রনবীর বিশ্ব দর্শন ও রম্যকথন
রফিকুন নবী
প্রকাশক :বেঙ্গল পাবলিকেশনস লিমিটেড, ঢাকা
প্রচ্ছদ :রফিকুন নবী
প্রকাশ :২০১২
মূল্য :৪০০ টাকা
স্মৃতি বড় মধুর, বড় কষ্টের। ভ্রমণের কথা উঠলেই তা হয়ে ওঠে আনন্দের। ‘রনবীর বিশ্ব দর্শন ও রম্যকথন’ হয়ে উঠেছে এক অর্থে মজার আবার অন্যদিকে স্মৃতির বাগানে পরিভ্রমণের কল্পজগত। রফিকুন নবী বাংলাদেশের সমকালীন চিত্রের ভুবনে শীর্ষশিল্পীদের অন্যতম। বাস্তববাদী চেতনায় তাঁর শিল্পিত মানস ঋদ্ধ হলেও রফিকুন নবীর সৃষ্টিতে নিরীক্ষার ছাপও স্পষ্ট। জলরঙে যে কজন হাতেগোনা শিল্পী চারিত্রিক বিশিষ্টতা অর্জন করেছেন, তিনি তাঁদের একজন। বইয়ের প্রথমে রয়েছে ভূমিকা। ভ্রমণকাহিনি লেখা নিয়ে লেখক নিজেই বলেছেন, ‘তো দেশে-দেশে ঘোরাঘুরি কম হলো না। কিন্তু সেসব নিয়ে লেখার কোনো দিন ইচ্ছে হয়নি। এমনকি অনেকের যে ডায়েরি লেখার সু-অভ্যাস আছে আমার তাতেও আলসেমি। গুছিয়ে-গাছিয়ে বসা হয় না। সাধ্যও নেই। আসলে “লেখার-হাত” বলে যে-কথাটি রয়েছে তা আমার ধাতে নেই। এমনকি কলেজপড়ুয়া সময়টিতে যে-প্রেমপত্র লেখালেখি দিয়ে সবার হাত পাকে, সেদিকটাও তখন তেমন হয়ে ওঠেনি। এ-ব্যাপারে অতএব নিজেকে “বেচারা” ভাবা ছাড়া উপায় নেই। সূচিপত্র ওলটালেই চোখে পড়বে ‘কলকাতা আর উড়িষ্যার তিনজন’ শিরোনামের ভ্রমণকাহিনি। ভারতভ্রমণ নাকি লেখকের ‘পয়া’ ভ্রমণ। কারণ বিদেশ যাত্রার গিঁটটা আলগা হয়েছে ওখানে গিয়ে। ফলে কলকাতা গিয়ে লোভটার পেটে আরও দানাপানি পড়ল। সেই সঙ্গে লেখককে উড়িষ্যার বিখ্যাত স্থানগুলো দেখার সৌভাগ্য এনে দিল। কলকাতার শিল্পীবন্ধুদের পরামর্শে কোনরক মন্দির দেখা হয়ে গেল শিল্পী রফিকুন নবীর। তখনকার ভারতযাত্রা কিন্তু পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়া। কারণ তখনও পাসপোর্ট-ভিসা চালু হয়নি। শুধু কাগজে লিখিত ‘পারমিট’ ব্যবস্থা দিয়ে ভারতভ্রমণ হলো। এরপর পুরীতে গিয়ে জগন্নাথের মন্দির দেখা, সমুদ্রস্নানে আগ্রহী নুলিয়ালদের রিচুয়াল। অনেক ছবি তুলেছেন সফরসঙ্গী শিল্পী হাশেম খান। সবচেয়ে মজার ব্যাপার লক্ষ করা যায় কলকাতায়। ওখানে পশ্চিমবঙ্গের বরণ্যে শিল্পী এবং সরকারি আর্ট কলেজের একসময়ের নামী শিক্ষক গোপাল ঘোষ মহোদয়। আরও ছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন এবং দুই বরণ্যে শিল্পী আনোয়ারুল হক ও সফিউদ্দিনের ছাত্র অনিল বাবু। এভাবে শুরু করে দেশ-বিদেশ কম ঘোরা হয়নি লেখকের। আর এতে প্রায় উনিশটি ভ্রমণকাহিনি সন্নিবেশিত হয়েছে এই বইয়ে। আসলে ভ্রমণকাহিনি হিসেবে বইটি কেমন! তা নিশ্চয়ই না পড়লে বোঝা যাবে না, যে এতে উঠে এসেছে বিভিন্ন সময়ের ভ্রমণের ঘটনা। এর সাথে উঠে আসে বিশ্ববরেণ্য শিল্পীদের সাথে মিলনমেলার কথা। বইয়ে উল্লিখিত লেখাগুলো পুরোপুরি ভ্রমণকাহিনি না হলেও ভ্রমণ-সংক্রান্ত স্মৃতিচারণামূলক লেখা বলা যেতে পারে। এতে লেখকের শিল্পকলা তথা চিত্রকলা-সম্পর্কিত অভিজ্ঞতাগুলো স্থান পেয়েছে—এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়। কাজের বিনিময়ে ভ্রমণটা বেশ কাজে দিয়েছে রফিকুন নবীর। অভিজ্ঞতার ঝুলিতে জমানো এই ভ্রমণকাহিনিগুলো হয় প্রদর্শনী, নয়তো কর্মশালা, অথবা সভা-সেমিনারের অজুহাতে সংযুক্ত হয়েছে। তাঁর শিল্পজীবন তৈরিরও একটা বিশেষ পর্ব বলা যায় একে। আবার শিল্পকলার জগতে পরিভ্রমণের এক অনবদ্য দলিলও বলা যেতে পারে বইটিকে। যেন এ দেখার শেষ নেই। প্রতিটি লেখায় ভ্রমণ-অভিজ্ঞতার পাশাপাশি শিল্পসম্পর্কিত ভাবনা ও মতবিনিময় যেমন পরিলক্ষিত হয়, তেমনি জীবনসংক্রান্ত বাস্তবতা উঠে এসেছে। ক্যানভাসের সামনে রং-তুলি নিয়ে কর্মরত সৃজনশীল অন্যজগতের মানুষটি যে জাগতিক ভাবনায় সাধারণের কাতারবন্দী, সেই বৈপরীত্যের ব্যাপারগুলো চোখে পড়েছে। চোখে না পড়ারও কোনো কারণ নেই এই ভেবে যে, অলিভের দেশ এলাস হয়ে ইতালি, গ্রিস কিংবা মুরালচিত্রের দেশের অভিজ্ঞতা লেখনীর মাধ্যমে নতুন ভাষা খুঁজে পেয়েছে, নতুন পথ খুঁজে পেয়েছে। এ পথ শুধু বেইজিং, নিউইয়র্ক, যুগোস্লাভিয়া নয়, হেনরি মুরের দেশ হয়ে ভুটানে গিয়ে থেমেছে। নানা স্বপ্ন, আশা-অভিজ্ঞতা, বিড়ম্বনা আর বিস্ময়ের এক অনবদ্য ভ্রমণকাহিনি এই বই। প্রতিটি লেখার সাথে কাইয়ুম চৌধুরীর আঁকা বিভিন্ন ছবিও দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ফেরিতে বসে দূরের ভেনিস, যুগোস্লাভিয়ায় আলুথালু মহিলার আঁকা ছবি সন্নিবেশিত হয়েছে। এর মধ্যে মজার মজার রম্যকথন প্রত্যেকটি বিষয়কে আরও উপভোগ্য করে তুলেছে নিঃসন্দেহে।
