তার মৃত্যু আসন্ন জানতাম, কিন্তু জানতাম না তার মৃত্যু হবে শরতের এমন এক সকালে—যখন আকাশ আশ্চর্য নীল, বাতাস মোলায়েম, নরম রোদ এসে পড়েছে জানালায়, বারান্দায় একটা চড়ুই খেলছে আনমনে। আমি গোসল সেরে চুলে চিরুনি বোলাচ্ছি। তৈরি হচ্ছি অফিসের জন্য। স্বাভাবিক নিয়মে এটাই সপ্তাহের পাঁচ দিনের বাঁধা রুটিন, এ সময় অফিসের জন্য তৈরি হওয়া। শরত্ আমার সবচেয়ে পছন্দের ঋতু, একটু অন্যরকমও। শরতের এক রাতে আম্মা চলে যান। আমি তখন মনের কোমল এক সময় পার করছি আর সে জন্যই কি না জানি না, শরত্ আমার মধ্যে স্মৃতিকাতরতা আনে। আমি নস্টালজিক হই।
এমন শরত্-সকালে তার মৃত্যুসংবাদ শুনি। এ সংবাদ মুঠোফোনে উড়ে আসে তিন হাজার মাইল দূর থেকে। আমেরিকার ফ্লেরিডার এক সেফ হোমে তার মৃত্যু হয়েছে। সে যখন মারা যায়, কে ছিলো মুমূর্ষের শিথানের পাশে, তা আমার জানা নেই। দীর্ঘ রোগ ভোগে সে দেখতে কেমন হয়েছিল, তা আমি অনুমান করতে পারি না। আয়নায় নিজেকে দেখি, চুল বাঁধি, হাতে-মুখে ক্রিম ঘষি, ঠোঁটে লিপস্টিক দিই, চোখে হালকা কাজল টানি।
মৃত্যু আর জীবন নিয়ে তার সাথে আমার কথা হয়েছিল। সেদিন শরত্ ছিল না, ঝকঝকে আকাশ ছিল না। ছিল ঘন বর্ষা, কালো মেঘ। তার কথা জেনেছিলাম তার এক বন্ধুর কাছে, যে তার প্রেমিক হতে পারত। সে বন্ধুর সাথেই গিয়েছিলাম মগবাজারের এক বাসায়, সেখানেই তাকে প্রথম এবং শেষবারের মতো দেখি। তখন দুপুর প্রায় শেষ। আমরা রিকশা নিই, পথে শুরু হয় তুমুল বৃষ্টি। দমকা বাতাসের সাথে ঝড় ওঠে। মতিঝিল থেকে মগবাজার যেতে একেবারে কাকভেজা হয়ে যাই। যখন পৌঁছাই, তখন আশ্চর্যজনকভাবে ঝুপ করে থেমে গেছে বৃষ্টি। চাপা আলো চারদিকে, মেঘের নিচে সূর্যের আধো শরীর। ভেজা উঠান ছেয়ে আছে অসংখ্য সিক্ত কাঁঠালচাপায়। দেয়ালের মাধবীলতার শরীর ছুঁয়ে টপটপ জল ঝরছে। ভেজা মাটি কাঁঠালচাপার গন্ধ, অদ্ভুত আলো-আঁধারের বিকেল নিয়ে টানা বারান্দা পোরোই। ড্রইং রুমে এসে বসি। পুরোনো বাড়ি। বেশ বড়, প্রশস্ত রুম উঁচু সিলিং। কাঠের জানালা। জানালার পাশে একটা কড়ই গাছ। ঘরে এক সেট সোফা, ছোট বইয়ের আলমিরা, একটা কর্নার শো-কেস, বড় টিভি, মেঝেয় দেয়ালঘেঁষে সুন্দর করে সাজানো উঁচু গদির বিছানা, তার ওপর নকশিকাঁথার সাজানো কুশন। দেয়ালে সূচিকর্মের বাঁধানো ছবি। ঘরজুড়ে রুচির ছাপ, দেশি সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা।
