প্রত্যেক শিল্পীর জীবনে আরাধ্যের জায়গায় থাকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। শিল্পী সত্তার পরিপূর্ণতা পায় যেন এই স্বীকৃতিতেই। সর্বশেষ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ঘোষণায় সেরা অভিনেতা হিসেবে পুরস্কৃত হলেন চিত্রনায়ক ফেরদৌস। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে এটি তার হ্যাট্রিক পুরস্কার। সেই বিরল অনুভূতি এবং ক্যারিয়ারের সাম্প্রতিক বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন বিনোদন প্রতিদিন-এর সাথে। লিখেছেন রবি হাসান
আপনি তো পরপর তিন বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেলেন। অনুভূতিটা একটু শেয়ার করুন।
আসলে এর অনুভূতিটা অসাধারণ, টানা তিনবার রাষ্ট্রের চলচ্চিত্র শিল্পের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতিটা পাওয়ার অনুভূতিটা অবশ্যই ব্যতিক্রম এবং খুব বেশি আনন্দদায়ক। এটা পাওয়ার পর কাজের প্রতি উত্সাহ আরও বেড়ে যায়, দায়িত্বও বেড়ে যায়। ইচ্ছে করে আগামীবারেও যেন পাই। আর সেই ইচ্ছে থেকে কাজের প্রতি মনোযোগ ও শ্রদ্ধাটাও বেড়ে যায়। দায়িত্বও বাড়ে। নিজেকে আরও ভালোভাবে তৈরি করার জন্য উঠে-পড়ে লাগার ইচ্ছা জাগে। আর এখনকার যেই পজিশনে এসেছি এখানে এসে অর্থ, খ্যাতি, যশ মোটামুটি সবই পেয়েছি। তাই এখন যতটুকু কাজ করতে ইচ্ছে করে তা শুধু মানুষের ভালোবাসাটাকে আরও বেশি গভীর করে তোলার জন্য, কীভাবে তাদের ভালোবাসা আরও বেশি পাওয়া যায়। আর এগুলো নিয়ে নিজের সঙ্গে নিজের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়।
এবারে আপনার বর্তমান ব্যস্ততা সম্পর্কে একটু জানতে চাই।
ঢাকা ও কলকাতা এই নিয়েই দৌড়াদৌড়ির মধ্যে আছি। ‘এক কাপ চা’ ছবিটা তো কমপ্লিট হয়ে গেল। কলকাতায় ‘পার্কস্ট্রিট’ নামের নতুন ছবির কাজ শুরু করলাম, এরই শুটিং করে ফিরলাম। আগামী ১৮ ও ১৯ তারিখে এশিয়ান টিভি ও এসএ টিভির উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আছে, এর জন্য রিহার্সাল করছি। মঞ্চে পারফর্ম করতে হবে। এই তো এগুলো নিয়েই আছি! এর মধ্যে আরও নতুন কিছু ছবিতে সাইন করলাম, এগুলো হয়তো এ মাসের শেষের দিক থেকে শুরু হতে থাকবে। মোস্তাফিজুর রহমান মানিকের ‘কত আশা কত ভালোবাসা’ ছবিতে সাইন করেছি। তারপর ‘চার অক্ষরের ভালোবাসা’ নামের একটি ছবিতেও সাইন করেছি। তবে এই ছবিটির নাম পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি। সরকারি অনুদানের ছবি ‘মেঘের অরণ্য’তে সাইন করলাম। কলকাতায় ‘প্রফেসর’ নামের একটি চলচ্চিত্রের কাজও শুরু করতে যাচ্ছি।
আপনার প্রযোজিত ছবি ‘এক কাপ চা’-এর কাজ নিয়ে তো অনেক দিন হয়ে গেল। মুক্তি দেবেন কবে?
