সেলিম আল দীন

তাঁর নিদানের আগে

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০১৩, ১৮:৫১
প্রয়াত নাট্যকার সেলিম আল দীন সকাল-সন্ধ্যা দুই বেলা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃক্ষশোভিত পথে হাঁটতে বেরোতেন। এই প্রাতঃ ও সান্ধ্যভ্রমণ সম্পর্কে তাঁর ছাত্র-ছাত্রী ও ভক্ত-শিষ্যদের কম-বেশি জানা। সঙ্গে থাকত তাঁর ছাত্রছাত্রী, ভক্ত-শিষ্য এবং বাধ্যতামূলকভাবে আমি। ৯ জানুয়ারি, ২০০৮। রাত সাড়ে ৮টার দিকে স্যারকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রান্তিক গেটে রেখে আমি রেডিওকলোনির বাসায় ফিরে আসি। রাতের খাবার খেতে বসেছি, ঠিক সেই সময় মোবাইল ফোন বেজে উঠল। স্যারের ড্রাইভার ফারুকের ফোন— :স্যার, সেলিম স্যার মাথা ঘুরে বাসার সিঁড়িতে পড়ে গেছেন। ফারুকের কথা শেষ হলো না, রুদ্ধশ্বাসে দৌড় লাগালাম, পোশাক বদল না করেই। একদৌড়ে রেডিওকলোনি বাসস্ট্যান্ড। কিন্তু কোনো বাস নেই। বাসের অপেক্ষায় না থেকে ক্যাম্পাসের দিকে দৌড়াতে থাকি। আধা মাইল পথ দৌড়াই, তারপর একটি বাস আসতে দেখে হাত তুলি। চটজলদি উঠে পড়ি তাতে। স্যার তখন বেডরুমে শোয়া। আমার পায়ের আওয়াজ পেয়ে চোখ খুললেন। আমার অজান্তে বুকের গহিন থেকে ভাঙা ভাঙা স্বরে একটি শব্দ বেরিয়ে এল—স্যার...। সেই শব্দের সঙ্গে বেরিয়ে আসে কয়েক ফোঁটা অশ্রুও। স্যার বাঁ হাতে ঠেস দিয়ে উঠে বসলেন। তাঁর ঠোঁটে মুচকি হাসি। বললেন, তুই কখন এলি? :এইমাত্র, স্যার। :হঠাত্ মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলাম, বাপ! :ডাক্তার ডাকব, স্যার? :ধুর বেটা! আমি অসুস্থ নাকি? বস, এখানে আমার কাছে এসে বস। তাঁর সিথানে বসে পড়ি—পিতার কাছে পুত্র যেভাবে বসে, কিংবা গুরুর কাছে শিষ্য। তার কাঁচা-পাকা চুলে আঙুল চালনা করি। প্রায় আধা ঘণ্টা পর তিনি কম্পিউটার রুমের খাটে এসে বসলেন। কম্পিউটার ছেড়ে রবীন্দ্রনাথের গান চালাতে বললেন। কদিন আগে আজিজ সুপার মার্কেট থেকে রবীন্দ্রসংগীতের একটা সিডি এনেছিলাম। ‘গীতাঞ্জলি’র গান। স্যার খুব পছন্দ করেছেন। কম্পিউটারে গান বাজছে—‘এই যে মধুর আলস ভরে/ মেঘ ভেসে যায় আকাশ ’পরে/ এই যে বাতাস দেহে করে অমৃতরক্ষণ—/ হূদয়হরণ...’ মাথা হেঁট করে স্যার গান শোনায় মগ্ন। সুরে সুরে এদিক-ওদিক দুলছেন, মাঝে মাঝে দোলাচ্ছেন মাথাটিও। বোঝা যাচ্ছে, ভেতরের কোনো কষ্টকে দূর করার জন্য তাঁর চিরদিনের আশ্রয়স্থল রবীন্দ্রনাথে সমর্পিত হয়ে স্বস্তি পেতে চাইছেন। একমাত্র রবীন্দ্রসংগীতই তাঁকে স্বস্তি দেয়, শক্তি দেয়, শান্তি দেয়; এনে দেয় শিল্পের নবতর ভাবনা। