেকেই অনেক কিছু পড়েছিলাম, কিন্তু ফুটন্ত লাভায় ফেটে যাওয়া পাথরের ‘বুম বুম’ শব্দ—ওই অভিজ্ঞতা আসলেই তুলনাহীন।’ সম্প্রতি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে নাম লিখিয়েছেন সুপার স্টার জ্যাকি চ্যান। গিনেস রেকর্ডে অন্তর্ভুক্তির কারণটা তার ভক্তদের জন্য হতাশার হলেও এ প্রাপ্তিকে তিনি ছোট করে দেখছেন না। কারণ ‘চাইনিজ জোডিয়াক’, এই শেষ ছবিতে যেন জীবনের সব আবেগ ঢেলে দিয়েছিলেন তিনি। যতটুকু পেরেছেন, তা দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন ছবির বিশেষ দৃশ্যগুলো। আর তাই এর স্বীকৃতিস্বরূপ একসঙ্গে দুটি গিনেস রেকর্ড সার্টিফিকেট পেলেন জ্যাকি চ্যান। একটি চলচ্চিত্রে সবচেয়ে বেশি স্ট্যান্ট এবং সবচেয়ে বেশি ক্রেডিটের জন্য তিনি এ পুরস্কার লাভ করেন। এ ছাড়া ছবিটিতে তার নির্মাণ, প্রধান চরিত্র, চিত্রনাট্য, অ্যাকশন কোরিওগ্রাফি, সিনেমাটোগ্রাফিসহ প্রধান ১৫টি ক্যাটাগরিতে ক্রেডিট রয়েছে। এর আগে কখনও এক ছবিতে তিনি এত শ্রম আর বুদ্ধি খাটাননি। চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে জ্যাকি চ্যান বলেন, ‘আমার ক্যারিয়ারের প্রথম ছবি থেকে আজ পর্যন্ত যত ছবির শুটিং করেছি, সেগুলোতে পারতপক্ষে চেষ্টা করেছি নিজের ভালোটা করার। এ ছবির ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হয়নি। তবে সত্যি কথা বলতে কি, ছবিটির শুটিংয়ের সময় পর্যন্ত গিনেস রেকর্ডের কথা একবারও মাথায় ছিল না। যতটুকু পেরেছি করেছি, আমার সাধ্যমতো। আর ডাবিং ও থিম মিউজিকে কণ্ঠ দেওয়াসহ ছবিটিতে আমি ১৫টির বেশি বিভাগের সঙ্গে জড়িত।’ তার ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায় বয়স ও শারীরিক কারণেই জ্যাকি এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই নিয়ে জ্যাকি মজা করে বলেন, ‘আসলে বুড়ো হচ্ছি তো, আর লোকজনও বুড়োদের মারামারি দেখতে পছন্দ করে না, আর এ বয়সে আমারও এ ধরনের ছবি করার ইচ্ছা করে না।’ গত বছরের ৫ ডিসেম্বর সাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে নিজ দেশের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে এ গিনেস রেকর্ড সার্টিফিকেট গ্রহণ করেন জ্যাকি। এর আগে ১১টি পারফর্মেন্স ক্রেডিট নিয়ে এ রেকর্ড দখলে রেখেছিলেন হলিউডের রবার্ট রড্রিগাজ।
চাইনিজ জোডিয়াকের গল্পটি
ইউরোপিয়ান ফোর্স বেইজিংয়ের পুরোনো সামার প্যালেস থেকে ব্রোঞ্জের চাইনিজ জোডিয়াক ভাস্কর্য চুরি করে। আঠারো দশকের মধ্যভাগের এ ঘটনায় খোয়া যাওয়া ভাস্কর্য উদ্ধারে মিশন শুরু হয়। এভাবেই এগিয়ে চলে চাইনিজ জোডিয়াক চলচ্চিত্রের কাহিনী।
৫০ বছরের বেশি সময়ের ক্যারিয়ারে জ্যাকি চ্যান শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। গত বছরের ১২ ডিসেম্বর মুক্তি পেয়েছে ‘চাইনিজ জোডিয়াক’। উল্লেখ্য, এই ছবির আগে বিভিন্ন ছবিতে অতিথি শিল্পী হিসেবে এবং অ্যানিমেশন ছবিতে কণ্ঠ দিলেও সর্বশেষ ২০১০ সালের ‘কারাটে কিড’ ছবিতে পূর্ণাঙ্গ চরিত্রে দেখা গিয়েছিল তাকে। এই দীর্ঘ সময় অভিনয়ের পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে ছিলেন তিনি। অ্যাকশন দৃশ্যকে ফানি করে তোলার এই জাদুকরকে আর দেখা যাবে না কোনো অ্যাকশন মুভিতে। তবে মুভি ছেড়ে দেবেন এ কথা কিন্তু জ্যাকি বলেননি।
আরও কিছু ছবি
সাম্প্রতিক ‘চাইনিজ জোডিয়াক’ ছবি ছাড়াও ‘কুংফু মাস্টার চ্যান’ আগামী বছর মুক্তিপ্রত্যাশী ‘কারাটে কিড ২’ এবং ২০১৪ সালে মুক্তিপ্রত্যাশী ‘রাশ আওয়ার ৪’ ছবির কাজ করছেন। এ ছাড়াও অ্যানিমেশন ‘কুংফু পান্ডা ৩’ ছবিতে কণ্ঠ দেওয়ার কথা রয়েছে, যেটি মুক্তি পাবে ২০১৬ সালে।