সে আসে। ছোটখাটো শরীরের উজ্জ্বল প্রাণবন্ত এক মেয়ে। আমি জানি, সে তিন সন্তানের মা। তার বড় মেয়ের বয়স চৌদ্দ বছর। তার পরও তার জন্য মেয়ে শব্দটাই আমার যথার্থ মনে হয়। তার চোখ সামান্য বাদামী যা চোখে আশ্চর্য এক উজ্জ্বলতা এনেছে। কালো কোঁকড়ানো চুল ঘাড়ের কাছে বটে আছে, যা ‘গিফট অব দ্যা ম্যাজাই’-এর ডেলার কথা কথা মনে করিয়ে দেয়। ডেলা তার আশ্চর্য সুন্দর চুলগুলো কেটে ফেলার পর তাকে যেমন স্কুলপালানো বালক মনে হচ্ছিল। তাকেও চঞ্চল, মিষ্টি স্কুল পালানো দুষ্টু বালকের মতো লাগে। সে সুন্দর করে সালাম দেয়। তার ত্বকের উজ্জ্বলতায় কিছুক্ষণের জন্য বিমূঢ় হয়ে থাকি। আমার জানামতে এবং আমার চোখ যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছে, তাতে কোনো ক্যান্সারের রোগীর ত্বক এত মসৃণ এবং প্রভাময় দেখিনি। আরও একবার মনে করতে চাই, সে তিন সন্তানের মা, চল্লি¬¬শোর্ধ এবং ক্যান্সারাক্রান্ত। না, কোনোটাই বিশ্বাস করতে পারি না। সে অসম্ভব কমনীয় এবং পেলব। প্রাণ তাকে ঘিরে আছে আশ্চর্য কোলাহল নিয়ে। তার অবয়বের জন্য একটি উপমাই যথার্থ। হ্যাঁ, সে কমলার কোয়ার মতো টসটসে, টলটলে, প্রাণরসে পরিপূর্ণ। সে সুন্দরী কি না, আমি তা ভাবতে পারি না, সে সুন্দরীর চেয়ে অধিক কিছু, তার মুখের আশ্চর্য কোমল ও উজ্জ্বল দ্যুতি সৌন্দর্য শব্দের চেয়েও অধিক কিছু। সে প্রজ্বালিত শিখার মতো, এক অন্য শক্তি এবং আলোয় জ্বলজ্বলে। একই সাথে এ শিখা অদ্ভুত কোমল এবং প্রশান্ত। তার দিকে সত্যিকার মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে থাকি। তার উচ্চারিত ‘আপা সালাম’ শব্দের কিন্নর ধ্বনিতে মোহাবিষ্ট হয়ে পড়ি। সালামের উত্তর দিই কি না, মনে করতে পারি না। এই অসমাপ্ত সালাম বিনিময়ের মাঝেই তার বন্ধু বলেন, এই তোমার লেখিকা আপা।
সদ্য আমার একটা উপন্যাস বের হয়েছে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় টুকটাক লিখছি কিন্তু তা লেখিকা শব্দটি ধারণ করার মতো বড় কিছু নয়। ব্যক্তিগতভাবে শব্দটার প্রতি আমার লোভ এবং পক্ষপাত রয়েছে। আকাশের তারার দিকে তাকানোর মতো শ্রদ্ধামিশ্রিত ভালোবাসা নিয়ে আমি শব্দটার দিকে তাকাই। ওটাকে নাগালের বাইরের এক বিরাট কিছু বলে মনে হয়। তবে কেউ আমাকে লেখক বা লেখিকা বললে ভেতরে বেশ আনন্দ হয়।
আমি লজ্জা নিয়ে বলি, না না, তেমন কিছু না। আমি কোনো লেখিকা নই।
সে হাসে, না, আপনি আমার লেখিকা আপা।
আমি হাত বাড়িয়ে দিই। করমর্দন করি।
বেশ কোমল কণ্ঠে বলি, কেমন আছেন?
