একরকম বাধ্য হয়েই শেষ পর্যন্ত বৈপ্লবিক অবস্থান নিয়ে ফেললো বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। পাকিস্তানের তরফ থেকে কোনোরকম ইতিবাচক সাড়া না পাওয়ায় তাদের ক্রিকেটার ছাড়াই বিপিএল যথাসময়ে অর্থাত্ আগামীকাল থেকে শুরু করার ঘোষণা দিয়ে দিল বিসিবি। দিনভর জরুরি সভা শেষে ভারাক্রান্ত বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন সংবাদ সম্মেলনে এসে জানালেন, তারা নতি স্বীকার করতে রাজী নন। তাই পিসিবির এই আচরণকে ‘চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে নিয়ে সফল করতে চান বিপিএলের দ্বিতীয় আসর। সেই সঙ্গে বিসিবি পরিষ্কার করে দিয়েছে, পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্তের ফলে এখন সে দেশে সফরের ব্যাপারে বাংলাদেশের ওপর আর কোনো ধরনের চাপ রইল না।
বিসিবির দাবি মতে পিসিবির ‘অপেশাদার আচরণ’-এরপরও আজ টুর্নামেন্টের উদ্বোধন এবং কাল থেকে খেলা শুরু হয়ে যাবে বিপিএলের। বিসিবি মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান এ ব্যাপারে পরিষ্কার বলে দিলেন, ‘আমরা পিসিবিকে একটি চিঠি দিয়েছিলাম বিপিএলে তাদের খেলোয়াড়দের নো অবজেকশন সার্টিফিকেট (এনওসি) দিবে কিনা, জানানোর জন্য। আজকে সকাল ১০টা পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করে কিছু জানতে পারিনি। তবে আমরা জেনেছি কিছুক্ষণ আগে তাদের ওখান থেকে একটা ফোন আসে। তারা বলেছে, বাংলাদেশ দল পাকিস্তানে না পাঠালে বিপিএলে কোন খেলোয়াড়ের ছাড়পত্র তারা দিবে না। এমন কোনো শর্তের কাছে মাথা নিচু করতে রাজী নই আমরা। এমন অবস্থায় আমাদের সিদ্ধান্ত হচ্ছে পাকিস্তান খেলোয়াড় ছাড়াই বিপিএল চালিয়ে যাব। কাল (আজ) উদ্বোধন এবং ১৮ তারিখ থেকে খেলা শুরু হয়ে যাবে’।
বাংলাদেশ দলের পাকিস্তান সফর নিয়ে পিসিবি যে আচরণ করেছে তা বিসিবি কোনভাবেই মেনে নিতে পারছে না। ভারতের দিল্লিতে দুই বোর্ড সভাপতির সৌহার্দ্যপূর্ণ আলাপের পরও পিসিবি কেন এই আচরণ করেছে তা যেন বোর্ড সভাপতির কাছে বিস্ময়ের ব্যাপার। বিপিএলকে পিসিবি হাতের অস্ত্র ভেবে বিসিবিকে জিম্মি করেছে। দৃশ্যত তাই ঘটেছে, তবে বোর্ড সভাপতি সেটাকে এভাবে না দেখে বললেন, ‘জিম্মি ঠিক বলবো না। তারা জানে ১৭ তারিখে উদ্বোধন এবং ১৮ তারিখে খেলা। তারা খেলোয়াড় পাঠাবে না এটা আগেও বলতে পারতো। কাজেই তারা জেনে-শুনে এটা করতে পারবে তা চিন্তাও করিনি’।
বাংলাদেশ দলের পাকিস্তান সফরে প্রতিশ্রুতি থেকে দুই দেশের সম্পর্কের অবনমন হয়। সাবেক বোর্ড সভাপতি আ হ ম মোস্তফা কামাল এমপির আইসিসির সহ-সভাপতি হওয়ার লক্ষ্যে তিনি আইসিসির সভায় পিসিবিকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেখান থেকে ঘটনার সূত্রপাত হয় এবং এর পরিণতি হল বিপিএলে পাকিস্তানী খেলোয়াড়রা খেলছে না। বিসিবির জন্য এটা বিরাট চ্যালেঞ্জ বটে তবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডও সেই চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত। বিসিবি