ক্যাম্পাসের বাঁশিওয়ালা!

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০১৩, ১৯:২৫
সবুজ ছায়ায় ঢাকা আর পাখির গুঞ্জনের মায়ার টানে গণেষ একদিন চলে আসেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। সকল শিক্ষার্থীর কাছে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই প্রিয় মানুষে পরিণত হন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার কথা মনে আছে? এমনি এক বাঁশিওয়ালা আছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ৩০ বছর ধরে বাঁশির জাদু দিয়ে সকলকে মাতিয়ে রাখছেন তিনি। তুলেছেন একজন। তার বাঁশির টানে অনেকেই ছুটে এসেছেন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে। নাম তাঁর গণেষ। জীবিকার টানে একটানা ক্যাম্পাসের এক চত্বর থেকে অন্য চত্বরে চষে বেড়ান। সকাল হলেই এখন তাকে দেখা যায় এ ক্যাম্পাসের আঙ্গীনায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবন থেকে শুরু করে প্রতিটি ভবনের চারপাশে এখন সকাল-সন্ধ্যায় দেখা মেলে তার সাথে। সঙ্গে থাকে সুর পিয়াসীদের ভিড়। ১২ বছর বয়সে বাবার সাথে পুঠিয়া উপজেলার দাসমারিয়া গ্রামের শশাধরের বাড়ীতে কাজে যোগ দেন তিনি। বাড়ীর নানান কাজ করতে হতো বাবাকে। ছেলে সারা দিন গরু নিয়ে মাঠে। কাঁধে গামছা আর হাতে একটা বাঁশের বাঁশি নিয়ে তার কেটে যেত সারা দিন। বিশালাকার মাঠে গরু ছেড়ে দিয়ে মনের ইচ্ছামতো বাঁশি বাজাতেন। তখনও বাঁশিতে ঠিক সূর উঠতো না তার। তবুও বাঁশির ভালোবাসায় মনের টানে বাজিয়েই যেতেন। তার বাঁশিতে সুরের জাদু আসে শ্রী কৃষ্ণদাস ব্রম্যচারীর হাত ধরে। ভারতের বৃন্দাবন থেকে বার্ণিল মেলা দেখতে শশাধরের বাড়ীতে আসেন তিনি। ব্রম্যচারী ছিলেন বাঁশির জাদুকর। তার সুরে বার্ণিল মেলা মেতে উঠেছিল বলে গণেষ জানায়। তিনি এমন সুরের জাদুকরকে অনুরোধ জানান, তাকেও এমন শিক্ষা দিতে। যেন তিনি সারা দিন মাঠে বাঁশির সুরে বাতাসে সুরের তরঙ্গ সৃষ্টি করতে পারেন। গণেষের বাঁশিপ্রেম দেখে ভালো লাগে তার। মনের ইচ্ছায় আর গণেষের প্রতি ভালোবাসায় নিজের একজন শ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকার রেখে যান বাংলাদেশে। গণেষের বাঁশিতে সুরের দোল আর জাদুর মায়ায় ভরে যায় ১৩ বছর বয়সে। পরে শশাধরের বাড়ী থেকে চলে আসেন নিজের বাড়ীতে। শুরু করেন বাঁশি বানানোর কাজ। বাঁশ দিয়ে বাঁশি বানিয়ে বিক্রি করতে থাকেন রাজশাহী শহরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। এমনি করে সবুজ ছায়ায় ঢাকা আর পাখির গুঞ্জনের মায়ার টানে গণেষ একদিন চলে আসেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। সকল শিক্ষার্থীর কাছে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই প্রিয় মানুষে পরিণত হন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সকলে তাকে আদর করে নাম দেন গণেষ দা। সবাই এখন তাকে এই নামেই চেনে। ক্যাম্পাসে তার বাঁশির সুরে মুগ্ধ হয়ে কেউ চা আবার অনেকে দশ বা বিশ টাকা হাতে ধরিয়ে দেন। কেউ বা আবার বাঁশির সুরে কিনে নেন একটি বাঁশি। ৭০ টাকা থেকে শুরু করে ২০০ টাকা তার বাঁশির দাম। গণেষ ৪২ বছর থেকে বাঁশি বাজান। তবে একে জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করেন ৩০বছর ধরে। দুই সন্তান আর স্ত্রীকে নিয়ে বাঁশি বাজিয়েই চলে যাচ্ছে তার জীবন।