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে গান বাজল। স্যার বললেন, তুই বাসায় চলে যা। :না স্যার, আমি আজ এখানে থাকব। আমার কথা তিনি শুনবেন কেন? একবার যা বলেছেন তার নড়চড় হবে কেমন করে! আমি উঠছি না দেখে ড্রাইভারকে ডেকে বললেন আমাকে গাড়িতে করে বাসায় পৌঁছে দিতে। আমি যখন বাসায় ফিরে আসি রাত তখন বারোটা। দুই. ১০ জানুয়ারি দিনগত রাত দেড়টা। আমি কম্পিউটার রুমে বসে বসে তাঁর ‘ধাবমান’-এর প্রুফ দেখছি। বইমেলার আর বেশি দেরি নেই। জাগৃতি প্রকাশনী থেকে বইটি বের হবার কথা রয়েছে। প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনের সঙ্গে কথা পাকাপাকি। যত দ্রুত সম্ভব পাণ্ডুলিপিটি প্রস্তুত করতে হবে। সারাদিন খুব ধকল গেছে। সকাল দশটায় স্যারের বাসায় এসে দেখি, স্যার শোয়া থেকে উঠে বসতে পারছেন না। দ্রুত ক্যাম্পাসের সরকারি ক্লিনিকের ডাক্তার লিটনকে ডেকে আনলাম। তিনি মেপে দেখলেন, শরীরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা মাত্র ৬০! এই অবস্থা দেখে স্বয়ং ডাক্তারও শঙ্কিত। চোখে-মুখে শঙ্কার গাঢ় ছাপ। সঙ্গে সঙ্গে স্যালাইন লাগানো হলো। বিকেল নাগাদ প্রেসার নব্বইয়ে উঠে এল। সন্ধ্যার দিকে তাই কিছুক্ষণ ঘুমিয়েছিলেন। রাত বারোটার দিকে একবার আমি মাশরুমের স্যুপ তৈরি করে দিয়েছি, কিন্তু খুব একটা খেতে পারেননি। উত্কর্ণ হয়ে আছি, স্যার আমাকে হঠাত্ ডাকেন কি না। বিশ্ব চরাচর নীরব-নিস্তব্ধ। বৃক্ষরাজি থেকে টুপটাপ ঝরে পড়ছে শীতের শিশির। আমার রুমের খাটে ঘুমাচ্ছে স্যারের ছাত্র শাহজাহান। কাল রাত থেকে তিনি স্যারের সেবাযত্নে লেগে আছেন। স্যারের সহধর্মিনী বেগমজাদী মেহেরুন্নেসা তাঁর নিভৃত কক্ষে নামাজ, কোরান তেলাওয়াত আর তসবিহ পাঠে মগ্ন। শীতরাতের নীরবতা ভেঙে হঠাত্ পায়ের আওয়াজ। করিডরে এসে দেখি, স্যার টলতে টলতে ড্রইংরুমের দিকে আসছেন। দ্রুত তাঁর ডান বাহু ধরে ফেলি। এক মুহূর্ত। তিনি ঢলে পড়ে যাচ্ছেন। কিছুতেই তাঁকে ধরে রাখতে পারছি না। আমার উচ্চকণ্ঠ শুনে ম্যাডাম ও শাহজাহান দ্রুত বেরিয়ে এলেন। ততক্ষণে আমি ফ্লোরে বসা, আর স্যার আমার কাঁধে হেলান দিয়ে আধশোয়া। হূদেরাগ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ এই আমার একবারের জন্যও মনে হলো না, এটা যে হার্ট অ্যাটাক ছিল! স্যারকে ম্যাডাম ও শাহজাহানের কাছে রেখে ড্রয়ার থেকে গাড়ির চাবি বের করে দ্রুত ক্লিনিকে চলে যাই। বিকেলে অনেকটা সুস্থ বোধ করায় ড্রাইভারকে বসায় চলে যেতে বলেছেন স্যার। তাই অদক্ষ হাতে নিজেকেই ড্রাইভ করতে হচ্ছে। ডাক্তার লিটন এসে বললেন, এখুনি যেন ঢাকার কোনো বড় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় স্যারকে। সঙ্গে সঙ্গে ড্রাইভারকে