চিত্রপ্রদর্শনী

রেখার সংলাপ

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০১৩, ১৮:৫৬
শিল্পসৃষ্টির মাধ্যম হিসেবে ছাপচিত্র অন্য যেকোনো মাধ্যম থেকে ভিন্নতর। এটি প্রত্যক্ষ নয়। সরাসরি বায়োলজির সম্পৃক্ততা এই মাধ্যমে নেই। তবে হ্যাঁ, কোনো ছাপচিত্রী চাইলেই সেই দূরত্ব ঘুঁচে যেতে পারে। যদিও সে রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা আমাদের চোখে তেমন পড়ে না। শিল্পী রশীদ আমিনের তত্ত্বাবধানে ১৫ জন নবীন শিল্পীর হয়ে যাওয়া কর্মশালার ৪৫টি শিল্পকর্ম নিয়ে দৃক গ্যালারিতে শেষ হলো ‘জয় অব প্রিন্ট’ শিরোনামের একটি দলবদ্ধ প্রদর্শনী, যাঁদের ছাপচিত্র নির্মাণে তেমন কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তারপরও বেশ শিল্পীরা তাঁদের কাজে নিজস্বতার স্বাক্ষর রেখেছেন। প্রত্যেক শিল্পীর কাজের বিষয়বস্তুর দিকে তাকালে বোঝা যায়, প্রায় প্রত্যেকেই বিষয় নির্বাচনে সমসাময়িকতার দিকে নজর দিয়েছেন। নগরবর্ধন, আবহাওয়া ও জলবায়ুগত বৈচিত্র্য, ইচ্ছার চেতনচিত্রণ, বাংলার নিসর্গ, মরমি বোধের প্রক্ষেপণ—এসব কোথাও জ্যামিতিক কোথাও রেখাভিত্তিক গড়নের মধ্যে দিয়ে ফুটে উঠেছে। কোথাও নিছক ঘনকবাদ বা জ্যামিতিক প্রকাশবাদ চোখে পড়লেও রৈখিক অভিব্যক্তির মধ্য দিয়ে সাঙ্কেতিক ইশারা আছে। মোদ্দাকথা, প্রায় সব ছবি নির্মিত হয়েছে পাশ্চাত্যের ঐতিহ্যগত ইজমভিত্তিক শিল্পান্দোলনের ভিত্তিতে। তাই এসব ছবির পাঠোদ্ধারে বেগ পেতে হয় না। অথচ তরুণ হিসেবে আরও বেশি দেশীয় নান্দনিকতার উপস্থাপন আশা করতে পারি। শীলা এশা জাবিনের কাজে (ট্র্যানজিশন) লক্ষ করা যায় নগর ও গ্রামীণ কাঠামোর আন্তঃসম্পর্ক। বিস্তৃত-অংশে চাঁদ, নৌকা, নদীর দিকে অগ্রসরমান স্থাপত্যিক চূড়াগুলো ধাবমান। মানুষ নয়, যেন চূড়ান্তভাবে আমরা দেখতে পাব নিসর্গ ও কংক্রিট-নির্মিত বাকসের সাথে সংগঠিত অযাচিত সংলাপ। ওয়াজেদুর রাহমান ইমনের (ওল্ড সিটি-১) অনেকটাই ইমেজসর্বস্ব সিটিস্কেপ। ইমারতের মধ্য দিয়ে মাত্রাহীন বিভাজিত আকাশ। নতুন কোনো ডায়ালগ সৃষ্টি করে না। পূর্বোক্ত দুই শিল্পীর থেকে নাজমুন নাহার আকন্দ রজির (আনটাইটেলড) ছাপাই ছবির কাজ অনেক বেশি রৈখিক। নান্দনিক সংহতির চেয়ে অধিকতর কাঠামোপ্রবণ। কাঠামোগত বিন্যাসের দিকে তাকালে মনে হয় বিশেষত ফিগার-বিন্যাস যা অনেক বেশি ক্যারেক্টারিস্টিক, যেমনটা (সিম্পলিসিটি) ক্যারিকেচারের মধ্যে দেখা যায়। ইকবাল বাহার চৌধুরীরর (আনটাইটেলড) ছবিটির গঠনবিন্যাস একাধিক ধাপ সৃষ্টি করেছে। ইন্টারস্ট্রাকচারাল স্টোরি আছে ছবিটিতে। ফর্মের রৈখিক উপস্থাপন, ছন্দ এবং কোথাও কোথাও রেখার ভাঙন বেশ আনন্দের। উপরিস্থিত