শোকাঞ্জলি

জাপানের সাহিত্য :উন্মেষ পর্ব

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০১৩, ১৮:৫৪
সভ্যতায় জাপানের প্রযুক্তিগত অবদান প্রশ্নাতীত। তবে সাংস্কৃতিক অর্জনও বিপুল। বিশেষ করে জাপানের হাইকু এবং ১৯৯৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ঔপন্যাসিক কেনজাবুরো ওয়ে বিশ্বের সাহিত্যরসিকদের কাছে সুপরিচিত নাম। এসব কারণেই সাহিত্যপ্রেমীরা জাপানের সাহিত্য নিয়ে আগ্রহ বোধ করেন। জাপানে সাহিত্যের উন্মেষ ঘটেছিল প্রাচীন যুগে। এককালে যেরকম বাংলা ভাষার ওপর সংস্কৃত ভাষার গভীর ছাপ পড়েছিল—সেরকম দীর্ঘকাল চৈনিক ভাষাটি জাপানি ভাষাকে একচেটিয়াভাবে প্রভাবিত করেছিল। জাপানি কবিসাহিত্যিকরা সে প্রভাব কাটিয়ে উঠে নিজস্ব লিপির উদ্ভাবন করেছিলেন। একই সঙ্গে সাহিত্যের বিভিন্ন আঙ্গিক নিয়ে নানান পরীক্ষানিরীক্ষা করেছেন। জাপানের ওপর চীনের প্রভাব থাকায় একটা সময় জাপানে গদ্য-পদ্য দুটোই লেখা হতো চৈনিক ভাষায়। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দ থেকে জাপানে চীনের এই প্রভাব বিশেষ করে ধাতুর ব্যবহার এবং কৃষিকাজের ক্ষেত্রে অনুভূত হতে থাকে। এই প্রভাব হয়েছিল যুগান্তকারী। কেননা, এই নবতর কৃেকৗশলের ফলে জাপানে এক সংহত সমাজ ও সংস্কৃতি গড়ে উঠতে থাকে। কেবল নবতর কৃেকৗশলই নয়, বৌদ্ধধর্ম এবং কনফুসিয়াসের মতবাদ জাপানের জনমানসে প্রভাব বিস্তার করে। তবে জাপানে স্থাপত্য শিল্পের ক্ষেত্রে বৌদ্ধধর্মের গভীর প্রভাব পড়েছিল। মূর্তি ও উপাসনালয়ের নির্মাণে বৌদ্ধ স্থাপত্য রীতিকে অনুসরণ করা হয়েছিল। জাপানে নারা আমলে (৭১০-৭৯৪ খ্রিস্টাব্দ) সাহিত্যের প্রথম উন্মেষ ঘটেছিল । ওই সময়ে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ লেখা হয়। এর মধ্যে ৭১২ খ্রিস্টাব্দে লেখা কোজি-কি (প্রাচীন বিষয়ের রেকর্ড) ও ৭২০ খ্রিস্টাব্দে ‘নিহোন শোকি’ (জাপানের কালপঞ্জি) অন্যতম। ওই নারা আমলেরই মাঝামাঝি সময়ে সঙ্কলিত হয়েছিল মানিয়োশু (দশ হাজার পাতার সংগ্রহ)। ৭ম এবং ৮ম শতকের ওই সঙ্কলনে ঠাঁই পেয়েছিল প্রায় চার হাজার পাঁচশ কবিতা। কবিরা ছিলেন প্রত্যেকেই দরবারি লোক। এইসব কবি লিখতেন ৫ পঙক্তির ও ৩১ অক্ষরের ‘ওয়াকা’ বা ‘তাংকা’ আঙ্গিকে। ওই সময়ের একজন প্রথিতযশা কবি হলেন কাকিনোমোটো নো হিতোমারো। কবিতার বিষয় সম্রাটের রাজ্যাভিষেক কিংবা শিকারের বর্ণনা। তথাপি ওই সময়ের কবিতায় প্রকৃতি ও প্রেম বিষয়ে ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে। হেইয়ান আমলে (৭৯৪-১১৮৫ খ্রিস্টাব্দ) রাজদরবারের কবিরা বহুলভাবে ওয়াকা আঙ্গিক ব্যবহার করেছেন; এর পাশাপাশি কাব্যের বিষয়বস্তুও সীমাবদ্ধ করেছেন। যথারীতি রাজদরবারি