আসলে ব্যস্ততা এত যে কোনোভাবেই গুছিয়ে উঠতে পারছি না। আমার নিজের জন্যই নিজের ছবি পিছিয়ে গেছে। আর এই নিজের দোষের কারণেই আপাতত ফাইনাল কিছু বলতে পারছি না। তবে আগামী মাসে এর ফাইনাল প্রিন্ট নিয়ে আসব এবং সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে এপ্রিলে মুক্তি দেওয়ার সম্ভাবনা আছে। বেসিক্যালি আমি প্রফেশনাল প্রডিউসার না, তারপরও ছবিটি প্রডিউস করেছি। আর এর পুরোটাই করেছি ইমোশন থেকে। আর ইমোশন থেকেই কাজ করতে ভালো লাগে।
এ কথা প্রচলিত যে, আপনি অনেকটা নিয়মিতই কলকাতার ছবিতে কাজ করছেন। কিছুদিন আগে প্রশ্ন উঠেছে আপনি নাকি সেখানে মূল ভূমিকায় অভিনয় করছেন না। এ বিষয়টা কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
এটা একেবারেই ভুল, আমি সেখানেও মূল ভূমিকায় অভিনয় করি। মাত্র দুটি ছবিতে আমি মূল ভূমিকায় ছিলাম না। একটা জিতের সঙ্গে একটা দেবের সঙ্গে। এটা মাঝেমধ্যে সম্পর্কের খাতিরে করতেই হয়। আর আমি ইদানীং কলকাতার অনেকগুলো ছবিতে অতিথি চরিত্রেও অভিনয় করেছি। অতিথি চরিত্রে অভিনয় করাটাতো দোষের কিছু না। আর আমি যদি মনে করি মূল চরিত্র ছাড়া অভিনয় একেবারেই অভিনয় করব না, তাহলেতো একঘেয়ে হয়ে যায়।
কিছুদিন আগে তো কলকাতার ছবি বাংলাদেশে আনা হলো, ব্যবসায় তারা ফ্লপও করলেন। নতুন করে আবার কলকাতার ছবি বাংলাদেশে এবং বাংলাদেশের ছবি কলকাতায় চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
একটা জিনিস দেখবেন, গত প্রায় বেশ ক’বছর ধরে আমাদের দেশের তেমন কোনো ছবিই কিন্তু বাইরের দেশের কোনো ফেস্টিভ্যালে অংশ নিতে পারেনি বা সুযোগ পায়নি। অথচ আমাদের ঢালিউডের একটা সময় ছিল নিয়মিতই ছবি বিভিন্ন ফেস্টিভ্যালে যেত। সেই হিসেবে যদি বলা হয় তাহলে আমি বলব কলকাতায় আমাদের ছবি প্রচার হলে আমাদের ইন্ডাস্ট্রিরই লাভ হবে। পাশাপাশি কলকাতার ছবি আমাদের দেশে চললে তারাও লাভবান হবে। এতে প্রতিযোগিতাও বৃদ্ধি হবে। ইন্ডাস্ট্রির পরিচিতি বাড়বে। আর আমার ভেতর যদি এমনটা কাজ করে যে, আমি বাংলা ছবি ছাড়া কোনো ছবি দেখব না তাহলে তো হবে না। আমার টিভিতে ১০০টি চ্যানেল আছে, আমি প্রায় সবকয়টা দেখার মানসিকতা রাখি। আর এটাই প্রয়োজন।
এখনতো আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে অনেক ভালো ছবি হচ্ছে। দর্শকরাও হলমুখী হচ্ছে। তারপরও এর সংখ্যা খুবই হাতে গোনা। দেখা যায় বছরে দুয়েকটা। কিন্তু ছবি তো মুক্তি পাচ্ছে অনেকগুলোই। বাকিগুলো গ্রহণযোগ্যতা না পাওয়ার কারণ কী বলে মনে হয় আপনার কাছে?