আল্ল¬¬ার রহমতে অনেক ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?
ভালো।
তার কণ্ঠস্বর কোমল। সামান্য থেমে থেমে স্পষ্ট উচ্চারণে সে কথা বলে। বোধহয় কথা বলার জন্য তাকে কিছু শক্তি অর্জন করে নিতে হয়। আমি স্মরণ করি, সে অতি সমপ্রতি এক কঠিন অপারেশন মোবাবিলা করেছে। তার কথা বলার ভঙ্গি চোখ ও মুখের মিষ্টি চঞ্চলতার সাথে বিরোধ সৃষ্টিকারী। তার বচন তাকে ধীর-স্থির এবং ভাবালু হিসেবে প্রতিপন্ন করে। অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের বন্ধুত্ব হয়। বাইরে আবার বৃষ্টি নামে। জানালা দিয়ে কড়ইয়ের পাতায় বৃষ্টি আর বাতসের নাচন দেখি। ঘন বৃষ্টির অন্ধকারে প্রশস্ত এ কক্ষের আলো মৃদু মনে হয়। আধো আলো-ছায়া আর বৃষ্টির শব্দ ঘোরলাগা অপ্রাকৃত আধিভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি করে। আমরা নিজেদের আলো-ছায়ার মধ্যে হারিয়ে ফেলি। আমরা যারা বসে আছি, তারা যেন ঠিক আমরা নই। আমাদের অন্য কোনো অস্তিত্ব। আমরা কথা বলি। কিছু কথা ঘরের অন্ধকারে ছায়া ফেলে দাঁড়িয়ে থাকে। বৃষ্টির শব্দের সাথে বেজে চলে হূিপণ্ডের ধুকধুক। সে তার গল্প শুরু করে।
এ গল্পের অনেকটা আমি জানি। গত প্রায় এক বছরে তার বন্ধুর কাছ থেকে এ গল্প আমার বহুবার শোনা। ক্যানসারের সাথে তার লড়াই, রোগযন্ত্রণার রাতে ফোন করা। এখন তার মুখ থেকে শুনি। তার মতো করে দেখা জীবন, লড়াই আর যন্ত্রণা।
সে বলে, বুঝলেন, লেখিকা আপা, যেদিন জানতে পারলাম আমার ক্যান্সার, সেদিন মনে হলো জীবনটা এই এতটুকু। এত ছোট! হঠাত্ সব পাল্টে গেল। আমি একবার কাঁদলাম, পাগলের মতো চিত্কার করতে ইচ্ছে হলো, আবার চোখ মুছে ফেললাম। আর আমার মনে হলো, জীবন এত সুন্দর!
আমি তার হাতটা তুলে নিই, সাদা মাখনের মতো নরম হাত। মাত্র তিন মাস আগে তার বড় একটা সার্জারি হয়েছে। বাইশ ঘণ্টাব্যাপী। বাহ্যিকভাবে বোঝার কোনো উপায় নেই, এখন এই আশ্চর্য সুন্দর মেয়েটার একটা বড় খুঁত রয়েছে। তার ডানদিকের স্তনটা নেই।
সে আবার বলে, সেই অপারেশনের পর যখন জ্ঞান হলো, আস্তে আস্তে কথা বলতে পারলাম। ডাক্তার বললেন, আমি অনেকটা নিরাপদ। তখন আবার মনে হলো, জীবন খুব সুন্দর।
আমি তার হাতে একটু চাপ দিয়ে বলি, জীবন সত্যিই খুব সুন্দর।
কিন্তু যদি সত্যি বলি, আমার জীবন তো এতটা সুন্দর নয়। আপনি বোধহয় জানেন।
আমি জানি সে দুঃখী। তার প্রবাসজীবন সুখের নয়। তার বিয়ে হয়েছে অভিজাত পরিবারে। তারা তাকে সম্মানের সাথে গ্রহণ করেনি। স্বামী অতিরিক্ত পানাসক্ত। সমপ্রতি সে আবার বিয়ে করেছে। সংসার তাকে নিংড়ে নিয়েছে। সর্বশেষ এই ক্যান্সার। এসব দুঃখের সাথে আর কী কী দুঃখ আছে, তা বোঝার জন্য আমি তার চোখের দিকে তাকাই। বাদামি উজ্জ্বল চঞ্চল চোখে দুঃখের কোনো ছায়া কাঁতে দেখি না।
আপনি তো যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী।