সভাপতি পাপন বলেন, ‘তারা শর্ত দিয়েছে এই তারিখের মধ্যে আমদের খেলতে যেতে হবে। কোন ধরনের পর্যবেক্ষণ ছাড়াই আমাদের পক্ষে এ ধরনের কথা দেয়া সম্ভব না। ফলে এই শর্ত আমরা কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। এখন যা হল, তাতে বিপিএলে এই টুর্নামেন্টটি দেশি-বিদেশি খেলোয়াড়দের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসেবে এসেছে। পাকিস্তানী খেলোয়াড়রা যদি নাও আসে তাদের ছাড়াই সেটা করতে পারব। আমরা আরো চার-পাঁচটি দেশের খেলোয়াড় আনার চেষ্টা করেছি। আমার ধারণা ফ্রাঞ্চাইজিরা যে ধরনের খেলোয়াড় চাইছে সেটাই আনতে পারবো’। এদিকে বিসিবিও যেমন ব্যস্ত ও উদ্বিগ্ন সময় কাটাচ্ছে; তেমনই খেলোয়াড়দের ছাড়পত্র দেয়ার ব্যাপারে কাল দিনভর লাহোরে সভা করেছে পিসিবি। কিন্তু সভায় বিপিএল প্রসংগে কোন ইতিবাচক কিছু আসেনি। বরং দুপুরের পর পিসিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সুবহান আহমেদ টেলিফোনে বিসিবি সিইওকে বলেছেন, পাকিস্তান সফরের নির্দিষ্ট কোন তারিখ না দেয় তাহলে বিপিএলের জন্য তারা খেলোয়াড় ছাড়বে না। এই কথাতে অনেকটাই ‘হুমকি’ হিসেবে দেখছে বিসিবি।
বিপিএলে পাকিস্তানীরা না এলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ফ্রাঞ্চাইজিদের। এককেটি ফ্রাঞ্চাইজি পাঁচ থেকে সাতজন পাকিস্তানী খেলোয়াড় দলে নিয়েছে। সাত ফ্রাঞ্চাইজি মিলে মোট ২৭ পাকিস্তানী দলে নিয়েছে তারা। তাদের বিকল্প নেয়ার জন্য সময়ও প্রয়োজন। তবে বিসিবি ফ্রাঞ্চাইজিদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তারা ফ্রাঞ্চাইজিদের সাথে মিটিং করে বিকল্প খেলোয়াড়ও অন্তর্ভুক্তের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। বিসিবি সভাপতি ফ্রাঞ্চাইজিদের এই সমস্যার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘একটা-দু’টি দল ছাড়া বাকি দলগুলোর গোছানো শেষ। গতকাল (পরশু) রাত থেকে এর মধ্যে বিকল্প নেয়া হয়েছে। যার জায়গায় বিকল্প খেলোয়াড় নেয়া হয়েছে পরে যদি পাকিস্তানী ওই খেলোয়াড় আসতে চায় তাহলে তাকে নিতে পারবে না’। তবে পুরো এই ব্যাপারটায় একটা জায়গায় বিসিবি বেশ এগিয়ে গেল। পাকিস্তানের খেলোয়াড় না পাঠানোর সিদ্ধান্তের ফলে বিসিবির উপর থেকে সফরের জন্য চাপটাও কমে যাচ্ছে। যে ধরনের সহিংসতা চলছে এখন পাকিস্তানে, সেটার পরিপ্রেক্ষিতে সেখানে সফর করাও বাংলাদেশের জন্য কঠিন বিষয় হতো। পিসিবি খেলোয়াড় না ছাড়ায় বিসিবিও এখন অনেকটা হাল্কা। বোর্ড সভাপতিও চাপ কমে যাওয়ার কথাটি মেনে নিয়েই বলছেন, ‘এখন আর তাড়াহুড়া নেই। মাথার মধ্যে যে একটা চিন্তা ছিল ওটা নেই। প্রচণ্ড চাপে ছিলাম। যেহেতু তারা এই টুর্নামেন্টের আগে এরকম একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জানে বিপিএল নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এখন আমরা বসে সিদ্ধান্ত নিব কি ধরনের সাড়া দেয়া উচিত’।
