আরবি কবি ও ঔপন্যাসিক তাহার বেন জিলন

‘আরববসন্তের পর লেখকেরা এখন স্বাধীনভাবে লিখতে পারছেন’

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০১৩, ১৮:৫০
বিশ্বের অন্যান্য ভাষার সাহিত্যের সাথে আধুনিক আরবি সাহিত্যের তুলনা করলে তেমন ঐশ্বর্যশালী মনে হয় না—কবিতা, গল্প বা উপন্যাস—কোনটিকেই। এর কারণ, বিশ শতকে পৃথিবীর চারদিকে, জীবনে ও শিল্পে, যখন ছড়িয়ে পড়েছিল আধুনিক চেতনা; আধুনিক বিশ্বসাহিত্য যখন নিত্য-নতুন সাহিত্যতত্ত্বের নিরীক্ষা করেছে, আরবি সাহিত্য তখন ব্যস্ত সময় পার করেছে মধ্যযুগের অনুকরণে এবং ক্ষমতাসীন শাসকদের প্রশস্তিতে। তাই পুরো বিশ শতকে মানবসভ্যতার আধুনিককালের উন্মেষের সময়টাতে আরবি সাহিত্যে আধুনিক চেতনার কোনো বিকাশ ঘটেনি। মিসরীয় ঔপন্যাসিক নগিব মাহফুজ, প্যালেস্টাইনি কবি মাহমুদ দারবিশ, তাত্ত্বিক এডওয়ার্ড সাইদ, সিরিয়ান কবি অ্যাডোনিস বা মরক্কোর কবি তাহার বেন জিলনের কথা বাদ দিলে অন্য আরবি সাহিত্যিকদের সাম্প্রতিক আরবি কবিতা বা উপন্যাস পড়লে মনে হয়—এসব শুধু আরবদের জন্য মুসলমানদের লেখা। আরব ও মুসলমান-গণ্ডী ছাড়িয়ে বিশ্বমানের আধুনিক সাহিত্য উপহার দেবার জন্য আরবের কবি ও লেখকদের তাই দরকার হয়ে পড়েছিল একটি আরববসন্তের, যা নিয়ে আসবে পরিবর্তন, জেগে উঠবে জনতা; যে বসন্তের পর ফুলে-ফলে সুশোভিত হয়ে উঠবে আরবি সাহিত্য। কিন্তু আরবের লেখকদের অপেক্ষার পালা দীর্ঘায়িত হয়েছে কেবল। এর কারণ আরবি সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন আল কোরআন গণতন্ত্রকে শাসনের মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিলেও আধুনিক গণতান্ত্রিক বিশ্বে একমাত্র আরবি ভাষাভাষী দেশগুলোই গত তিরিশ-চল্লিশ বছর ধরে শাসিত হচ্ছে স্বৈরাচারী একনায়ক বা অন্যভাবে বললে বাদশাহ-আমির কর্তৃক। আলজেরিয়া, বাহরাইন, কমেরো, জিবুতি, মিসর, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, লিবিয়া, মৌরিতানিয়া, মরক্কো, ওমান, প্যালেস্টাইন, কাতার, সৌদি আরব, সুদান, সোমালিয়া, সিরিয়া, তিউনিশিয়া, আরব আমিরাত ও ইয়েমেন—এই কয়টি দেশ আরববিশ্ব হিসেবে পরিচিত। তবে এর ভেতর মিসরের কায়রো, ইরাকের বাগদাদ, সিরিয়ার দামেস্ক, লেবাননের বৈরুত আর মরক্কোর রাবাতকে আরবি সাহিত্য-সংস্কৃতির মূল কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থকে। কিন্তু দীর্ঘ স্বৈরশাসনের কবলে পড়ে এসব সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে ছিল এক শতাব্দী ধরে। বিশ শতককেই যেখানে বলা হয়, মানব সভ্যতা আর তার সাহিত্যিক অগ্রগতির শ্রেষ্ঠ শতক, সেই বিশ শতক তো বটেই এবং একুশ শতকের প্রথম দশক পর্যন্ত একনায়কদের স্বৈরশাসনের ফলে মানবাধিকার, রাজনীতি, বাক্স্বাধীনতা প্রায় রুদ্ধ হয়ে পড়েছিল আরব দেশগুলোতে। নির্যাতন আর শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচার থেকে নিষ্কৃতি পাননি লেখকেরাও। নিজেদের অধিকারের কথা বলার কারণে বহু আরবি সাহিত্যিক জেলখানায় বন্দী হয়েছিলেন, অনেকে