তা বলতে পারেন। আমি তাকে ঘৃণা করি। তার প্রতি আমার করুণা আছে।
বুঝতে পারি সে তার স্বামীর কথা বলছে।
আমি বাঙালি নারীর ঊর্ধ্বে তো নই। তাই আমাকে সমঝোতা করতে হয়। আর জানেন তো, আমার তিনটা বাচ্চা।
আমি মাথা নাড়ি। তার সম্পর্কে তার বন্ধু আমাকে অনেক বেশিই বলেছে, যা একজন মানুষকে বুঝে নেবার জন্য যথেষ্ট।
আপনি তো বহু বছর আমেরিকায়।
সেটা আমার জন্য একটা বিশেষ বিষয় কিন্তু দেশ তো মানুষের পরিচয় পাল্টায় না।
সেটা আমি খুব ভালো জানি না। এ দেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশ দেখিনি। আর আমরা যারা এ দেশকেই শুধু জানি, তারা ভাবি এ দেশের গণ্ডী পেরোনো মানেই একটা বড় অর্জন, মুক্তির বাতাস।
সে হাসে। খুব করুণ হাসি, আজ আমাকে দেখার পর আপনার কী মনে হচ্ছে?
খুব ভালো লাগছে। সবকিছুর পরেও আপনি বিশেষ কিছু অর্জন করেছেন। একটা মৃত্যকে জয় করে এসেছেন।
মৃত্যু জয় কি না, জানি না। তবে এটা খুব বিরল অভিজ্ঞতা।
যদি এ দেশে থাকতেন, এটা তো সম্ভব হতো না।
এ রকম কিছু সুবিধা তো উন্নত বিশ্বে পাওয়াই যায়। আমার বেঁচে থাকাটা তো একটা মিরাকলই। আমি খুব খারাপ পর্যায়ের রোগী ছিলাম, যে কখনও কেমো নেয় নাই, সে বুঝতে পারবে না, এটা কত কষ্টের।
আমরা চুপ করে থাকি। বৃষ্টির শব্দ শুনি। জানালায় তাকিয়ে দুজনেই কড়ই গাছের পাতা ভিজতে দেখি। তারপর চা খাই।
বিষণ্ন কণ্ঠে সে বলে, জানেন, লেখিকা আপা, আমি আল্লার কাছে খুব বাঁচতে চাইছিলাম। পাঁচ বছর খুব পাওয়ারফুল ওষুধ খেতে হবে। এসব ওষুধ মানুষকে একদম নিঃশেষ করে দেয়।
আপনি পুরো ভালো হয়ে যাবেন।
ডাক্তার তা-ই আশা করেন। তবে আমার কী মনে হয় জানেন, ক্যান্সারের বীজ তো একেবারে ভালো হবার নয়। আমার মেয়েটার জন্য চিন্তা করি। চোদ্দ বছর বয়স। সময়টা খুব বিপদজ্জনক।
এসব কথার মাঝে আমরা আসল কথাটায় আসতে চাই। বিশেষ করে তার বন্ধু তাড়া দেয়, লেখিকা আপাকে বলো তোমার কথাটা।
সে আবার হাসে, লেখিকা আপাকে আর কী বলব? আপা তো সবই জানেন।
তাদের এই বিষয়টাও আমি জানি। তার জীবনে একই সময়ে দুই পুরুষ। তার এই বন্ধু রাহাত, যে প্রেমিক হতে পারত। আর আরজু, যাকে সে বিয়ে করেছে। তার অসফল, অসুখী দাম্পত্য, প্রবাসে সনাতন বাঙালি বধূর জীবন, স্বামীর অত্যাধিক পান, নারী-আসক্তি, অবিশ্বস্ততা, দ্বিতীয় বিয়ে, সংগ্রাম, তিন সন্তান, ক্যান্সার, মৃত্যুর দিকে হেঁটে চলা, রোগযন্ত্রণা, প্রেম-আকুলতা, রাতে টেলিফোনে পুরোনো বন্ধুর কাছে মানসিক আশ্রয় খোঁজা, মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে আসা। তার কথায় আমি মাথা নাড়ি এবং সৌজন্যের হাসি ঠোঁটে ঝোলাই।
সে তার বালকের মতো মাথাটা ডানে-বামে একবার দোলায়, চঞ্চল চোখে তাকায়, আনন্দ এবং লজ্জামিশ্রিত হাসিতে মুখ উজ্জ্বল করে বলে, অবশ্য
উনি আপনাকে কতটুকু বলেছেন, কী বলেছেন...
