ক্লাসের ফাঁকে মেলার কাজে

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০১৩, ১৯:১৮
নতুন বন্ধু। নতুন জায়গা। নতুন পরিবেশ। দারুণ মজায় সময় পার। কাজ করতে গিয়েই চেনা জানা। তারা সবাই নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। কয়েক দিন আগেও কেউ কাউকে চিনতেন না। অথচ তারাই এখন পরম বন্ধু! ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় কাজ করতে গিয়েই বন্ধুত্ব। পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তবে কাজ করার অভিজ্ঞতা। ভিন্ন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেয়া। নতুন বন্ধু পাওয়া- এগুলো বড় প্রাপ্তি বলে মনে করছেন তারা। সঙ্গে বাড়তি উপার্জন তো আছেই। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, পুরো মেলায় মোট বিক্রয়কর্মীর বড় অংশই তরুণ। তাদের বেশিরভাগই শিক্ষার্থী। পড়ছেন নানা সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়াশোনার ফাঁকে নতুন অভিজ্ঞতা। পাশাপাশি মাসখানেকের জন্য ভালো হাতখরচ জোগাতে তাদের অন্যতম পছন্দের জায়গা এ মেলা। পড়ালেখার পাশাপাশি খণ্ডকালীন এই চাকরি করতে এসে প্রতিদিন নানা ধরনের মানুষের সামনে একজন কর্মীকে পণ্যের গুণাগুণ উপস্থাপন করতে হচ্ছে। মাঝেমধ্যে পড়তে হচ্ছে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে। অল্প বয়সেই দক্ষ বিক্রয়কর্মীর মতো সেগুলো হাসিমুখে সামলে নিচ্ছেন তারা। ঢাকা কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান তৃতীয় বর্ষের ছাত্র সাকিল জামান বলেন, ‘এখানে কাজ করতে এসে খারাপ অভিজ্ঞতার চেয়ে আনন্দই বেশি হচ্ছে। অনেক আগে থেকেই বাণিজ্য মেলার প্রতি আমার আগ্রহ ছিল। সবচেয়ে মজা লাগে যখন পুরনো কোনো বন্ধুর সঙ্গে অনেক দিন পর মেলার সুবাদে দেখা হয়ে যায়।’ সাকিলের সহকর্মী আবিদা সুলতানা পড়ছেন ইডেন মহিলা কলেজে বিকম তৃতীয় বর্ষে। তিনি বললেন, ‘টানা এক মাসের চাকরির সুবাদে একসময় সহকর্মীরা সবাই ভাই-বোনের মতো আপন হয়ে যায়। তবে আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রি করতে পারে কে এটা নিয়ে মজার প্রতিযোগিতাও চলে।’ লিভার ব্রাদার্স বাংলাদেশ লিমিটেডের স্টলে অফিসিয়ালদের পাশাপাশি রয়েছেন বিক্রয়কর্মীও। এই স্টলের লিজা সুলতানা বাণিজ্য মেলায় তিন বছর ধরে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করছেন। কাজ করতে করতে নিজের অভিজ্ঞতায় তিনি আগে থেকেই বলে দিতে পারেন কে আসলে ক্রেতা আর কে সে ফ মজা করতে এসেছেন। তিতুমীর কলেজের প্রাণিবিজ্ঞান প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সায়মা আক্তার জানালেন, ‘এখানে অনেক রকম মানুষের সঙ্গে মেশার কারণে বিচিত্র অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। সারাক্ষণ মজা করতে করতে কাজ করি আমরা। এ ওর পেছনে লাগি। এখানে কাজের ফলে হাত খরচও উঠে আসে।’ একই স্টলের আরেক বিক্রয়কর্মী রাইসা তাবাসসুম পড়ছেন তেজগাঁও কলেজে। হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। তিনি জানালেন, ‘স্থায়ীভাবে কোথাও কাজ করলে পড়ালেখার ক্ষতি হবে। তাই এক মাসের জন্য কাজটি নিয়েছি। উপভোগও করছি বেশ।’ একাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তাদের বেশির ভাগই এখানে এসেছেন বন্ধু অথবা আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে খবর পেয়ে। তবে সিভি জমা দিয়ে প্রায় সবাইকেই মুখোমুখি হতে হয়েছে মৌখিক পরীক্ষার। লিখিত পরীক্ষাও দিতে হয়েছে অনেককে। কেউ কেউ আবার আগে মেলায় কাজের সুবাদে চাকরি পেয়েছেন সহজেই। ‘মার্কেটিংয়ে কাজ করার সামর্থ্য যে আমার রয়েছে, এটা এখানে এসেই আবিষ্কার করেছি।’ বললেন ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ পঞ্চম সেমিস্টারের ছাত্র সাদ আন্দালিব। তিনি কাজ করছেন বেস্টওয়ে গ্রুপের স্টলে। নাইরুজ সিফা পড়ছেন ঢাকা সিটি কলেজে বিবিএ প্রথম সেমিস্টারে। কাজ করছেন বাংলালায়ন ওয়াইম্যাক্স স্টলে। ক্লাস থাকলে স্টলে যোগ দেন ১২টায়। তবে বিশেষ দিনগুলোয় পুরো সময়ই থাকেন এখানে। দলটির আরেক সদস্য সালাউদ্দিন পড়ছেন ঢাকা কলেজে হিসাব বিজ্ঞান প্রথম বর্ষে। তিনি এখানে এসেছেন অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য। ‘সাইকেল লাইফ’ নামের এই প্যাভিলিয়নে জান্নাতুল কাজ করছেন শখের বসেই। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী তিনি। বিক্রয় না করে শুধু প্রদর্শনীর জন্য সাইকেল রাখায় বিভিন্ন বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে তাকে। বাচ্চারা প্রায়ই এসে কান্নাকাটি জুড়ে দেয় সাইকেল কেনার জন্য। এ ছাড়া কেন বিক্রি হবে না এ নিয়েও অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন তাদের সঙ্গে। তবুও একই প্রতিষ্ঠানে প্রস্তাব পেলে আগামী বছর কাজ করবেন কি না জানতে চাইলে জান্নাতুল জবাব দিলেন, ‘কেন করব না? কাজ করাতেই তো আমাদের আনন্দ।’ ছবি: সামসুল হায়দার বাদশা