অফ বিট সিনেমার অভিনেত্রী হলেও বলিউডের সাধারণ কমার্শিয়াল মুভির অঙ্গনে বিচরণ রয়েছে চিত্রাঙ্গদা সিংয়ের।
মেধাবী অভিনেত্রী হিসেবে তার
যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। গ্ল্যামারাস রোলেও কম যান না তিনি। আইটেম গার্লরূপেও রুপালি পর্দায় দেখা গেছে তাকে।
এ সপ্তাহে চিত্রাঙ্গদা অভিনীত
নতুন ছবি ‘ইনকার’ মুক্তি পাচ্ছে।
সমকালীন সামাজিক বাস্তবতায় সাহসী বিষয়বস্তুনির্ভর এ ছবিটিকে ঘিরে এর মধ্যে আলোচনা, আগ্রহ বেশ জমে উঠেছে। ‘ইনকার’ ছবিতে চিত্রাঙ্গদা আসছেন
অভিনয়ের নতুন চমক নিয়ে।
এ ছবিতে তার অভিনয়, নিজস্ব অনুভূতি এবং ক্যারিয়ারের নানা বিষয় নিয়ে
লিখেছেন রেজাউল করিম খোকন
দিল্লিতে বাসে নির্মম পাশবিকতার শিকার জ্যোতি সিং পান্ডের ধর্ষণকারীদের মৃত্যুদণ্ড দাবি করে সবাই যখন সোচ্চার, যখন নারীর উপর যৌন নিপীড়নের জন্য ভয়ঙ্কর শাস্তির বিধান করতে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উঠছে তেমন প্রেক্ষাপটে মুক্তি পাচ্ছে ‘ইনকার’ ছবিটি। বলিউডের ভিন্ন ধারার সিনেমা নির্মাতা সুধীর মিশ্র পরিচালিত এ ছবির বিষয়বস্তু কর্মক্ষেত্রে নারীর উপর যৌন নিপীড়ন নিয়ে আবর্তিত হয়েছে। এ ছবিতে চিত্রাঙ্গদা সিং অভিনয় করেছেন প্রতিষ্ঠিত এক অ্যাডফার্মে কর্মরত কপি রাইটারের ভূমিকায়। এখানে তার অভিনীত চরিত্রের নাম মায়ালুথরা। অ্যাড ফার্মের শীর্ষ কর্তাব্যক্তি রাহুল ভার্মার বিরুদ্ধে মায়া লুথরা যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আনলে অফিসজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। যৌন নিপীড়নের শিকার মায়ার অভিযোগের তদন্তের জন্য কমিটি কাজ শুরু করে। ঘটনাটির তদন্ত করতে গিয়ে চাঞ্চল্যকর আরও অনেক বিষয় বেরিয়ে আসে। যেখানে অফিস পলিটিক্সের নোংরামির নগ্ন প্রকাশ রয়েছে। এমনই ঘটনাবলি নিয়ে আবর্তিত ‘ইনকার’ ছবিটিকে সেন্সর বোর্ড ‘এ’ সার্টিফিকেট (অর্থাত্ শুধুমাত্র প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য) দিয়েছে। এ ছবিতে মায়া চরিত্রে রূপদানকারী চিত্রাঙ্গদা সিং বেশ কিছু সাহসী দৃশ্যে কাজ করেছেন অভিনেতা অর্জুন রামপালের সঙ্গে। অর্জুনের সঙ্গে চিত্রাঙ্গদার এটাই প্রথম ছবি। ‘ইনকার’ ছবির সাহসী বিষয়বস্তু দর্শকদের আলোড়িত করবেই।
চিত্রাঙ্গদা সিং পড়াশোনা শেষ করে মডেলিংয়ের মাধ্যমে শো বিজে পা রাখেন। একটি মিউজিক ভিডিওতে তার কাজ দেখে পরিচালক সুধীর মিশ্র ডেকে পাঠান তাকে এবং ‘হাজারো খোয়াইশি অ্যায়সি’ ছবিতে প্রধান নারী চরিত্রে কাস্ট করেন। তার প্রথম অভিনীত ছবিতেই সমালোচক-বোদ্ধা দর্শকদের নজর কাড়েন। তাকে পর্দায় দেখে প্রখ্যাত চিত্রনির্মাতা শেখর কাপুর উচ্ছ্বসিত হয়ে মন্তব্য করেছিলেন, ‘তুমি স্মিতা পাতিল হয়ে ফিরে এসেছে সবার সামনে।’ ২০০৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘হাজারো খোয়াইশি অ্যায়সি’ ছবিটি চিত্রাঙ্গদাকে হিন্দি সিনেমার অঙ্গনে জনপ্রিয় অভিনেত্রীদের কাতারে নিয়ে যেতে না পারলেও ভিন্ন ধারার সিনেমার নির্ভরযোগ্য অভিনেত্রীরূপে পরিচিত করেছিল। এরপর ‘কাল :ইয়েস্টার ডে অ্যান্ড টুমরো’, ‘সরি ভাই’, ‘বসেরা’ এবং ‘ইয়ে শালি জিন্দেগি’ ছবিগুলোতে দর্শক তাকে একজন যথার্থ মেধাবী অভিনেত্রীরূপে দেখেন জটিল ও চ্যালেঞ্জিং রোলে। গত ২০১১-তে চিত্রাঙ্গদা বাণিজ্যিক ধারার কমেডি সিনেমা ‘দেশি বয়েজ’-এ গ্ল্যামারাস নায়িকার চরিত্রে অভিনয়ের সুবাদে নতুনভাবে চমক সৃষ্টির করেন। ওই ছবিতে তাকে খিলাড়ি হিরো অক্ষয় কুমারের বিপরীতে সুন্দরী অর্থনীতির শিক্ষিকার ভূমিকায় দেখা গেছে।
গত বছর ‘জোকার’ ছবিতে আইটেম গার্লরূপেও আত্মপ্রকাশ করেছেন চিত্রাঙ্গদা। এ ছবিতে আইটেম সঙ ‘কাফি রানা’ পারফর্ম করেছেন তিনি। ‘জোকার’ ছবিটি ফ্লপ হলেও চিত্রাঙ্গদা তার আইটেম ‘কাফি রানা’র মাধ্যমে দর্শক হূদয়ে ঠিকই ঝড় তুলেছেন।
‘ইয়ে শালি জিন্দেগি’ ছবিতে খ্যাতি, প্রতিষ্ঠা, অর্থ, বিত্ত লাভের স্বপ্নে বিভোর হয়ে মুম্বাই আসা একজন উঠতি গায়িকার চরিত্রে চিত্রাঙ্গদার ব্রিলিয়ান্ট পারফর্মেন্স সবার অকুণ্ঠ প্রশংসা অর্জন করেছিল। ইনকার ছবিতে কর্মক্ষেত্রে যৌন নিপীড়নের শিকার একজন নারীর চরিত্রে রূপদানকারী চিত্রাঙ্গদা সিং দিল্লি শহরে সাম্প্রতিক সময়ের আলোড়ন সৃষ্টিকারী মেডিকেল ছাত্রী জ্যোতি সিং পান্ডে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি দিল্লিতে হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করেছি। তখন বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা হয়েছে। এখানে মেয়েরা নানাভাবে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়।’ বলিউডে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আশায় পা রাখা মেয়েদের নানাভাবে যৌন নিপীড়নের শিকার হতে হয় তেমন অভিযোগ প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ‘নারীদের উপর যৌন নিপীড়ন কোথায় হচ্ছে না? এটা সর্বত্রই বিরাজমান। একটি ন্যক্কারজনক ব্যাপার। বলিউডের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে আমার মনে হয় তুলনামূলকভাবে এখানে এটা অনেক কম। এখন একজন অভিনেত্রীর কাজের অভাব নেই। যার যোগ্যতা ও মেধা আছে সে নিজে দেখে-শুনে-বুঝে পছন্দ করে কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে তার উপর অন্য কারও বিশেষ সুযোগ গ্রহণের পথ অনেকটা কমে এসেছে।’
‘ইনকার’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য চিত্রাঙ্গদা সিংকে অনেকটা ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। অভিনীত চরিত্রের প্রয়োজনে তার মাথার লম্বা চুল কাটতে হয়েছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও শুধুমাত্র পরিচালক সুধীর মিশ্রের নির্দেশে তিনি একান্ত বাধ্য হয়েছিলেন এটা করতে। তখন খুব খারাপ লেগেছিল তার। ‘ইনকার’ ছবিতে তার