এখানে কিছু গোপন বিষয় ও স্বপ্ন রয়েছে। অবদমিত মনের কিছু আকাঙ্ক্ষা আছে। আমি জানি, তারা মিলনের প্রতীক্ষা করে। তাদের এই প্রতীক্ষায় কষ্ট আছে, আনন্দ আছে, নিষিদ্ধ প্রণয়ের লোকলজ্জা আছে।
তার গালের লাল আভার দিকে তাকিয়ে বলি, একজন লেখককে অনেক জানতে হয়।
তার বন্ধু বলে, আপা সবই জানেন।
আমরা তিনজন খানিকটা সময় একাত্ম বোধ করি। ওদের দুজনের মিলিত সত্তায় আমার অস্তিত্বও মিশে যায়।
তারপর সে উঠে যায়, হাঁটে একটু ধীর লয়ে। তার পর ফিরে আসে খুব দ্রুত।
তার হাতে মেটে রংয়ের একটা পুরোনো ডায়েরি।
সে নতমুখে ডায়েরির মলাটে হাত বোলায়। তারপর একটু নিচুস্বরে বলে, আপনি যা জানেন, আর বাকিটা এর ভেতর আছে। এখানেই আপনি আমার সব পাবেন।
সে তার রক্ষিত সম্পদ আমার হাতে তুলে দেয়, এটা আমেরিকা থেকে আপনার জন্য নিয়ে এসেছি।
আমি তার যুবতী-জীবন, প্রেম-ভালোবাসা-দহন, যাপিত জীবনের মলাটবদ্ধ দিনলিপির এক গোপন দলিল হাতে নিয়ে বসে থাকি।
আমরা কেউই কোনো কথা বলতে পারি না। পৃথিবীর সবার অগোচরের এক ভিন্ন জগত্, দুটো ব্যর্থ হূদয়, তীব্র চাপা বেদনা, হাহকারের ধ্বনির ভেতর নিজেকে আবিষ্কার করি। এটা পরিণত হয় আমাদের তিনজনের নীল বেদনায়।
ঘটনার আকস্মিকতা ও নাটকীয়তা সামান্য কাটিয়ে আমি ধীরে ধীরে বলি, আমি কী পারব! আমি খুব ছোট লেখক!
না, না আপনি পারবেন। রাহাত ভাই আমাকে বলেছেন।
এই প্রথমবারের মতো সে তার বন্ধুর নাম উচ্চারণ করে।
তিনি যে আপনাকে বাড়িয়ে বলেনি, তা কী করে বুঝলেন?
আমি আপনার ‘জলরঙে আঁকা’ পড়েছি।
ঠিক আছে, কিন্তু আপনি তো জানেন, আমার এই একটি উপন্যাসই মাত্র বের হয়েছে।
আপনি সনুর কথা লিখেছেন, আমার কথা লিখতে পারবেন না?