ফোন করে দ্রুত আসতে বলি। কিন্তু স্যার বেঁকে বসলেন। কিছুতেই তিনি হাসপাতাল যাবেন না। কাকুতি-মিনতি করলাম। কাজ হলো না। ঈষত্ রাগান্বিত কণ্ঠে হাসপাতাল যেতে জোর তাগাদা দিলাম। শুনলেন না। চাকরি ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা বললাম। পাত্তাই দিলেন না। তিনি বারবার হূদেরাগ বিশেষজ্ঞ ডা. সজল ব্যানার্জিকে ফোন দিচ্ছেন। নিজের অবস্থা খুলে বলছেন। ডাক্তার বলছেন, ‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, আপনার হার্ট অ্যাটাক হতেই পারে না।’ ব্যানার্জির কথা শুনে শিশুর মতো সরল হাসি স্যারের মুখে। তিন. ১১ জানুয়ারি ভোর। বাসার পেছনের গাছগাছালি থেকে স্যারের প্রিয় পাখিগুলো বারান্দায় এসে কিচিরমিচির ডাকছে। প্রতিদিন এ সময়টাতে তিনি ড্রইংরুমে লেখার টেবিলে থাকেন। এক কাপ দুধ-চা খেয়ে অবিশ্রান্ত ব্যানসন সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখে চলেন। অথচ এখন তিনি ঘুমোচ্ছেন। সারা রাত এক মুহূর্তের জন্যও ঘুমাননি। ডাক্তার লিটনের ভাষায় ‘রেস্টলেস’। স্যারকে যখন কিছুতেই হাসপাতাল নিতে রাজি করানো গেল না, রাত তিনটার দিকে ক্লিনিকে ফিরে গেলেন ডাক্তার। তার চোখ-মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল, তিনি আগের তুলনায় বেশি শঙ্কিত। তখন সকাল সাতটা। গাড়ি চলছে বারডেমের উদ্দেশে। সাভার বাসস্ট্যান্ড পার হলে স্যার গাড়ি থামাতে বললেন। বললাম, কেন, স্যার? :সিগারেট নে দোকান থেকে। :প্রশ্নই আসে না। :চুপ থাক, বেটা! :বেয়াদবি নেবেন না স্যার, আপনার এই আদেশ আমার পক্ষে মানা সম্ভব নয়। :ঠিক আছে আমি নিজেই যাচ্ছি দোকানে। স্যার গাড়ি থেকে নামার জন্য দরজা খুললেন, সঙ্গে সঙ্গে আমি পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করলাম। অর্ধেকটা ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে বললাম, ‘এই অর্ধেক টানুন তাহলে।’ স্যার চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে হেসে উঠলেন, আর আমার চোখ অশ্রুভারাক্রান্ত। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ইসিজি করাতে হবে। আসাদগেট পর্যন্ত এসে কী ভেবে আর বারডেমে গেলাম না। চলে এলাম পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। পপুলারের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে স্যার বললেন, ‘খুব খারাপ লাগছে রে, নোমান।’ আমার হাত-পা থরথর করে কাঁপতে থাকে। নিজেকে বড় বেশি শূন্য আর একা মনে হতে লাগল। কেন, তা নিজেও বুঝতে পারছি না। স্যারকে বুঝতে দিচ্ছি না আমার মনের খবর। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে স্যারকে মিরপুর নিয়ে যাওয়া হলো, তাঁর ছোট ভাই আব্দুল গণি খোকনের বাসায়। ইচ্ছে ছিল ক্যাম্পাসে নিয়ে যাব, কিন্তু তাঁর ভাইয়েরা মানলেন না। ফলে কিছুটা বিরক্ত হয়ে আমি বাসার নিচে চুপচাপ গাড়িতে বসে আছি ড্রাইভারসহ। দুপুর একটার দিকে ফোন বেজে উঠল। স্যারের ফোন। :নোমান, আমি ক্যাম্পাসে ফিরে যাব। এরা আমাকে যেতে দিচ্ছে না, তুই এসে আমাকে নিয়ে যা। আমি সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত উপরে উঠলাম। ততক্ষণে তিনি দরজা পেরিয়ে সিঁড়ির মাথায় চলে এসেছেন। আমাকে দেখেই একটা হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, চল। খেয়াল করি, তাঁর চোখে-মুখে ক্যাম্পাসে ফিরে যাওয়ার আকুতি। তাঁর ভাইবোনদের শত আপত্তি অগ্রাহ্য করে তিনি গাড়িতে উঠে বসলেন। তাঁর প্রিয় ক্যাম্পাস তাঁকে টানছে, গভীরভাবে টানছে। এই টান অগ্রাহ্য করা তাঁর পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়! চার. ক্যাম্পাসে ফিরতে ফিরতে বিকেল চারটা। স্যারকে বেডরুমে শোয়ানো হলো। শ্বাস নিতে খানিকটা কষ্ট হচ্ছে তাঁর। লম্বা শ্বাসপ্রশ্বাস। ডাক্তার লিটন এসে স্যারকে দেখেই বললেন, এখুনি হাসপাতালে নিতে হবে। আমি বললাম, চলেন স্যার। :কোথায়? :হাসপাতালে। আমার চোখে চোখ রাখলেন তিনি। বললেন, যেতেই হবে? :হ্যাঁ, স্যার, যেতেই হবে। :কোন হাসপাতালে? :বারডেমে, স্যার। স্যার কয়েক মুহূর্ত আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন, তারপর হেসে উঠলেন। আমার এক বন্ধু উপস্থিত ছিল সেখানে। সে রসিকতা করে বলল, ‘অসুবিধা নাই, স্যার, বিখ্যাত মানুষেরা বারডেমেই মারা যান।’ তার কথা শুনে স্যার হা হা স্বরে হেসে উঠলেন। সেই হাসির মধ্যে এতটুকু মালিন্য নেই, শঙ্কা নেই, ত্রাস নেই। লম্বা শ্বাস টানতে টানতে দু-হাতে তালি বাজিয়ে সুর দিয়ে গাইতে লাগলেন— ‘বারডেমে গেলে পরে/ কেউ তো আর ফেরে না রে/ ফেরে না রে...ফেরে না রে...ফেরে না...।’ গাড়ি চলছে ঢাকার উদ্দেশে। গন্তব্য শাহবাগের বারডেম। সেখানে আসছেন নাসির উদ্দীন ইউসুফ এবং অন্যরা। না প্রিয় পাঠক, সেলিম আল দীন ফেরেননি। আর কখনো ফিরবেন না। জেনেও অপেক্ষায় থাকি, খুঁজে বেড়াই, কান পেতে থাকি। দূর দিগন্ত থেকে বাতাসে ভর করে ভেসে আসে—ফেরে না রে...ফেরে না রে...ফেরে না...। ভাবি, তিনি যে আর ফিরবেন না, তা কী করে আগে থেকে টের পেলেন? মৃত্যু সম্পর্কে তাঁর এই পূর্ব-বোধ কী করে হলো? তাঁর এই আকস্মিক চলে যাওয়া সাহিত্য-সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট মানুষদের ভেতর বিপুল শূন্যতার সৃষ্টি করে। ১৪ জানুয়ারি তাঁর চলে যাওয়ার দিন। আচার্য, আমাদের শ্রদ্ধা গ্রহণ করুন।