চলচ্চিত্র

মূলধারার বাংলা চলচ্চিত্রের পরিণত রূপ

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০১৩, ১৮:৫৩
ছোটপর্দার জনপ্রিয় নির্মাতা রেদওয়ান রনির প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘চোরাবালি’। মুক্তির আগে থেকে ছবিটি বিশেষ কয়েকটি কারণে আলোচনায় ছিল। প্রথমত, রেদওয়ান রনি পরিচালিত বেশ কিছু নাটক খুব জনপ্রিয়। তাই দর্শক ও সিনেমা-সমালোচকদের আগ্রহ ছিল। দ্বিতীয়ত, ছবিতে অভিনয় করেছেন কলকাতার জনপ্রিয় নায়ক ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত। তৃতীয়ত, জয়া আহসান—বাংলাদেশের মিডিয়ায় জয়া আহসান যেন এক মিথ! কয়েক বছর ধরে এ কথা প্রচলিত—জয়া মানেই ভালো নাটক, জয়া মানেই ভালো সিনেমা। এ ছাড়া আরও অনেক কারণ রয়েছে। যেমন, এ ছবির গান সুন্দর, প্রচারণা ভালো, সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রগুলো এ ছবির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মুখরিত। ছোটপর্দায় যাঁরা নন্দিত, কিংবা যাঁদের শুরু ছোটপর্দার মাধ্যমে, তাঁরা যখন সিনেমা বানাতে আসেন, তখন তাঁদের সিনেমা নিয়ে সিনেমাপ্রেমীদের মধ্যে গুঞ্জন ওঠে। ২০০০ সালের পর থেকে প্রায় নিয়মিতভাবে ছোটপর্দার নির্মাতারা সিনেমা বানাচ্ছেন। প্রায় প্রতি বছরই ছোটপর্দার নতুন কিছু নির্মাতার বড় পর্দায় অভিষেক হচ্ছে। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়েছেন খুব কম নির্মাতা। অনেক সিনেমা টিভি প্রিমিয়ারেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। আবার, অনেক সিনেমা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশংসিত হয়েছে, দু-একটি পুরস্কারও পেয়েছে। তবে বাণিজ্যিকভাবে এসব নির্মাতার সাফল্য একেবারেই নেই বললে বোধহয় খুব একটা ভুল হবে না। অবশ্য গিয়াস উদ্দিন সেলিমের ‘মনপুরা’ এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। ছবিটির বাণিজ্যিক সাফল্য আকাশছোঁয়া। বিএফডিসি-কেন্দ্রিক মূলধারার বাংলা সিনেমার নির্মাতারা অনেকটা টিটকারি করে বলেন—ছোটপর্দার নির্মাতারা যখন সিনেমা বানাতে আসেন, তখন তাঁরা বানান নাটক—‘বড়দৈর্ঘ্যের নাটক’। তবে কি আটকে থাকবে বাংলা সিনেমা পুরোনো অধ্যায়ে? একপক্ষ বানাবে, বস্তাপচা সিনেমা; যার প্রিন্ট-সাউন্ড ভালো না, গাঁজাখুরি গল্প, একই লোকেশন-একই চিত্রায়ণ। মানুষ ছবি দেখতে গিয়ে হতাশ হয়ে ফিরে আসবে। আরেকপক্ষ বানাবে, আর্ট ফিল্ম, যে সিনেমায় অনেক ইতিবাচক দিক থাকা সত্ত্বেও তা সাধারণ দর্শকের মাথার ওপর দিয়ে চলে যাবে। যে সিনেমা সমালোচকদের প্রশংসা পাবে, পুরস্কার পাবে। কিন্তু সে সিনেমা সীমাবদ্ধ থাকে টিভি প্রিমিয়ার ও দেশ-বিদেশের নানা চলচ্চিত্র উত্সবে। একপক্ষ মনে করে, আমরা যা বানাচ্ছি তা দিয়েই বাংলা চলচ্চিত্র উদ্ধার হবে। অন্যপক্ষেরও ঠিক একই ভাবনা। সিনেমার সুদিন ফিরিয়ে আনতে দর্শকদের হলমুখী করা ছাড়া কোনো উপায় নাই। এ জন্য প্রয়োজন মূলধারার বাংলা সিনেমার পরিবর্তন। আমি আর্ট ফিল্ম কিংবা বিকল্পধারার সিনেমার বিপক্ষে নই। কিন্তু মাথায় রাখতে হবে এ ধরনের সিনেমা কজন দর্শক মাথায় ধারণ করতে পারে? কজন দর্শক এ ধরনের সিনেমা দেখার জন্য হলে যাবে? তা ছাড়া একথাও মাথায় রাখতে, হবে আর্ট ফিল্ম বা বিকল্পধারার সিনেমার দর্শকেরা খানিকটা অভিজাত রুচির। ঢাকা শহরের অনেক অভিজাত এলাকায় (যেমন ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরা) সিনেমা