আমি তার ডায়েরিটার মলাটে চোখ রাখি।
ডাক্তার আশাবাদী। হয়তো আরও কিছু বছর বেঁচে যাব, তবে আর হয়তো আসতে পারব না। শেষবারের মতো আমি দেশ দেখতে এসেছি। আপনাকে এটা দেওয়াও আমার একটা বিশেষ উদ্দেশ্য।
আমি আবার তার হাতটা তুলে নিই, বিশ্বাস করুন, খুব ভয় পাচ্ছি। তার পরও কথা দিচ্ছি, আমি লিখব।
আপনি পারবেন, আপনার সে শক্তি আছে।
জানি না, কতটা লেখার শক্তি রাখি, তবে চেষ্টা করব।
তার চোখ ভিজে যায়, থ্যাংক ইউ আপা।
সে মাত্র পনের দিনের জন্য বাংলাদেশে এসেছে। তার সফরের একটা বিশেষ উদ্দেশ্য আমাকে একটা ডায়েরি দেওয়া। যেখানে সে প্রেম-ভালোবাসা, দুটো পুরুষের কথা লিখেছে। তার ডায়েরি, অসুখী জীবনের দীর্ঘশ্বাস, ক্যান্সার, সংগ্রাম, অতৃপ্তি—একটা উপন্যাসে দেখতে চায়। শেষবারের মতো সে এ দেশ দেখতে এসেছে। আমাকে জীবন নিয়ে একটা উপন্যাস লেখার কথা বলতে এসেছে।
তার বন্ধু রুম থেকে চলে যায়। সে কি আবেগ সামলাতে উঠে যায় কি না, জানি না। আমি হাতটা ধরেই রাখি। আমার এ হাতটা কিছুতেই ছাড়তে ইচ্ছা করে না।
আপনি কি আরও কিছু বেশি দিন থেকে যেতে পারেন না?
আমার শরীর তা পারমিট করে না। এ সময় জার্নি করাটাই ঠিক নয়। আমার ডাক্তার তা চাননি। আমি কিছুটা ঝুঁকি নিয়েই এসেছি।
আপনাকে আরও কত দিন ওষুধ খেতে হবে?
টানা পাঁচ বছর, এবং হয়তো আজীবন। আর জীবন কী! জীবন এখন এক অদ্ভুত বিষয়।
সবার জন্যই তাই।
হয়তো বা। আমি তো জীবন-মৃত্যু দুটোই দেখেছি, সত্যি বলতে জীবন আমার কাছে এখন কোনো তাত্পর্য বহন করে না, আবার করেও। আমি আজীবন বঞ্চিত হয়েছি। কিছুই পাইনি। মনে হয় সবই ভুল করেছি।
জীবনের কোনো এক পর্যায়ে সবারই মনে হয়, সে যা করেছে, ভুল করেছে। হয়তো অন্যভাবে জীবন সাজানো যেত। আর দেখুন, আমরা যা-ই বলি, ভবিষ্যতের ওপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আমরা জানি না, কীভাবে শুরু করলে ঠিক হতো।
আপনি লেখিকা, ভালো বোঝেন। হয়তো ঠিক বলেছেন। কিন্তু জীবনটা অন্য রকম হতে পারত।
তা হয়তো পারত। আপনার কি মনে হয়, রাহাতকে বিয়ে করলে সুখী হতেন?
সে কিছুক্ষণ নীরবে বাইরের বর্ষণ দেখে।
তা জানি না। আমি আরজুকেই ভালোবেসেছিলাম।
আমি যতটুকু বুঝি, যেভাবে তিনি আপনার গল্প বলেন, তাতে মনে হয় উনি আপনার প্রতি অনেক নিবেদিত।
সেটা হয়তো ঠিকই বলেছেন। আপনি কি আমাদের প্রথম পরিচয়, কোর্য়াটার-জীবন, কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে গল্প করা—এগুলো শুনেছেন?