হয়েছিলেন নির্বাসিত। ২০১০ সালের ১৭ ডিসেম্বর তিউনিশিয়ার ফলবিক্রেতা বু আজিজির আত্মহনননের মধ্য দিয়ে প্রথমে তিউনিশিয়ায় ব্যাপক গণজাগরণ বা আরববসন্তের সূচনা ঘটে। তারপর একে একে মরক্কো, মিশর, ইয়েমেন, লিবিয়াসহ সব আরব দেশে তা ছড়িয়ে পড়ে। স্বতঃস্ফূর্ত গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে একে একে বিদায় নেন অনেক আরব স্বৈরশাসকেরা। আরববসন্তের পালাবদলে এখন সেসব দেশে এসেছে নতুন সরকার। এ পালাবদলে আরবি লেখকদের প্রত্যাশা কতটা পূর্ণ হয়েছে, তারা কতটা স্বাধীনভাবে লিখতে পারছেন—এসব নিয়ে আরবি লেখকদের মনোভাব জানিয়ে সমপ্রতি জার্মানির বার্লিন লিটারারি ফেস্টিভ্যালে আরব লেখকদের পক্ষ থেকে বক্তব্য রেখেছিলেন মরক্কোর বিখ্যাত আরবি কবি ও ঔপন্যাসিক তাহার বেন জিলন। ১৯৪৪ সালে মরক্কোর ফেজ শহরে জন্মগ্রহণকারী তাহার ১৯৬৬ সালে মরক্কোর ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক কারাবন্দী হন। এরপর ১৯৭১ সালে ফ্রান্সে নির্বাসিত হন এবং এখনো তিনি ফ্রান্সেই বসবাস করছেন। তাঁর বিখ্যাত দুটি গ্রন্থ, ‘দ্য স্যান্ড চাইল্ড’ ও ‘রেসিজম এক্সপ্লেইনড টু মাই ডটার’। বই দুটি ৩০টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তিনি পেয়েছেন শ্রেষ্ঠ ফরাসি সাহিত্য পুরস্কার গ্র্যান্ড প্রিক্স লিটারারি প্রাইজ, জার্মানির অন্যতম সাহিত্য পুরস্কার এরিক মারিয়া রেমার্ক লিটারারি প্রাইজ এবং আইরিশ সাহিত্য পুরস্কার ডাবলিন ইন্টারন্যাশনাল লিটারারি অ্যাওয়ার্ড। বার্লিন লিটারারি ফেস্টিভ্যাল অনুষ্ঠানে জার্মান শিল্প-সাহিত্যবিষয়ক ম্যাগাজিন ‘দার স্পিগেল’-এর পক্ষে জার্মান লেখক ও সাংবাদিক জেস স্মি তাঁর কাছ থেকে একটি সাক্ষাত্কার নেন। সাক্ষাত্কারটি জার্মান থেকে সরাসরি অনূদিত হলো: প্রশ্ন: ‘আরববসন্ত’—এই শব্দবন্ধটি আপনি কি পছন্দ করেন? উত্তর: আসলেই টার্মটি আমার খুব পছন্দ। বলা যায়, আরবদের জন্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের একটি চমত্কার উপহার এই ‘আরববসন্ত’ শব্দবন্ধটি। যদি বলা হতো আরব-বিদ্রোহ, তাহলে হয়তো সেটা যথাযথ হতো না। কারণ, বিদ্রোহে জড়িয়ে থাকে কোনো গোষ্ঠী বা দল কিন্তু বসন্তে জড়িয়ে আছে সবাই। আরববসন্ত—সব জনগণেরই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। প্রশ্ন: ‘আরববসন্ত’ আরবি সাহিত্যকে কতটা প্রভাবিত করেছে? উত্তর: আরবি সাহিত্যকে আরববসন্ত কতটা প্রভাবিত করেছে, তা আগামী দিনের আরবি সাহিত্যই বলে দেবে। তবে আরববসন্তের যে সুফলটি আরব লেখকেরা এখন ভোগ করছেন সেটি হচ্ছে—আরবের লেখকেরা এখন স্বাধীনভাবে, স্বৈরশাসকদের পরোয়া না করেই লিখতে পারছেন। প্রশ্ন:স্বৈরশাসকদের সময়ে আরবের লেখকদের অবস্থা কী রকম ছিল? উত্তর:স্বৈরশাসকদের সময়ে তো লেখকদের ওপর প্রচুর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। সরকারের চাপিয়ে দেওয়া নানারকম বিধিনিষেধ তো ছিলই, এ ছাড়া লেখকেরা নিজে থেকেও ভয়ের ভেতর থাকতেন—লেখার মাশুল কতটা গুণতে হবে, সেই ভয়ে। এমন কি যাঁরা নির্বাসনে