প্রশ্ন :আপনি অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার ১৪১৯ পেয়েছেন, আপনার অনুভূতি জানতে চাইছি।
কাজী রোজী :গত ১৯ শে ডিসেম্বর ২০১২ সাল—বিজয়ের মাস। অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার আমাকে অসাধারণ অনন্য করে তুলেছে। এ পুরস্কার প্রাপ্তিতে আমি আনন্দিত, গর্বিত—আমি সমৃদ্ধ!
আসলে যেকোনো পুরস্কারই মানুষের জীবনকে উজ্জীবিত করে, উত্সাহিত করে এবং এগিয়ে চলার পথ দেখায়। আমি ইতিপূর্বে যে সকল পুরস্কার অর্জন করেছি, সেগুলোর সাথে অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার ২০১২ আমাকে বিশেষ মর্যাদা, অনন্য মাত্রা দিয়েছে এবং দায়বদ্ধতায় আবদ্ধ করেছে। আমি খুঁজে পেয়েছি আমার নিজস্ব ঘরানা—পথে চলার প্রেরণা।
প্রশ্ন :কবিতার ভুবনে কবে থেকে পথচলা শুরু? কেন এই পথ বেছে নিলেন?
কাজী রোজী :কবিতার ভুবন আসলে কবির জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বিস্তৃত ও বিন্যস্ত থাকে। আমার গ্রাম, গ্রামের পথ-ঘাট-মাঠ, সে মাঠের সবুজ ধানের ক্ষেত শিশুকাল থেকেই আমাকে টানটান ভালোবাসা দিয়ে ধরে রেখেছিল। ছয় বছর বয়সে বাবার হাত ধরে গ্রামের আলপথ বেয়ে যখন হেঁটে গিয়েছি, মুগ্ধ হয়েছি দু-পাশের সবুজের আমন্ত্রণে। ছড়া কাটার বয়স তখন। একসময় বাবাকে প্রশ্ন করেছি—
‘বাবা দেখো, এই সবুজ সবুজ ধানগুলো কী যে অবুঝ অবুঝ কথা বলে! আমি বুঝি না, তুমি কি বোঝো, বাবা!’—সেই আমার শুরু। বাবা বলেছিলেন, ‘তুই কবিতার সাথে বসবাস করতে পারবি।’
সাহিত্যের অন্য যেসব শাখা আছে, তার মধ্যে কবিতাতেই আমি সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছি। ভালো লেগেছে—ভালো বেসেছি এবং কবিতার সাথে সখ্য গড়েছি।
প্রশ্ন :কবিতার মাধ্যমে কী বলতে চান? যা বলতে চান, তার কতটুকু বলতে পেরেছেন?
কাজী রোজী :আমি কবিতার মাধ্যমে দেশ, মাটি, মাতৃভাষা, সমসাময়িককাল, প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসা, সুন্দর প্রকৃতি, মানুষ, মানুষের দুঃখ-যন্ত্রণা এবং লড়াকু জীবনের অধ্যায়গুলো সূচিত করতে চেয়েছি। বলতে চেয়েছি মানুষের কথা। তাদের নিপীড়িত জীবনের কথা। বিশেষত, নারীজীবনের সমুদয় বোধের কথা। তাই তো আমি নির্ভয়ে উচ্চারণ করেছি—‘ভাত দিবার পারস না/ ভাতার হবার চাস/ কেমন মরদ তুই হারামজাদা।’
যতটুকু বলতে চাই, তার কতটুকু বলতে পেরেছি—এ প্রশ্নের জবাব এককথায় দেওয়া যাবে না। কথার আঙ্গুরলতা আমাকে সবসময় জড়িয়ে রাখে। আমি বলে বলে শেষ করতে পারি না। হয়তো আমার অব্যক্ত হূদয়কথা নিয়েই আমাকে ইহলোক ত্যাগ করতে হবে।