আাামি মৃদু মাথা নেড়ে বোঝাই, ওসব আমার জানা।
সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, আমি প্রেমিক নির্বাচনে ভুল করেছিলাম।
এটা নিয়ে দুঃখ করার কিছু নেই। অধিকাংশ মানুষই ভুল মানুষকে নিবার্চন করে অথবা একসময় তাদের মনে হয়, জীবনে তাদের প্রকৃত মানুষটির দেখাই পায়নি।
সে একটু উদাস হয়ে বলে, আসলে ভুলও না। আমার কাছে প্রেম মানেই ছিল আরজু।
সে কিছুক্ষণ নীরব থাকে, আমি ধার্মিক। পাপ-পুণ্য মানি। পুরুষের প্রতি আমার খুব মোহ নেই। রাহাতকে আমি কখনও স্পর্শ করিনি। কখনও তীব্র আকুলতাও অনুভব করিনি। কিন্তু যদি এখনের কথা বলেন। আমি প্রেম-প্রত্যাশী। যদি সুস্থ হই, যদি ওকে আমেরিকায় নিতে পারি—আমরা বিয়ে করব। না, আমার চোদ্দ বছরের মেয়ের কথাও আমাকে বিরত রাখতে পারবে না।
তার হাতটা আমার কোলের ওপর পড়ে থাকে। সফেদ নরম মাখনের মতো হাত। তার বন্ধু রুমে ফেরত এলে বিদায়ের প্রস্তুতি নিই।
সেই টানা লম্বা বারান্দায় এসে দাঁড়াই। বৃষ্টি থেমে গেছে। প্রবল বর্ষণশেষের চমত্কার এক শান্ত-শীতল সন্ধ্যা। ঘন নীল আকাশ। খুব সকালের মতো কোমল আলো। ভেজা বাতাসে সিক্ত কাঁঠালচাঁপা আর মাধবীর গন্ধ। নারকেল শাখা থেকে বাতাসে টুপচুপ ঝরে পড়ছে জল।
লেখিকা আপা, আপনি কিন্তু অবশ্যই আমার জীবনটা নিয়ে একটা উপন্যাস লিখবেন।
ইনশাল্ল¬¬াহ।
আপনি তো সব জানেন। আর ওই ডায়েরিটা। আরও যদি কিছু জানতে চান। রাহাত ভাই তো আছেই। উনিই আমার কার্বন কপি।
আমি একটু হাসি। তার বন্ধুর সাথে দৃষ্টিবিনিময় করি। তার চোখে-মুখে উজ্জ্বল আভা। সে কি এই মেয়েটার কার্বন কপি? কেউ কি কারও কার্বন কপি হয়?
ভেজা উঠোনে পা রাখি। ফিরে তাকাই। দোতলার গ্রিল ধরে উজ্জ্বল ঝাড়বাতির মতো সে দাঁড়িয়ে থাকে।
সে হাত নাড়ে, বাই।
আমি হাত নাড়ি।
সেটা ছিল দুই হাজার পাঁচ। এখন দুইহাজার বারো। মাঝে সাত বছর। এই সাত বছরে আমার বইয়ের সংখ্যা এখন সাত। তার জীবন নিয়ে কোনো উপন্যাস লেখা হয়নি। তার সাথে এই সাত বছরে আরও দুবার টেলিফোনে কথা হয়েছে, সে আমাকে একটা দীর্ঘ চিঠি দিয়েছে। তার দিনযাপন, কষ্ট, আনন্দ, রোগযন্ত্রণা—এসব কথা লিখে জানতে চেয়েছে, তার উপন্যাসটা কত দূর। তার বন্ধু সাত বছরে বহুবার আমার সাথে দেখা করেছে, তার বিভিন্ন খবর জানিয়েছে। তার চোদ্দ বছরের মেয়েটার এখন একুশ।