অংশ বিশেষত, মাথার দিকের ড্রইং অনেকটাই মুরের রিক্লাইন ফিগারসুলভ। ফাহিমা আহমেদ (থার্ড আই) আমাদের প্রচলিত দৃশ্যভাবনার সমালোচনাই করেছে যেন। তৃতীয় নয়নের যে দৃশ্যপট আমাদের এখানকার ড্রইংগুলোতে দেখতে পাই, সেদিক থেকে এটি একটি পরিবর্তন। সার্কেলগুলোর মধ্যে রয়েছে ইন অ্যান্ড ইয়ানের উপস্থিতি। ব্রেকিং ডাউনের দিকে ততটা দৃষ্টি না থাকায় ছন্দোবদ্ধ জ্যামিতিক রূপ লাভ করেছে ছবিটি। কর্মশালায় পনেরো জন শিল্পীর পনেরোটি ছাপাই ছবি আছে। সাদিয়া নাসরিনের (হেয়ার আই অ্যাম) নস্টালজিক। আলোছায়ার ব্যবহার এবং রং নির্বাচনের উজ্জ্বলতা ছবিটিতে গভীরতা সৃষ্টি করেছে। সাবিনা ইয়াসমিনের (সোল আন্ডার দ্য ফেদার) রূপকধর্মী। পাখির ঠোঁট, ডানা এবং টোনের অন্ধকারময়তা বেশ রহস্য সৃষ্টি করেছে। এক টুকরো আলো চোখে পড়ে যেন সেই রহস্যময়তার ব্যাপ্তি বাড়িয়ে দিয়েছে। সার্কেল ভেঙে সার্কেলের গতিময়তার রূপ ধরা আছে সুরাইয়া পারভিন ববি (সার্কেল) এবং কামরুন নাহার কেয়ার (আনটাইটেলড) ছবিতে। সামুদ্রিক ঢেউয়ের আবহ পাওয়া যায় সেখানে। এস এম ইহসানের কাজের বিষয়বস্তু নৌকা। কম্পোজিশনের দিক থেকে ছবিটির গুরুত্ব রয়েছে। নৌকার পাটাতনে লাইট ও গলুইয়ের ভেতরকার অন্ধকারের (যদিও চিত্রকরেরা অন্ধকারের চেয়ে ছায়া বলতেই বেশি পছন্দ করেন) সাথে পালের একপাশের আলো-ছায়া ছবিটির ভারসাম্য সৃষ্টিতে সহায়তা করেছে। লগিগুলো কাজ করেছে বর্ণিকাভঙ্গের। সাইদা ফারাহ আনোয়ার (আনটাইটেলড) এবং আনজুমানারা নিতুর (আনটাইটেলড) ছবিতে অগ্রজ শিল্পীদের প্রভাব রয়েছে। বিশেষত সফিউদ্দিনের রেখার বোল্ডনেস দেখা যাচ্ছে নিতুর কাজে। সীমা ফারহানা (ফ্রিডম) এবং মোহাম্মদ পারভেজের (আনটাইটেলড) ছবির বিষয়বস্তু ঘুড়ি। পারভেজের ঘুড়ি যতটা স্বাধীন, সীমার ঘুড়ি ততটাই ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ। ঘুড়ির ভেতরকার ফর্ম আলোকময়তা সৃষ্টির জন্য নয়—এটা স্পষ্ট। রেখার অগোছালোভাব—যেটা সুতার প্রতীকে এসেছে—কিছুটা গল্প সৃষ্টি করলেও সলিড ফর্ম ছবির অন্যত্র দৃষ্টিকে ঘুরিয়ে আনতে দেয় না। ধরে রাখে একটি স্থির ক্ষেত্রে। শারমিন ইতির ফিগার কম্পোজিশনে নতুনত্ব আছে। ফর্ম ও রেখার ক্রসিং বেশ কিছুটা টেনশন সৃষ্টি করেছে। রাজ্জাকুল ইসলামের ‘উইনটার’ ক্যারেক্টারিস্টিক বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেছে। কর্মশালার সুপারভাইজার রাশিদুল আমিনের ‘ইমেজ ফ্রম নেচার’ কাঠামোগত বিমূর্তায়ন। একটু খুঁটিয়ে দেখলে গল্পটাকে ধরা যায় বেশ। প্রদর্শীত সব ছবিই ড্রাইপয়েন্ট মাধ্যমের। ৪ জানুয়ারি শুরু হওয়া এ প্রদর্শনী শেষ হয়েছে ৮ জানুয়ারি ২০১৩ তারিখে।