আসলে আমাদের ছবির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো চিত্রনাট্যে। অধিকাংশ ফিল্মই আমরা করি হিন্দি বা তামিল ছবির অনুকরণে। মৌলিক স্ক্রিপ্টের ছবির কাজ আমরা করিই না বললে চলে। আমাদের সাহিত্যের শিল্প এত সমৃদ্ধ তারপরও আমরা আরেকজনকে অনুকরণ করছি। আমাদের এত গুণী গুণী সাহিত্যিক, গল্পকার ঔপন্যাসিক রয়েছেন তাদেরকে আমাদের চোখেই পড়ে না। এত ভালো ভালো গল্প আমরা উপহার পেয়েছি, এর কোনোটার মধ্যেই আমাদের চোখ পড়ে না। নির্মাতারা গল্পের দিকে এগোতেই চায় না। যে কারণে দর্শকরা সবচেয়ে বেশি বিরক্ত হয়। তারপর হচ্ছে সিনেমা হল, এই ২০১৩-তে এসেও এ ধরনের সিনেমা হল দেখতে হচ্ছে আমাদের। যদি আমরা শতাধিক মাল্টিপ্লেক্স সিনেমা হল পেতাম তাহলে তো দর্শক অবশ্যই আসত। তারপর প্রযুক্তিগত দিকটা তো রয়েছেই, নির্মাতারা প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে সময়ের সাথে নিজেদের তাল মেলানোর সাহসটুকু নিতে জানেন না। যে কারণে তাদের ছবিগুলো গ্রহণযোগ্যতা পায় না। দর্শক সিনেমা দেখবেই, তাদের দেখতেই হবে এবং তারা আজীবন সিনেমা দেখে যাবে, এটা প্রকৃতির নিয়ম। কিন্তু আমরা সেই নিয়মকে ধরে রাখতে পারি না। দর্শক কিন্তু সিনেমা নিয়মিতই দেখছে, কিন্তু আমরা বঞ্চিত আমাদেরই দোষে।
আরেকটা জিনিস বলতে চাই যেমন, গল্প হচ্ছে মুম্বাই বা লন্ডনের প্রেক্ষাপটে, অথচ এই মুম্বাই বা লন্ডনের শুটিংটুকু এফডিসিতেই স্বল্প খরচে সেট বানিয়ে করা হচ্ছে। এই বিষয়টা কী হাস্যকর মনে হয় না আপনার কাছে?
মুম্বাই বা লন্ডনের ইনডোরের কাজটা যদি বলি তাহলে ভালো একটি বাড়ি বা বাসা খুঁজে না হয় করা যায়। ভালোভাবে সাজালে হয়তো বুঝা যাবে না। কিন্তু আউটডোরের কাজ করলে এটা হবে না। আমাদের দেশের দর্শক এখন অনেক স্মার্ট। আউটডোরে তো সবচেয়ে প্রথম ওই নির্মাতা মুম্বাই বা লন্ডনের আবহাওয়াই ক্রিয়েট করতে পারবে না। বাকি সেটের কথা বাদই দিলাম। এটা হচ্ছে দর্শকদের সামনে নিজেদের হাস্যকর করে তুলে ধরা। দর্শকরা অনেক ভালো বুঝে, তাদের সঙ্গে ধোঁকাবাজি করার উপায় নেই। আমার মনে হয় এসব নির্মাতারা তাদের বিশ্বাসযোগ্যতার জায়গাটি হারানো ছাড়া আর কিছুই করছেন না। আমরা একটা ছবি বানাই দর্শকের জন্যই, সেই দর্শকের সঙ্গেই যদি প্রতারণা করি তাহলে দর্শক আমাদের ভালোবাসবে কীভাবে!
আপনি তো একাধিক ড্যান্স রিয়েলিটি শো’র বিচারক হিসেবে রয়েছেন। এর অভিজ্ঞতাটা একটু শেয়ার করুন।
নাচ দেখতে ভালো লাগে, জাজমেন্ট করতেও আমি খুব এনজয় করি। আমাদের দেশে অনেক প্রতিভাবান ড্যান্সার আছে। আমি বরাবরই নিজের পছন্দের কাজের সঙ্গেই যুক্ত থাকার চেষ্টা করি, যেখানে আসলে আমি আনন্দ পাই, ভালো লাগে। আবার আরেকটা জিনিস, আনন্দের পাশাপাশি ভালো টাকাও পাচ্ছি।
আমাদের এই রিয়েলিটি শো’র কোরিওগ্রাফারদের সম্পর্কে একটু শুনতে চাই। তারা কি আসলে পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে নিজেদের তাল ধরে রাখতে পারবে?
তারা চেষ্টা করছে, বিভিন্ন দেশের চ্যানেলের প্রোগ্রাম দেখে এবং এই ধরনের মানসিকতা নিয়েই নেমেছে। আমি বলব না যে তারা খুব ভালো করছে, কিন্তু তারা ভালো করার চেষ্টা করছে এটাই আমি মনে করি যে অনেক বড় ব্যাপার। একটা সময় গিয়ে অবশ্যই তারা ভালো করবে। আমাদের ফিল্মে এখনও নতুন কোরিওগ্রাফার নেই, আর দু’চারজন যারা আসছে তাদের মধ্যে ক্রিয়েটিভ কেউ নেই। সেদিক থেকে যারা এখন রিয়েলিটি শো’তে কাজ করছে তাদের চেষ্টাটা আমি বলব খুবই ভলো। তারা এক্সপেরিমেন্ট করতে জানে, সাহস নেয়।
