নতুন বছরের শুরুতেই (১ থেকে ৪ জানুয়ারি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটমণ্ডলে প্রদর্শীত হয়ে গেল অনুবাদ নাটক দ্য মেজারস টেকেন বা সিদ্ধান্ত; প্রযোজক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ। মার্কসবাদী রাজনৈতিক ভাবাদর্শের এ নাটকটির মূল রচয়িতা জার্মান নাট্যকার বার্টল্ট ব্রেখট। তিনি রাজনৈতিক নাট্যভাষা ও মার্কসবাদী ভাবাদর্শের পশ্চিমা দ্রষ্টা। নাটকটি অনুবাদ ও পুনর্লিখনের কাজটি করেছেন শাহমান মৈশান। নাটকটির নির্দেশক ইসরাফিল শাহীন, সহযোগী নির্দেশক শাহমান মৈশান, কুশীলব নাট্যকলা বিভাগের স্নাতকোত্তর শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা।
নাটকটির শুরুতে তিন ডাকিনির মোহনীয় ভঙ্গিতে প্রবেশের পর অন্যান্য কুশীলবের প্রবেশ। বাদ্যের তালে তালে তিন ডাকিনিকে ঘিরে তৈরি হয় বৃত্তের আবহ। বাজনার ছন্দে নৃত্যের অনন্য উপস্থাপনশৈলী দর্শকদের হূদয় ছুঁয়ে যায়। নড়েচড়ে বসে দর্শক, শিল্পাভিনয়ের এই অনুপম পরিবেশে নাট্যাভিনয় দেখার জন্য।
কয়েকটি পর্বে বিভক্ত নাটকটিতে ক্রমে উঠে আসে বিপ্লবীদের উদ্দেশ্য, কৌশল, রাজনৈতিক মতাদর্শ; শোষকের শাসন-শোষণ ও তাদের জীবনযাপন; শ্রমিকদের শ্রম, ন্যায্য মজুরি পাওয়া না-পাওয়া; শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে অসন্তোষ, ক্ষোভ-আন্দোলন, তাদের ওপর মালিক শ্রেণীর অত্যাচার-নির্যাতন এবং বিপ্লবীদের সঙ্কটময় জীবনে আখ্যান। নাটকটি আধুনিক সভ্যতার বিভিন্ন দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পাশাপাশি বাস্তবিক সাম্যবাদী বিশ্লেষণ দর্শকের স্নায়ুর ভেতর ছড়িয়ে দেয় সহজ ভাষায়। দর্শকদের টেনে নিয়ে যায় ভাবাদর্শিক জগতে। দ্বন্দ্ব-সংঘাত আর শঙ্কাময় পরিবেশ দর্শকদের মোহাচ্ছন্ন করে তোলে বারবার। দৃশ্যান্তর-পরম্পরায় ‘কী হয়, কী হয়’ ভাবনা হলভর্তি দর্শককে ঘিরে রাখে প্রতিনিয়ত। আর নাটকের শেষদৃশ্যে তরুণ কমরেডের মৃত্যু এক অপরিমেয় বেদনার সমুদ্রে নিমজ্জিত করে দর্শকদের।
নাটকটির প্রচারপত্রে উল্লেখ, ‘দ্য মেজারস টেকেন বা সিদ্ধান্ত প্রকৃতপক্ষে কয়েকজন বিপ্লবীর এমন এক সঙ্কটাপন্ন পরিণতিকে নির্দেশ করে, যা এক তরুণ কমরেডের মৌহুর্তিক আবেগের সাথে কমিউনিস্ট পার্টির স্ট্রাটেজিক বিপ্লবের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হয়ে ওঠে অতি সাংঘর্ষিক। আর পার্টি থেকে বিচ্যুত কিন্তু জনতার প্রতি মহাজাগতিক মমত্ববোধ সত্ত্বেও এই তরুণ কমরেডকে অন্যান্য কমরেডের সহযোগিতায় স্বেচ্ছামৃত্যুর পরিণতি গুণতে হয়। এই মৃত্যু হত্যা নয়, আবার আত্মহত্যাও নয়, তবে কী? এই প্রশ্নের উত্থাপন ও এই প্রশ্নের সাথে মোকাবিলা এই নাটকের নির্যাস।’
প্রতিটি পর্বের শেষে পরবর্তী পর্বের বিষয়বস্তু সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আকারে আগাম ধারাণা দেওয়ার বিষটি নির্দেশকের নৈপুণ্যকেই ইঙ্গিত করে। কুশীলবদের অসাধারণ উপস্থাপনাও দর্শকদের মোহিত করেছে; মুগ্ধ করেছে উপকরণের (প্রপস) চমত্কার ব্যববহার। যেমন—গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে হাতেতৈরি (বাঁশ, কাঠ, রশি প্রভৃতি দ্বারা) প্রতিকী মেশিন ও শ্রমিকদের কাজের দৃশ্য। কুলিদের মাল টানার দৃশ্যও সকলের হূদয় ছুঁয়ে গেছে শিল্পীর আঁকা ছবির মতো। তবে শেষদৃশ্যে তরুণ কমরেডের মৃত্যুর সময় মাথায় পিস্তল ঠেকানো ও গুলির দৃশ্য দেখা গেলেও গুলির কোনো আওয়াজ শোনা যায়নি, যা সবাইকে কিছুটা অবাক করেছে।
নাটকটি নয়া দিল্লির শ্রীরাম সেন্টারে গতকাল (১০ জানুয়ারি, ২০১৩) ন্যাশানাল স্কুল অব ড্রামা (এন.এস.ডি) আয়োজিত ১৫তম ভারতরঙ্গ মহোত্সবেও প্রদর্শীত হয়েছে।