একসময় ক্যান্সারকে নির্মূল করতে না পারলেও পরাস্ত করলাম আমি। ‘প্রথম আলো’ দিল ‘নারী শক্তি সম্মাননা’। আমি পেলাম নতুন জীবন। তবে চিকিত্সার কোনো ত্রুটি করিনি। ডাক্তারের উপদেশ কখনোই অবহেলা করিনি। বিভিন্ন মাত্রার টেস্টসহ ওষুধের সহযোগে কম-বেশি বিশ বছর ধরে আমি আজও বেঁচে আছি। আর কী বলব, বাকিটা বুঝে নিয়ো।
প্রশ্ন :আমরা জানি, আপনার জীবন লড়াইয়ের। এ বিষয়ে যদি সংক্ষেপে কিছু বলতেন—
কাজী রোজী :আমার লড়াইয়ের জীবন সম্পর্কে জানতে চাও, তবে শোনো। আমার জন্মচিত্কারের সাথে আমার মায়ের দুধের কোনো সম্পর্ক ছিল না। মা ছিলেন পাণ্ডুর রোগী। ডাক্তারের নিষেধ ছিল, বুকের দুধ না দেওয়ার। নানি ও খালার কাছে শুনেছি, ভাতের ফ্যানের সাথে গুড় মিশিয়ে আমাকে খাওয়ানো হতো। অতএব লড়াইটা আমার জন্ম থেকেই শুরু।
এরপর জীবনঘনিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্য দিয়ে কেটে গেছে দিনকাল। শিক্ষা ও কাব্যসাধনার জীবন কাটানোর মাঝেও নানাবিধ লড়াইয়ের সম্মুখীন হয়েছিলাম। বাপহারা তিনি বছরের একমাত্র সন্তান আমার স্বামী সিকান্দার আবু জাফরকে নিয়েও অনেক সংগ্রামের পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। তখন থেকেই অভাব-অভিযোগ আমাকে পেয়ে বসেছে। মনে পড়ছে, স্বামীর দুধ কেনার জন্য রেডিওতে কবিতা পড়ার সুযোগ করে দিলেন রেডিওর কর্মকর্তা বিশিষ্ট আবৃত্তিশিল্পী আশরাফুল আলম। তিনি সাথে সাথে চেক দিলেন এবং সেই চেক ভাঙিয়ে দুধ কিনে বাড়ি গিয়েছিলাম। সেটা ছিল ১৯৭৫ সাল।
এরপর সরকারি চাকরিতে প্রবেশ। মেয়েকে লেখাপড়া শেখানো, বিয়ের পর্ব শেষ করার পর ১৯৯৪ সালে নতুন এক যুদ্ধের মুখোমুখি হলাম। দুরন্ত, ভয়াবহ ক্যান্সারে আক্রান্ত হলাম। এ যুদ্ধের সাথে অন্য কোনো যুদ্ধের কোনো তুলনা হয় না। কেমোথেরাপি, অপারেশন এবং আবার কেমোথেরাপি—এই নিয়েই চলল জীবনসংগ্রাম। তবে যে প্রসঙ্গটা এখানে আসেনি, সেটা আমার নাট্যজগত। আমি একজন নাট্যরচয়িতা নাট্যশিল্পী এবং ‘আত্ত্বিক নাট্য সম্প্রদায়ের’ ভাইস প্রেসিডেন্ট। আমার লেখা দুটি মঞ্চনাটক ‘কুসুম বেত্তান্ত’ ও ‘কুসুম উপাখ্যান’ মহিলা সমিতি ও শিল্পকলা একাডেমীর মঞ্চে নিয়মিত মঞ্চস্থ হয়ে থাকে। আত্ত্বিক নাট্য সম্প্রদায়ের নাট্যদল আমার কুসুম উপাখ্যান নাটকটি ভারতের উড়িষ্যায় মঞ্চস্থ করেছে। ঢাকা বেতার এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনে আমার অসংখ্য নাটক প্রচারিত হয়েছে।
আসলে কবিতার যিনি স্রষ্টা, তাঁর ভেতরে গান ও নাটকের বাণী অঙ্কুুরিতে থাকে। তবে সময় ও সুযোগের সাথে সাথে কারও কারও ভেতর থেকে সেটা প্রকাশিত হয়। কবিতার পাশাপাশি গান, নাটক কিংবা অন্যবিধ রচনার সাথে নিজেকে নিয়োজিত রাখি। ভেতরের এবং প্রয়োজনের তাগিদে এসব রচনার প্রতি আমি হাত বাড়াই—কলম এগিয়ে দিই।
প্রশ্ন :লড়াই আর কবিতা—এই দুয়ের সাথে বসবাস আপনার। এটি কতখানি উপভোগ করেন?