হল নেই। সুতরাং মূলধারার বাংলা সিনেমায় পরিবর্তন না এনে দর্শকদের হলে ফেরানো সত্যিই খুব দুরূহ। সে ক্ষেত্রে মূলধারার বাংলা সিনেমার পরিচালকদের কাছে একটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হতে পারে ‘চোরাবালি’। চোরাবালি সিনেমায় এমন অনেক বিষয় আছে, যা মূলধারার বাংলা সিনেমায় দর্শক যুগ যুগ ধরে দেখছে এবং যুগ যুগ ধরে বিরক্তও হচ্ছে। যেমন, আর্থ-সামাজিক কারণে নায়ক অপরাধের জগতে পা বাড়ায়, নায়িকার প্রেমে পড়ে সাধারণ জীবনে ফিরে আসতে চায় নায়ক, নায়কের গায়ের শক্তি অন্যদের চেয়ে বেশি, নায়ক প্রধান ভিলেনকে মেরে ফেলে, নায়ক সাধারণ-ক্ষমা পায়, কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে নায়ক বের হয়, নায়িকা ফুল হাতে নায়কের জন্য অপেক্ষা করে। তার পরও কেন এ ছবি নিয়ে এত আলোচনা? কেন এ ছবি দেখার জন্য মানুষের এত আগ্রহ? কেন দর্শক মুগ্ধতা নিয়ে হল থেকে বের হচ্ছে? এর প্রধাণ কারণ হলো উপস্থাপন। এ সিনেমার উপস্থাপন সত্যিই মনোমুগ্ধকর। সে দিক থেকে বলা যায়, চোরাবালি মূলধারার বাংলা সিনেমার আধুনিক সংস্করণ। এ সিনেমার মাধ্যমে রেদওয়ান রনি প্রমাণ করতে পেরেছেন— মূলধারার বাংলা সিনেমা এ রকমই হওয়া উচিত। নাচ-গান-ফাইট থাকলেই সিনেমা বস্তাপচা হয় না। পরিচালকের দক্ষ নির্মাণ সিনেমায় এনে দিতে পারে নান্দনিকতা। তাই চোরাবালি শুধু একটা সিনেমা নয়, একটি আন্দোলন—সিনেমার দিনবদলের আন্দোলন। এ সিনেমায় খুঁজে পাওয়া যায় মূলধারার বাংলা সিনেমার পরিণত রূপ, স্বতন্ত্র ও সাবলীল উপস্থাপন। ‘চোরাবালি’ সিনেমায় পরিচালক দর্শকের মধ্যে এক ধরনের উত্কণ্ঠা তৈরি করতে পেরেছেন। ‘এরপর কী হবে’ ‘এরপর কী হতে পারে’—এ ধরনের প্রশ্ন দর্শকের মাথায় রেদওয়ান রনি প্রি-সিকোয়েন্স থেকেই ঢুকিয়ে দিতে পেরেছেন। যদিও ছবিটির শেষ দৃশ্য প্রচলিত মূলধারার বাংলা সিনেমার মতোই, তার পরও ছবিটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত সবার মনে প্রশ্ন তৈরি হয়—শেষে কী হবে? এটি একটি দ্রুত গতিসম্পন্ন সিনেমা। ছবিটিতে দর্শকের ‘বোরিং’ বা ধৈর্যহারা হওয়ার সুযোগ একেবারেই রাখেননি পরিচালক। অযথা কোনো সিকোয়েন্স দীর্ঘ না হওয়ায় সিনেমার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটা ছন্দ খুঁজে পাওয়া যায়। শহীদুজ্জামান সেলিম চোরাবালিতে অভিনয় করেছেন দুর্দান্ত। তাঁর অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে দর্শক বারবার তুমুল করতালি দিয়েছে। জয়া আহসান ও ইন্দ্রনীল ভালো অভিনয় করলেও শহীদুজ্জামান সেলিমের অভিনয়-দক্ষতার কাছে দুজনকেই খানিকটা ম্লান মনে হয়েছে। এটিএম শামসুজ্জামান, সোহেল রানা, ইরেশ যাকের, পিয়া, হুমায়ুন সাধু, সালেহীন স্বপন—প্রত্যেকেই তাঁদের চরিত্র যথাযথভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। ছবিতে গানের ব্যবহারে পরিচালক পরিমিতিবোধের পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছেন। আবহসংগীতও দৃশ্যায়নের সাথে মানানসই লেগেছে। ক্যামেরার কাজ এককথায় চমত্কার! ছোটপর্দা ও বিজ্ঞাপনে কাজ করে বেশ সুনাম কুড়ানোর পর বড় পর্দায়ও সার্থক হয়েছেন সিনেমাটোগ্রাফার খায়ের খন্দকার। ফ্রেমিং ও লাইটিংয়ের সুসমন্বয় চোখে পড়েছে পুরো সিনেমা জুড়ে। ‘চোরাবালি’ প্রমাণ করতে পেরেছে, বাংলা সিনেমার সুদিন ফিরে এসেছে। অভিনন্দন রেদওয়ান রনিকে।