বিশ্ব ইজতেমার উত্পত্তি ও ক্রমবিকাশ

আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:০৮
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ভারতবর্ষের মুসলমানদের ইতিহাসের এক ক্রান্তিলগ্নে তাবলিগ জামাতের শুভ সূচনা হয়। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম ইসলামী চিন্তাবিদ ও সাধক হজরত মাওলানা ইলিয়াস আখতার কান্ধলভী (১৮৮৫-১৯৪৪ খ্রি.) দাওয়াতে তাবলিগী জামাতের পুনর্জাগরণ করেন। তত্কালীন বৃটিশ-ভারতের রাজধানী দিল্লীর দক্ষিণ পার্শ্বস্থ এক জনবিরল নীরব অঞ্চল ‘মেওয়াত’। চারিত্রিক বিপর্যস্ত ধর্ম-কর্মহীন, অশিক্ষিত ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন নামেমাত্র মুসলমান ‘মেও’ জনগোষ্ঠীকে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস, ধর্মের পূর্ণাঙ্গ অনুশীলন ও কালেমার দাওয়াতী মর্ম শিক্ষাদান এবং বিভ্রান্তির কবল থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে হযরত মাওলানা ইলিয়াস (র.) বিশ্বব্যাপী এ তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম শুরু করেন। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, জনগণের বৃহত্তর অংশে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস সুদৃঢ়করণ ও তার বাস্তব অনুশীলন না হলে মানব সমাজে পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না। বরং সাধারণ মানুষের জীবনে দ্বীন ইসলাম না আসলে মুমিন হতে পারে না। ১৩৪৫ হিজরিতে দ্বিতীয় হজ্ব থেকে ফিরে এসে তিনি তাবলিগী গাশ্ত শুরু করলেন, জনসাধারণের মাঝে কালেমা ও নামাজের দাওয়াত দিতে লাগলেন। তাবলিগ জামাত বানিয়ে বিভিন্ন এলাকায় বের হওয়ার দাওয়াত দিলেন, এভাবে গ্রামে গ্রামে কাজ করার জন্য জামাত তৈরি করে দিতেন। কয়েক বছর মেওয়াতে এ পদ্ধতিতে কাজ অব্যাহত থাকলো। ১৩৫২ হিজরিতে তৃতীয় হজ্ব পালনের পর তিনি বুঝতে পারলেন যে, গরিব মেওয়াতী কৃষকদের পক্ষে দ্বীন শেখার সময় পাওয়া কষ্টকর। ঘর-সংসার ছেড়ে মাদ্রাসায় দ্বীন শেখাও অসম্ভব। ওয়াজ নসীহতের মাধ্যমে সামগ্রিক জীবন পাল্টে দেয়া বা জাহেলী বিশ্বাসকে পরিবর্তন করাও সম্ভব নয়। তাই একমাত্র উপায় হিসেবে তাদের ছোট ছোট জামাত আকারে ইলমী ও দ্বীনি মারকাযগুলোতে গিয়ে সময় কাটানোর জন্য উদ্বুদ্ধ করলেন এবং ধর্মীয় পরিবেশে তালিম দিতে আরম্ভ করলেন। সেই ধর্মীয় মজলিসে উলামা-মাশায়েখদের ওয়াজ-নসীহতের পাশাপাশি তাদের দৈনন্দিন জীবনের নিয়মনীতি বাতলে দেয়া হতো। দ্বীনদার পরহেজগার লোকদের জীবন-যাপন, কথাবার্তা, আচার-আচরণ, চালচলন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। ধর্মীয় মৌলিক বিশ্বাস ও ইবাদতের অনুশীলনের পাশাপাশি তিনি মুসলমানদের অনুসৃত প্রধান ধর্মগ্রন্থ আল কোরআনের প্রয়োজনীয় কিছু সূরা-কিরাআত শিক্ষাদান, দোয়া-দরূদ, জরুরি মাসলা-মাসায়েল ও ফাতওয়া সম্পর্কে অবহিত করে তার তাবলিগ জামাতকে একটি ভ্রাম্যমাণ মাদরাসাতে রূপান্তরিত করেন। এভাবেই পর্যায়ক্রমে তাবলিগের বিশ্বব্যাপী প্রচার ও প্রসার ঘটে। উল্লেখ্য, শুরুতে তাবলিগী কাজ ব্যাপক সমর্থন পায়নি। ধীরে ধীরে এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। এ ব্যাপারে মহান সাধক হজরত মাওলানা ইলিয়াস (র.) অত্যন্ত ন্যায়নিষ্ঠা, ধৈর্য,পরিশ্রম, পরিকল্পনা ও নির্দেশনা অপরিসীম ভূমিকা রাখে। মাওলানা ইলিয়াস শাহ আখতার (র.) সারা জীবন পথহারা মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দিয়ে এই দাওয়াত ও তাবলিগ জামাত তথা বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ঐক্যের প্রতীক বিশ্ব ইজতেমাকে ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য এক সুদৃঢ় মজবুত ও শক্তিশালী অবকাঠামোর উপর ভিত্তি স্থাপন করে ১৯৪৪ সালের ১৩ জুলাই ৫৯ বছর বয়সে ইহকাল ত্যাগ করেন। সারাবিশ্বের লাখ লাখ দ্বীনদার মুসলমান আলোর পথের দিশারী এই মহান সাধককে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। তাঁর ইন্তেকালের পর বিশ্ব মুসলিম ঐক্য ভ্রাতৃত্বের প্রতীক বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় প্রধান মুবাল্লিগ নিযুক্ত হন তাঁর সুযোগ্য পুত্র হজরত মাওলানা ইউসুফ কান্ধলবী (র.)