সার্ক দেশসমূহের সিনেমা আমদানির ক্ষেত্রে চার দশকের প্রচলিত বিধিনিষেধ শিথিল করেছে সরকার। নতুন এই নীতির নাম- ‘রপ্তানির বিনিময়ে আমদানি।’ রপ্তানির বিপরীতে সেই দেশ থেকে সমসংখ্যক সিনেমা আমদানি করা যাবে। সার্কের সদস্য দেশ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নেপাল, মালদ্বীপ, ভুটান এবং আফগানিস্তানে বাংলাদেশ থেকে একটি সিনেমা পাঠালে সে দেশ থেকে একটি চলচ্চিত্র আনা যাবে।
তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ‘ইত্তেফাক’কে এই তথ্য দিয়ে জানিয়েছেন, নতুন এই আইন গেজেট আকারে বের হয়েছে। অতীতে ভারতীয় বা উপমহাদেশের কোন ছবি আমদানির সুযোগ সহজ ছিল না। একমাত্র বিদেশি ইংরেজি ভাষার সিনেমাই আমদানি করা যেত। অত:পর ২০১০ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আমদানি নীতিমালায় কিছুটা পরিবর্তন করা হয়। বলা হয়, ইংরেজি সাবটাইটেল করে বিদেশি ভাষার ছবি দেশে আমদানি করা যাবে। এতে প্রদর্শকরা খানিকটা খুশি হলেও এ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাতারা ঘোর বিরোধিতা করেন। এখন যে আইন করা হয়েছে তাতে বিনিময় প্রথার কথাই বলা হয়েছে। সরকার বলছে, এর ফলে মৃতপ্রায় বাংলাদেশি চলচ্চিত্র আঞ্চলিক বড় বাজারে ঢুকতে পারবে। ফলে আবার পুনর্জীবন পাবে।
চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডকে নাম বদলে ফিল্ম সার্টিফিকেশন বোর্ড করা হচ্ছে। গত ১০ অক্টোবর এক অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, চলচ্চিত্র মুক্তি দেয়ার প্রক্রিয়া সহজ করতে সেন্সর বোর্ডকে বদলে ফিল্ম সার্টিফিকেশন বোর্ড গঠন করা হবে।
গতকাল এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, সেন্সর বোর্ড বলে কিছু থাকছে না। এর কাজ অনেকখানি এগিয়ে গেছে। এখন চলচ্চিত্রের গ্রেডিং সিস্টেম করতে যাচ্ছি। কাজ শেষ পর্যায়ে, এখন যে কোন দিন আমরা ঘোষণা দেব।
এসব নিয়ে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বললেন, সবকিছু করা হচ্ছে চলচ্চিত্রকে নতুন করে জীবিত করার জন্য। সরকার চলচ্চিত্রকে শিল্প ঘোষণা করেছে। চলচ্চিত্রের এখন করুণ দশা। একটার পর একটা সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। একসময় এফডিসিতে বছরে দেড়শ’র মত চলচ্চিত্র নির্মিত হতো। এখন মাত্র ৪০-৪৫টি ছবি নিমির্ত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আমরা চলচ্চিত্রকে নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে চাই। পুনরুজ্জীবিত করতে চাই। আমরা তেমন পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছি। তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, বিহার, উরিষ্যাসহ ভারত এবং সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৩০ কোটির বেশি বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মাঝে রয়েছে বাংলা সিনেমার বিশাল বাজার। কলকাতা সফরকালে ওখানকার চলচ্চিত্র নির্মাতারা প্রস্তাব দিয়েছিলেন, আমাদের বাংলাদেশের চলচ্চিত্র তারা ভারতে প্রদর্শন করতে চান । বিনিময়ে ওদের চলচ্চিত্র বাংলাদেশে প্রদর্শন করবেন। আমি তাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম ঢাকায়। তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে, বাংলা চলচ্চিত্রের বাজারটাকে কীভাবে ব্যবহার করা যায় এবং দুই দেশের চলচ্চিত্র উন্নয়নে এ বাজার একটি ভূমিকা রাখতে পারে। অচিরেই তারা বাংলাদেশ থেকে একাধিক সিনেমা নিয়ে সেখানে প্রদর্শন করে পরিস্থিতি দেখবে। ওরা বাংলাদেশের প্রতি জেলায় সরাসরি বা যৌথ বিনিয়োগে সিনেমা হল নির্মাণ এবং সংস্কার করতে আগ্রহী। আমরা শিগগিরই একটি ডেলিগেশন পাঠাবো কলকাতায়। ইনু বলেন, আগামী বাংলা নববর্ষের আগেই বাংলাদেশের ছবি ভারতে প্রদর্শিত হবে আর ভারতের বাংলা ছবিও এই দেশের হলে চলবে। আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি আমি কলকাতা যাবো। নববর্ষকে কেন্দ্র করে এক সপ্তাহজুড়ে আমরা উত্সবের পরিকল্পনা করছি।
হাসানুল হক ইনু জানান, চলচ্চিত্র আমদানি নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন সার্কের সাতটি দেশের চলচ্চিত্র আমদানির ক্ষেত্রে নতুন নীতিমালা হয়েছে। গতকাল তার গেজেট বের হয়েছে। যত বাংলাদেশি ছবি রফতানি করতে পারবে তার বিপরীতে সার্কভুক্ত দেশের সমসংখ্যক ছবি আমদানি করা যাবে। তিনি বলেন :আমি নিশ্চয়তা দিতে পারি যে, ভারত থেকে বাংলা ভাষার ছবি ছাড়া অন্য ভাষার ছবি কেউ আনবেন না। আমদানিকারকদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। যাতে কেউ হিন্দি ছবি আমদানি করতে না পারে সেজন্য শর্ত দিয়ে ব্লক তৈরি করার পরিকল্পনা চলছে।
এই প্রসঙ্গে তথ্যসচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন বলেন, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র এমন শক্তিশালী নয় যে, ভারতে গিয়ে টিকবে। ছবি ভারতে গেলেই তো হলো না । সেখানে ‘সেল’ করতে হবে। এটা কি দুরূহ নয়?
গত বছর ঈদের পর ‘জোর’, ‘সংগ্রাম’ ও ‘বদলা’ সহ কয়েকটি ভারতীয় বাংলা ছবি বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেয়া হয়। এর আগে গত ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ সরকার ভারতীয় ছবি আমদানি ও প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনের অনুমতি প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আমদানি নীতিমালায় এ বিষয়ক বিধিনিষেধ তুলে নেয়। কিন্তু দেশীয় চলচ্চিত্রের পরিচালক-প্রযোজক ও শিল্পী-কলাকুশলীদের আন্দোলনের মুখে সরকার ভারতীয় ছবি আমদানির ওপর পুনরায় বিধিনিষেধ আরোপ করে। সরকারের এই নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে আমদানিকারক ও প্রদর্শকরা উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেন। আদালতের নির্দেশে উল্লেখিত সময় যেসব ছবি আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়েছিল সেসব ছবিকে চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড ও তথ্য মন্ত্রণালয় অনাপত্তিপত্র দেয়। এই অনাপত্তিপত্রের পরিপ্রেক্ষিতে পরে ‘জোর’, ‘সংগ্রাম’ ও ‘বদলা’সহ নয়টি ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানি করা হয়। সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র নিয়ে ছবিগুলো বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শন করা হলেও ব্যবসায়িকভাবে আলোচনায় আসতে পারেনি।