অভিনীত মায়া চরিত্রটিকে কলেজ জীবন থেকে শুরু করে অ্যাড ফার্মের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা পদে নিয়োজিত অবস্থা পর্যন্ত দেখানো হয়েছে। ফলে তার গেটআপ ও লুকে অনেক পরিবর্তন আনতে হয়েছে। এখন চিত্রাঙ্গদার খাটো চুলের সাজ বা লুকটি সবার প্রশংসা পাচ্ছে। ‘আমার তখন অনেক খারাপ লেগেছিল মাথার চুল কেটে ছোট করতে হয়েছিল বলে, কিন্তু এখন সবাই আমার নতুন লুকের প্রশংসা করছেন দেখে আগের চুল কাটার দুঃখ ভুলে গেছি। বেশ ভালো লাগছে।’ এ ছবিতে অর্জুন রামপালের সঙ্গে সাহসী দৃশ্যে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে চিত্রাঙ্গদা বলেন, ‘আমি দারুণভাবে নার্ভাস হয়ে গিয়েছিলাম মাথা কাজ করছিল না, অর্জুন রামপালই নানা হাসি-ঠাট্টা করে পরিবেশটাকে হালকা করে তুলেছিল। যার ফলে দৃশ্যগুলো অনেকটা নির্বিঘ্নে ক্যামেরাবন্দি করতে পেরেছিলাম আমরা। আমরা সবাই মিলে পরিকল্পনা করে দৃশ্যগুলোর শুটিং করেছি। তেমন সাহসী দৃশ্যে অভিনয়ে যদি শিল্পীটি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ না করে তার চেহারায় সেই ভাবটি ফুটে ওঠে তাহলে তা দেখতে ভীষণ খারাপ লাগবে। আমি ‘ইনকার’ ছবিতে অভিনয়ের সময় এ বিষয়টি মাথায় রেখেছি সব সময়, পর্দায় যাতে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় দৃশ্যগুলো তেমন চেষ্টা করেছি।’ খুব বেশি সিনেমায় অভিনয় করেননি চিত্রাঙ্গদা। বেছে বেছে ব্যতিক্রমধর্মী ছবিতে তেমন চরিত্রে অভিনয় করেন যাতে চ্যালেঞ্জিং অভিনয়ের সুযোগ রয়েছে। ‘আমি যতক্ষণ ছবির পরিচালক এবং সহশিল্পীর সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করব, ততক্ষণ পর্যন্ত যেকোনো ধরনের সাহসী দৃশ্যে অবলীলায় অভিনয় করব। আমি জানি কোথায় আমাকে ‘না’ বলতে হবে।’
স্মিতা পাতিলের মতো অনেকটা দেখতে চিত্রাঙ্গদা সিংকে যদি কোনো নির্মাতা স্মিতা সাজতে বলেন, স্মিতার চরিত্রে রূপদান করতে বলেন তাহলে কি তিনি সেই প্রস্তাব গ্রহণ করবেন? তেমন প্রশ্নের জবাবে চিত্রাঙ্গদা বলেন, ‘আমাকে যদি স্মিতা পাতিলের ভূমিকায় অভিনয় করতে বলা হয় তাহলে আমি সম্মানবোধ করব। আমি চাই, তার জীবনীনির্ভর কোনো ছবিতে কাজ করতে। আমি আগে তেমনটি ভাবিনি। তবে এখন মনে হয় তেমন সুযোগ পেলে খুবই ভালো হবে। স্মিতা পাতিলের চেহারার সঙ্গে আমার অনেক মিল থাকাটা বিরাট সুযোগ বলে মনে করি। আমাকে দেখে যখন অনেকের স্মিতা পাতিলের কথা মনে পড়ে তখন আমার খুব ভালো লাগে। যে মানুষটি নেই কিন্তু আমাকে দেখে অনেক আমার মাঝে তাকে খুঁজে পান। ব্যাপারটি সত্যি অসাধারণ আমার জন্য।’
চিত্রাঙ্গদা সিং অভিনীত আরেকটি ছবি ‘আই মি আউর ম্যায়’ আসছে খুব শিগগির। এ ছবিতে জন আব্রাহামের বিপরীতে তাকে দেখা যাবে। ওই ছবিতে আরও আছেন প্রাচী দেশাই। ‘ইনকার’ এবং মুক্তি প্রতীক্ষিত ‘আই মি আউর ম্যায়’ ছবির নায়িকা হিসেবে চিত্রাঙ্গদাকে ঘিরে বলিউডে আলোচনা এখন তুঙ্গে।