ছিলেন, তাঁরাও ভয়ে অনেক কথা লিখতেন না পরিবার-পরিজনদের কথা ভেবে। প্রশ্ন:তো, আরববসন্তের পর আরব লেখকেরা কি নিজেদের দেশে ফিরেছেন? উত্তর:অনেক আরব লেখকই দেশে ফিরে গেছেন। যেমন মিসর, লিবিয়া বা ইরাক—যেসব দেশে মোটামুটি শান্তি ফিরে এসেছে। প্রশ্ন:লেখকেরা ছাড়া সাধারণ আরবদের ভাবনাটা এখন কী রকম? উত্তর: আরব দেশগুলো সুদীর্ঘ সময় ধরে স্বৈরশাসক দ্বারা শাসিত হয়েছে। আরববসন্তের মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসকদের বিদায়ের পর ধীরে ধীরে সব ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন আসছে। কিন্তু জনগণ চায়, এ পরিবর্তনের গতি আরও দ্রুত হোক। তা না হওয়ায় তরুণ প্রজন্ম বেশ হতাশ। প্রশ্ন:তরুণদের এত হতাশার কারণ কী? উত্তর:আসলে একটি দেশে পরিবর্তন আনতে গেলে কখনো কখনো এক প্রজন্ম পর্যন্ত সময় লেগে যায়। কিন্তু আরববসন্তে যেসব তরুণেরা পথে নেমেছেন, জীবন বাজি রেখেছেন; তাঁরা পরিবর্তনের জন্য এক প্রজন্ম পর্যন্ত অপেক্ষা করতে কোনোভাবেই রাজি নন। সে জন্য বহু আরব তরুণ হতাশ হয়ে এখন ইউরোপে অভিবাসিত হচ্ছেন। প্রশ্ন: তরুণদের বাইরে আরবের সাধারণ জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা এখন ঠিক কী রকম? উত্তর:আরবের অনেক দেশেই এখনো প্রচুর প্রশাসনিক দুর্নীতি আছে। স্বৈরশাসকের বদলে সাধারণ মানুষের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বটে; কিন্তু প্রশাসনিক দুর্নীতির চিত্রটি ঠিক একই রকম সব জায়গায়। রাতারাতি এই পরিবর্তনও খুব কঠিন। প্রশ্ন:২০১১ সালে প্রকাশিত আপনার ‘আরববসন্ত’ বইয়ে আরব স্বৈরশাসকদের সাথে সম্পর্ক রাখার জন্য আপনি ইউরোপীয় রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। আপনার এ ক্ষোভের কারণ কী? উত্তর:ইউরোপিয়ান রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে এ ক্ষোভের যুক্তিসঙ্গত কারণ তো অবশ্যই আছে। ইউরোপিয়ান রাজনীতিকরা আরবের সাধারণ মানুষের স্বার্থকে কখনো প্রাধান্য দেননি; বরং অর্থনীতি আর তেল-বাণিজ্যকেই সবসময় প্রাধান্য দিয়েছেন। প্রশ্ন: এখন ইউরোপীয় রাজনীতিবিদ বা সরকারগুলো আরব লেখকদের কীভাবে সহায়তা করতে পারে বলে আপনি মনে করেন? উত্তর:এখন ইউরোপীয় সরকারগুলোর সহায়তাই বরং বেশি দরকার আরব লেখকদের জন্য। ইউরোপের সব ভাষাতেই আরবি লেখকদের লেখা আরও বেশি করে অনূদিত হওয়া দরকার। এর ফলে ইউরোপিয়ান লেখকদের সাথে আরব লেখকদের একটা সম্পৃক্তি গড়ে উঠবে। আর এই সম্পৃক্তি বাড়ানোর জন্য ইউরোপিয়ান লেখকদের অনুষ্ঠানে আরব লেখকদের আমন্ত্রণ জানানো যেতে পারে। প্রশ্ন:তরুণ আরবি লেখকদের উদ্দেশে আপনার কী উপদেশ? উত্তর:পড়তে হবে এবং পড়তেই হবে। ব্যাপক পড়াশোনাই একজন লেখকের সফল হবার পথে প্রধান সহায়ক। কিন্তু কম্পিউটারের কারণে আরবের তরুণ লেখকদের ক্ষেত্রে পড়াশোনায় ঘাটতি লক্ষ করা যাচ্ছে। আরব সাহিত্য বা সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে হলে তাদের অন্য দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে হবে।