কাজী রোজী :নিদারুণ সত্যি কথা বলেছ। লড়াই আর কবিতা—এ দুয়ের সাথে আমার বসবাস সেই ছোটবেলা থেকে। বেড়ে ওঠার সময়গুলোতে লড়াই আমার অস্তিত্বে মিশেছে এবং কবিতা আমার মনন-মেধায় সঞ্চিত হয়ে থেকেছে।
শরীরে চামড়ার মতো যুদ্ধ আমার অনুসঙ্গ আর কবিতা আমার সুখের নির্যাসের নিভৃত উচ্চারণ এবং ভালোবাসার প্রত্যয়। আমি গোটা বিষয়কে দারুণ উপভোগ করি। আমার একটি কাব্যের নামও কিন্তু ‘লড়াই’।
প্রশ্ন :কবিতা ছাড়ও আপনার গবেষণা ও জীবনীগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। গীতিকবি হিসেবেও আপনি উজ্জ্বল। কবিতার পাশাপাশি এসব লেখালেখি নিয়ে কিছু বলুন।
কাজী রোজী :আমার কবিতা-গ্রন্থের সংখ্যা দশ। শহীদ কবি মেহেরুন নেসাকে নিয়ে একটিমাত্র জীবনীগ্রন্থ রচনা করেছি। রবীন্দ্র সার্ধশত জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ‘উপহাসের কবিতা :রবীন্দ্রনাথ’ শিরোনামের গবেষণাগ্রন্থ একটি। সংগীত রচনা করেছি প্রায় পাঁচশ হবে। সেগুলো এখনো গ্রন্থাকারে প্রকাশ করতে পারিনি!
প্রশ্ন :আপনার একটি কাব্যের নাম ‘আমার পিরানের কোন মাপ নেই’—এমন নামকরণের পেছনের দর্শন কী?
কাজী রোজী :‘আমার পিরানের কোন মাপ নেই’ কাব্যগ্রন্থটি রচনার পেছনে আমার যে গভীর দর্শন কাজ করেছে, তা আমার মৃত্যুচিন্তা। নাম-ভূমিকার কবিতাটির মধ্যে আমি জাগতিক ক্ষত এবং নতকে মানুষের স্বরের সাথে বিবৃতি করেছি। এ কবিতাটি এবং এ কাব্যটি আমার জীবন-ধারাপাতের সাথে মুক্ত মানুষের মুক্ত চিন্তার দ্যোতনার ফসল।
প্রশ্ন :একেবারে সম্প্রতি যেসব কবিতা লেখা হচ্ছে, তা নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?
কাজী রোজী :কবিতার সাম্প্রতিককাল মুহূর্তে বদলায়। কবিতা চলমান জীবনের পরিচ্ছন্ন যাপিত জীবনধারা। সাম্প্রতিককালের তরুণ কবিরা অগ্রজ বা অনুজ কবিদের মতাদর্শের সাথে এক হবেন, সেটা আমি বিশ্বাস করি না। কবিতার ক্ষেত্রপটকে ধারাবাহিক নিয়ম দিয়ে বেঁধে রাখা যায় না। কবি তার হূদয়ের আলোর মশাল জ্বেলে দৈনন্দিন ভাবধারার সাথে সম্পৃক্ততা এনে বিষয়বৈচিত্র্য ও আঙ্গিক নির্মাণ করেন। সেখানে প্রেক্ষাপট ভিন্ন থাকে, মাত্রাও ভিন্ন থাকে, প্রয়োজনে।
আমি স্বাধীন বাংলা বেতারে থেকে যে কবিতা রচনা করেছি, মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে যে কবিতা রচনা করেছি, স্বাধীন বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যে কবিতা রচনা করেছি, রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, নারী ও শিশু-অধিকার, ক্যান্সার-প্রসঙ্গ নিয়ে যেসব কবিতা রচনা করেছি—প্রতিটি ভিন্ন মাত্রার, ভিন্ন মেজাজের। আবার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রশ্নে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী প্রদানের পর যে কবিতা রচনা করেছি, তা একেবারেই ভিন্ন স্বভাবের।
অতএব সম্প্রতি—অতিসম্প্রতি যেসব কবিতা লেখা হচ্ছে, সেসব কবিদের সাথেই তো আমি আছি। টগবগে তরুণ কবিদের রক্তের ঘূর্ণিতেই তো আমি বেঁচে থাকতে চাই। সাম্প্রতিককাল আমার কাছে চিরকালের মুক্তির সোপান।