কবিরা লিখতেন দরবারি বিষয়-আশয় (একে বলে মিয়াবি) নিয়ে। অবশ্য ওই কবিদের কাব্যে প্রকৃতির ক্ষণস্থায়িত্ব ও মানবিক অনুভূতিও প্রকাশ পেয়েছে। এই ধরনের ভাব প্রকাশের রীতিকে বলে মোনো নো এওয়ার। ৯০৫ খ্রিস্টাব্দে প্রাচীন এবং সমসাময়িক কাব্য নিয়ে সংকলিত হয় কোকিনশু। এটিই পরবর্তীকালে দরবারি কবিতার শৈলী নির্ধারণ করে দেয়। ওই সময়ই কানা নামে একটি লিখন পদ্ধতি আবিস্কৃত হয়েছিল। এই পদ্ধতিতে প্রতীকের মাধ্যমে একটি অক্ষর বোঝাতো। এতে এই প্রথম বারের মতো জাপানিরা চীনা ভাষার পরিবর্তে তাদের মাতৃভাষায় স্বাধীনভাবে লিখতে পারল। কানা-র উদ্ভাবনে গদ্যেরও উন্মেষ হয়েছিল। জাপানে দরবারের মেয়েরাই প্রথমে গদ্য লিখেছিল। এসব গদ্যের বিষয়বস্তু ছিল কাল্পনিক দিনলিপি, কোনও বিখ্যাত ব্যক্তি সম্বন্ধে মজার তথ্য বা কোনো কিছুর তালিকা। হেইয়ান আমলের দুটি নারী দুটি উত্কৃত্ষ্ট গদ্যরচনা করেছেন। এর একটি মাকুরা নো সোশি (বালিশ-বই); এটি লিখেছেন সেই শোনাগন এবং অন্যটি হলো গেনজি মোনোগাতারি (গেনজির উপাখ্যান; এটি সম্ভবত ১০১০ খ্রিস্টাব্দে লেখা)। এটি লিখেছেন মুরাসাকি শিকিবু। গেনজি মোনোগাতারির বিষয়বস্তু দরবারি জীবন নিয়ে সুদীর্ঘ উপন্যাস। কামাকুরা যুগে (১১৯২-১৩৩৩ খ্রিস্টাব্দ) রচিত হয়েছিল দুটি অসাধরণ সাহিত্য কর্ম। এর একটি হলো শিন কোকিনশু (প্রাচীন ও সমসাময়িক কবিতার নতুন সঙ্কলন ১২০৫ খ্রিস্টাব্দ) এবং অন্যটি হলো হোজোকি (আমার কুঁড়েঘরের বর্ণনা ১২১২ খ্রিস্টাব্দ)। শিন কোকিনশু অসাধারণ দরবারি কবিতার নিদর্শন। এর নান্দনিক মূল্য ছাড়াও রয়েছে গভীর রহস্যময়তা (ইউজেন)। হোজোকি লিখেছেন কামো নো চোমেই নামে একজন প্রাক্তন দরবারি পুরোহিত। শিরোনাম দেখেই বোঝা যায় এটি একটি বর্ণনামূলক রচনা। হোজোকি-র বিষয়বস্তু—বৌদ্ধধর্ম। বিশেষ করে মৃত্যুর মুখে পৌঁছে দীনহীন অবস্থায় আমিডা (অমিতাভ?) বুদ্ধের বিশুদ্ধ স্বর্গভূমি যাত্রার প্রস্তুতি । জাপানে ১২ শতকের শেষের দিকে তাইরা এবং মিনামোটো গোত্রের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ বেধেছিল। ১২২০ খ্রিস্টাব্দে এই বিষয় নিয়ে লেখা হয়েছিল হেইকি মোনোগাতারি (হেইকির গাথা); একে গেনজি মোনোগাতারি (গেনজির উপাখ্যান)- এর সঙ্গে তুলনা করা হয়। সমালোচকদের মতে, আধুনিক-পূর্ব সময়ে জাপানে এটি অনন্য গদ্য সাহিত্য। এতে দু’পক্ষের যোদ্ধা এবং দরবারি অভিজাতদের বর্ণনা রয়েছে। সাহিত্যমূল্য ছাড়াও গেনজি মোনোগাতারি-র ঐতিহাসিক গুরুত্বও রয়েছে। এই আখ্যানে প্রাচীন দরবারি যুগ থেকে সামন্ত যুগের রূপান্তর বর্ণিত হয়েছে। প্রায় দেড় শতাব্দীকালব্যাপী গেনজি মোনোগাতারি রচিত হয়েছিল। গাথাটির রচনা সমাপ্ত হয়েছিল চতুর্দশ শতকের শেষে।