। তিনি তাবলীগের দাওয়াতী জামাতকে এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছিয়ে থাকেন। এই তাবলীগের দাওয়াতের সূত্র ধরেই মুসলিম ঐতিহ্যের স্পেনের মাটিতে ৫০০ বছর পর মসজিদের মিনারায় আজানের সুমধুর আওয়াজ ধ্বনিত হয়। দ্বিতীয় আমির মাওলানা ইউসুফ কান্ধলবী (র.)-এর যুগে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে এর আন্দোলন সবচেয়ে বেশী ও শক্তিশালী ছিল। বার্ষিক ইজতেমার প্রয়োজন অনুভব করে হজরত মাওলানা ইউসুফ কান্ধলবী (র.) মুরুব্বীদেরকে নিয়ে পরামর্শ বৈঠকে আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমি সোনার বাংলাদেশের নাম বেরিয়ে আসে। উল্লে¬খ্য, তাবলীগ জামাতের সদর দফতর দিল্লি¬তে থাকা সত্ত্বেও এর বার্ষিক সমাবেশের জন্য বাংলাদেশকে বেছে নেওয়া হয়। কথিত আছে, তাবলীগ জামাতের মুরুব্বিদের বৈঠকে ইজতেমার স্থান নির্ধারণের জন্য নাকি লটারি হয়েছিল। সেই লটারিতে বাংলাদেশের নাম ওঠে। আর সেই থেকেই বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের প্রতীক মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় সর্ববৃহত্ সমাবেশ ও মহাসম্মেলন বিশ্ব ইজতেমা ১৯৪৬ সালে অনুষ্ঠিত হয় ঢাকাস্থ কাকরাইল মসজিদে। আল্লাহ তাআলা বিশ্ব ইজতেমার জন্য বাংলাদেশকে কবুল করেছেন। এটি আমাদের দেশের জন্য পরম রহমত ও করুণার ঝর্ণাধারাই বটে। অবশ্য মাওলানা ইলিয়াস আখতার কান্ধলভী (র.)-এর নির্দেশে হজরত মাওলানা আব্দুল আযীয (র.)-এর মাধ্যমে ১৯৪৪ সালে সর্বপ্রথম বাংলাদেশে তাবলীগ জামাতের মেহনত শুরু হয়। প্রথম ইজতেমা ১৯৪১ সালে দিল্লীর নিযামউদ্দীন মসজিদের ছোট এলাকা মেওয়ার নূহ মাদ্রাসায় আয়োজন করা হয়। এ ইজতেমায় প্রায় ২৫০০০ তাবলীগ দ্বীনদার মুসলমান অংশগ্রহণ করেন। এভাবে অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে মেওয়াতের বিভিন্ন শ্রেণীর কিছু মানুষের কাছে দ্বীনের কথা প্রচারের মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী তাবলীগী জামাতের যাত্রা শুরু হয়। বাংলাদেশে ১৯৪৬ সালে ঢাকার রমনা পার্ক সংলগ্ন কাকরাইল মসজিদে তাবলীগী জামাতের বার্ষিক সম্মেলন বা ইজতেমা প্রথম অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রামে তত্কালীন হাজী ক্যাম্পে ইজতেমা হয়, ১৯৫৮ সালে বর্তমান নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। তখন এটা কেবল ইজতেমা হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু প্রতি বছর ইজতেমার অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা আশাতীতভাবে বাড়তে থাকায় ১৯৬৬ সালে ইজতেমা টঙ্গীর পাগার গ্রামের খোলা মাঠে আয়োজন করা হয়। ঐ বছর স্বাগতিক বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা অংশগ্রহণ করায় ‘বিশ্ব ইজতেমা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তী বছর অর্থাত্ ১৯৬৭ সাল থেকে বর্তমান অবধি (২০১১ সাল থেকে দুই পর্বে) বিশ্ব ইজতেমা টঙ্গীর তুরাগ নদীর উত্তর-পূর্ব তীর সংলগ্ন ডোবা-নালা, উঁচু-নিচু মিলিয়ে রাজউকের হুকুম দখলকৃত ১৬০ একর জায়গার বিশাল খোলা মাঠে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।