আজ এই সকালে তার মৃত্যুর খবর পেলাম। ক্যান্সার কতটা তাকে শুষে নিয়েছিল, সে ছবি আমি দাঁড় করাতে পারি না। ভেজা কাঁঠালচাঁপা আর মাধবীর গন্ধ পাই। উজ্জ্বল ঝাড়বাতির মতো তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। তার মৃদু হাস্যময় দীপ্ত চোখের তারা দেখি। শুনি—লেখিকা আপা, আমার জীবন নিয়ে একটা উপন্যাস লিখবেন, প্লিজ! আয়নায় স্থির তাকিয়ে থাকি আমার একচল্লিশের অবয়বে। তার সাথে যখন দেখা হয়েছিল, সেও ছিল চল্লিশ-উত্তীর্ণ। তার চোখে-মুখে মৃত্যুর ছায়া ছিল না, জীবন গুঞ্জরিত ছিল প্রকাশিতভাবে।
তার মৃত্যু হলো এই সকালে, ফ্লোরিডায় নিশ্চয়ই এখন রাত। ফ্লোরিডার আকাশ এখন কেমন, কোনো তারা আছে কি? বাতাস কেমন? মাথাটা শূন্য, বোধহীন লাগে। এলোমেলো কিছু বিক্ষিপ্ত, বিচ্ছিন্ন ভাবনা আমাকে গ্রাস করে। শরত্, মাধবীলতা, সকাল, অফিস, জরুরি মিটিং, ফ্লোরিডার আকাশ, মৃত্যু, ক্যান্সার, ঝাড়বাতির মতো উজ্জ্বল এক মেয়ে, একটা উপন্যাস লিখবেন, প্লি¬¬জ, বাদামি চোখে আলোর ঝিলিক। একটা মেয়ে হাত নাড়ে—বাই।
হ্যাঁ, আমি এসব ভাবতে পারি। তার মৃত্যুর ভার নিয়ে আর কী করতে পারি, সকাল আমার জন্য খুব ব্যস্ত সময়। অফিসের গাড়ি নেই। ড্রাইভারের ছুটি আজ। আমাকে ব্যস্ত একটা দিনে প্রবেশ করতে হবে। সাত বছর আগে এক সন্ধ্যায় সে বলেছিল, লেখিকা আপা, আমার জীবন নিয়ে একটা উপন্যাস লিখবেন। এমন কে না বলে। সবাই চায়, তার জীবন নিয়ে একটা উপন্যাস হোক। এটা সত্য সে ভালোবেসেছে, প্রতারিত হয়েছে। অবিরাম জীবনের দিকে ফিরে আসতে চেয়েছে, কাঙ্ক্ষিত পুরুষের সাথে মিলনের প্রতীক্ষা করেছে। তার একটা যুদ্ধ ছিল জীবনের জন্য। একটা অতৃপ্ত, বঞ্চিত জীবন আজ সকালে সে ফ্লোরিডার বাতাসে মিলিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এগুলো এমন কী অভিনব! জীবনের কী এমন গূঢ় রহস্য। সাত বছরে তার উপন্যাস লিখতে পারিনি। তার জন্য আমার কোনো অনুতাপ নেই। একজন লেখক ইচ্ছে করলেই সব লিখতে পারেন না।
এসব বিক্ষিপ্ত, বিছিন্ন ভাবনায় আমি নিজেকে কীভাবে ব্যস্ত রাখতে পারি! আমাকে দ্রুত একটা রিকশা খুঁজে নিতে হবে। মৃত্যু কি কোনো সকাল থমকে দেয়? অথবা মৃত্যু দেখে থমকে দাঁড়ায় কোনো সকাল? রিকশা ঠিক করি। শরতের কাচের আকাশ ভেঙে ঝকঝকে রোদ উঠেছে, নরম মৃদু হাওয়া। জীবনমুখরিত বিলোল এই সকালে পিচের রাস্তায় ছুড়ে ফেলি একটা মৃত্যু। টাচ স্ক্রিনে আঙুল ছোঁয়াই। সিলেক্ট করি—ও আমার চন্দ্রমল্লি¬¬কা বুঝি চন্দ্র দেখেছে।
তারপর দুই কানের ভেতর ঢুকিয়ে দিই এয়ার ফোন।
