মো ইয়ানে নোবেল বক্তৃতা

গল্প বলেই আমি নোবেল পেয়েছি

আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:১১
সুইডিশ অ্যাকাডেমির সম্মানিত সদস্যবৃন্দ, ভদ্র মহিলা ও ভদ্র মহোদয়গণ, আমার মনে হয় এখানে সমাগত সকলেই টেলিভিশন ও ইন্টারনেটের কল্যাণে আমার জন্মশহর গাওমির সঙ্গে অল্প-বিস্তর পরিচিত হতে পেরেছেন। আপনারা হয়তো আমার নব্বই বছর বয়সী পিতাকে দেখে থাকতে পারেন, দেখে থাকতে পারেন আমার ভাই, বোন, স্ত্রী ও কন্যাকে; এমনকি আমার নাতনীকে। কিন্তু যে মানুষটি এই মুহূর্তে আমার মনের সবচেয়ে বেশি জুড়ে আছেন—তিনি আমার মা— যাঁকে আপনারা কখনোই দেখবেন না। অনেকেই আজকের এই পুরস্কারের সম্মানের অংশীদার হবেন, কিন্তু তিনি পারবেন না। আমার মা জন্মেছিলেন ১৯২২ সালে, মারা যান ১৯৯৪ সালে। আমরা তাঁকে গ্রামের পূর্ব দিকে একটা পিচ ফলের বাগানে সমাহিত করেছিলাম। একটি প্রস্তাবিত রেললাইনের জন্য জায়গা করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে গত বছর আমরা বাধ্য হয়েছিলাম তাঁর কবরটি গ্রাম থেকে আরও দূরে সরিয়ে নিতে। আমরা সমাধিস্থল খনন করে দেখলাম, কফিনটি পচে তাঁর দেহ মিশে গেছে চারপাশের সোঁদা মাটির সঙ্গে। সেই মাটির কিছুটা তুলে নিয়ে গেলাম নতুন সমাধিস্থলে। সে সময়ে আমার এ রকম উপলব্ধি হলো, আমার মা পৃথিবীর অংশে পরিণত হয়েছেন। আমি কুিসত-দর্শন ছিলাম। এটা নিয়ে গ্রামের লোকেরা প্রায়ই আমার সামনে হাসাহাসি করত, এমনকি স্কুলের ছেলেরা আমাকে মারত। আমি কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে বাসায় চলে যেতাম। মা আমাকে বলতেন, ‘তুমি কুিসত নও, বাবা। তোমার একটি নাক, দুটি চোখ আছে, আর তোমার হাত-পায়েও কোনো সমস্যা নেই। তুমি কীভাবে কুিসত? যদি তোমার একটি সুন্দর হূদয় থাকে আর সবসময় সঠিক কাজটি করো, যা আজ কুিসত বলে বিবেচিত, তা একদিন সুন্দর হয়ে যাবে।’ পরে যখন আমি শহরে গেলাম, শিক্ষিত লোকেরাও এই নিয়ে বিদ্রূপ করত। কিন্তু যখন আমার মায়ের কথাগুলো মনে পড়ত, আমি বিনম্রচিত্তে ক্ষমা চেয়ে নিতাম। আমার অশিক্ষিত মা শিক্ষিত লোকদের খুব মূল্য দিতেন। আমরা এত গরিব ছিলাম, কখনো কখনো পরের বেলার খাবার কোত্থেকে আসবে, তাও জানতাম না। তার পরও একটি বই বা লেখার সরঞ্জাম কেনার জন্য আমার অনুরোধে তিনি কখনো না বলেননি। যতক্ষণ আমি বইয়ের পাতায় নাক ডুবিয়ে রাখতাম, ততক্ষণ তিনি আমাকে কোনো গৃহস্থালীর কাজ দিতেন না। একবার গ্রামে এক গল্পকথক এলে আমি সবার অলক্ষে তা শুনতে যেতাম। আমার গৃহস্থালীর কাজ ভুলে যাওয়ায় মা আমার ওপর নাখোশ ছিলেন। কিন্তু সেই রাতে যখন তিনি কেরোসিন কূপির ক্ষীণ আলোয় আমাদের জন্য মোটা কাপড় সেলাই করছিলেন, তখন আমি দিনের বেলায় শোনা গল্পের পুনর্কথন না করে পারলাম না। প্রথমে তিনি অসহিষ্ণুতার সঙ্গে শুনছিলেন কারণ তাঁর দৃষ্টিতে পেশাগত গল্পকথকেরা মসৃণ কথার সন্দেহজনক লোক। ভালো কিছু তাঁদের মুখ দিয়ে আসবে না। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি আমার পুনর্কথিত গল্পে আকৃষ্ট হলেন। এর পর গল্প বলার দিনে আমাকে কোনো গৃহস্থালীর কাজ তিনি দিতেন না। গঞ্জে যাওয়া আর গল্প শোনার একটা অকথিত অনুমতি পেয়েছিলাম মায়ের এই দাক্ষিণ্যের বিনিময়ে এবং আমার স্মৃতিশক্তি দেখানোর একটা উপায় হিসেবে তাঁর জন্য গল্পটা পুনর্বার বিস্তারিত বলতাম। শীগগিরই এমন হলো যে অন্য কারও বলা গল্পের পুনর্কথনে আমি আর সন্তুষ্ট হতে পারছিলাম না। তাই আমি আমার গল্প বলা শুরু করলাম। আমি যা জানি, সেটা বললে আমার মা খুশি হতেন। এমনকি একবার একটা গল্পের শেষটা বদলে দেওয়াতে মা আনন্দ পেয়েছিলেন। আমার শ্রোতাদের মধ্যে তিনিই একমাত্র সদস্য ছিলেন না, পরবর্তী সময়ে যুক্ত হয়েছিলেন আমার বড় বোনেরা, খালারা, এমনকি আমার নানি। কখনো কখনো আমার কোনো একটা গল্প শোনার পর মা সযত্ন কণ্ঠে অনেকটা নিজেই নিজেকে বলার মতো করে বলতেন, ‘তুমি বড় হয়ে কেমন হবে, বাবা? তুমি কি জীবিকার জন্য একদিন এ রকম অমায়িক ভঙ্গিতে কথা বলে যাবে?’ আমি জানতাম, কেন তিনি উদ্বিগ্ন হতেন। আমাদের গ্রামে বেশি কথা বলা শিশুদের ভালোভাবে গ্রহণ করা হতো না। কারণ তারা নিজেদের জন্য ও তাদের পরিবারের জন্য বিভিন্ন জটিলতা নিয়ে আসত। সেই বেশি কথা বলা ছেলেটির মধ্যে ছোট্ট আমি ছিলাম, যে ‘ষাড়’ গল্পে গ্রামবাসীদের বোকা বানিয়েছিল। মা স্বভাবতই আমাকে সতর্ক করতেন বেশি কথা না বলার জন্য। চাইতেন, আমি যেন মৌন, সৌম্য আর শান্ত হই। এর বদলে বিপজ্জনক দক্ষতার এক সমাহার হলাম আমি—কথা বলবার আশ্চর্য দক্ষতা আর অদম্য আকাঙ্ক্ষা মিলেমিশে যেত। আমার গল্প বলার দক্ষতা তাঁকে আনন্দ দিত কিন্তু এটি তাঁর মধ্যে এক ধরনের দ্বন্দ্ব তৈরি করত। একটি জনপ্রিয় প্রবাদ আছে, ‘একজন মানুষের প্রকৃতি পরিবর্তন করার চেয়ে একটি নদীর গতিপথ পরিবর্তন করা সহজ।’ বাবা-মায়ের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কথা বলার প্রতি আমার স্বভাবজাত আকাঙ্ক্ষা কখনো যায়নি এবং এখান থেকেই আমার নামটি তৈরি হয়েছে—মো ইয়ান বা ‘কথা বোলো না’—আত্ম-উপহাসের এক বিদ্রূপাত্মক প্রকাশ! প্রাথমিক শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার পর আমি ভারী কাজ করার পক্ষে খুবই ছোট ছিলাম। তাই নদীতীরবর্তী কাছের একটি মাঠের গরু ও ভেড়াপালক হলাম। যখন গবাদি পশুগুলোকে নিয়ে স্কুলের মাঠ পেরোতাম, তখন স্কুলের পুরোনো বন্ধুদের মাঠে খেলার দৃশ্য আমাকে বেদনাতুর করে তুলত। বহুদিন বাদে ঔপন্যাসিক হওয়ার পর সেসব কল্পনার কথা আমার গল্প-উপন্যাসে লিখেছি। আমার ব্যাপক কল্পনাশক্তিকে উদ্দেশ করে মানুষ আমার ওপর প্রায়ই প্রশংসাবাণী বর্ষণ করেছে এবং সাহিত্যপ্রেমীরা আমার সমৃদ্ধ কল্পনাশক্তির রহস্য ফাঁস করার জন্য প্রায়ই প্রশ্ন করেছেন, আমার একমাত্র প্রত্যুত্তর ছিল ম্লান হাসি। আমাদের তাওবাদী গুরু বেশ সুন্দরভাবে বলেছেন, ‘সৌভাগ্য নির্ভর করে দুর্ভাগ্যের ওপর আর দুর্ভাগ্য সৌভাগ্যের ভেতরে লুকানো থাকে।’ আমি শৈশবে স্কুল ত্যাগ করেছি, প্রায়ই ক্ষুধার্ত থাকতাম, ধারাবাহিকভাবে একাকী থাকতাম এবং পড়বার জন্য কোনো বই ছিল না। কিন্তু এই কারণগুলোর জন্যই আমাদের পূর্ব-প্রজন্মের লেখক শেন কংওয়েনের মতো জীবনের সুমহান গ্রন্থের পাঠ আমার বেশ আগেভাগেই শুরু হয়েছিল। গল্পকথকের গল্প শোনার জন্য গঞ্জে যাওয়া সেই গল্পের একটি পাতা মাত্র। আমার সবচেয়ে অসম্ভব স্বপ্নেও ভাবিনি, একদিন এসবই আমার নিজের লেখা ফিকশনের উপকরণ হবে, কেননা আমি ছিলাম—গল্প ভালোবাসে এ রকম একটি বালক মাত্র, যে তার চারপাশের মানুষের বলা গল্পে মোহাবিষ্ট। সেই সময় আমি ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিলাম আর ভাবতাম, সব জীবিত প্রাণীরই আত্মা আছে। আমার জীবনের প্রথম ১৯ বছর আমি গ্রামেই পার করেছি। ট্রেনে করে কিং ডাও যাওয়া ছাড়া কখনোই বাড়ির বাইরে যাইনি। সেখানে আমি করাতকলের কাঠের বিশাল বিশাল গুড়ির অরণ্যে হারিয়ে গিয়েছিলাম। মা যখন জিজ্ঞেস করলেন, কিং ডাওতে আমি কী দেখেছি, আমি বিষণ্ন হয়ে জানালাম শুধু বড় বড় বিশাল কাঠের গুড়ি। কিন্তু কিং ডাও ভ্রমণ আমার মধ্যে গ্রাম ছাড়ার আর পৃথিবী দেখার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষার জন্ম দিয়েছিল। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমি সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে উত্তর-পূর্বের গাওমি ছেড়েছিলাম। এই সময় আমি জীবনের একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি। এ সময় আমার পিঠের ব্যাসে ৪ খণ্ডের চীনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বইটি ছিল, যা আমার মা তাঁর গয়না বেচে কিনে দিয়েছিলেন। এভাবে আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হলো। আমাকে স্বীকার করতেই হবে, গত ৩০ বছরে চীনা সমাজের প্রভূত উন্নয়ন ও অগ্রগতি এবং পরবর্তী জাতীয় পুনর্গঠন এবং বাইরের পৃথিবীর জন্য দুয়ার খোলা না হলে আমি আজকে লেখক হতে পারতাম না। মন স্থবির করে দেওয়া সামরিক জীবনের মধ্যে মতাদর্শগত জাগরণ এবং ১৯৮০-এর সাহিত্য সংবেদের উত্তাপকে আমি স্বাগত জানিয়েছিলাম এবং গল্প শুনে আর সেগুলো মুখের বয়ানে পরিণত করে একটি ছেলে থেকে গল্প লেখার নিরীক্ষা চালাচ্ছে—এ রকম একজন মানুষে বিবর্তিত হয়েছিলাম। প্রথমে এটা একটা পাথুরে রাস্তা মনে হয়েছিল। তখনো আমি আবিষ্কার করতে পারিনি, আমার দুই দশকের গ্রামের জীবন সাহিত্য-উপাদানের এক সমৃদ্ধ আকর। আমি ভাবতাম, সাহিত্য হলো ভালো মানুষের ভালো কাজ নিয়ে লেখা, নায়কোচিত অর্জন আর আদর্শ নাগরিকের গল্প। সুতরাং সে সময় অল্প কিছু লেখা যা ছাপা হয়েছিল, তার সাহিত্যমূল্য সামান্যই। ১৯৮৪ সালে আমাকে পিএলএ আর্ট একাডেমির সাহিত্য বিভাগে গ্রহণ করা হয়। সেখানে শ্রদ্ধেয় অগ্রজ লেখক জু হুয়াইজংয়ের তত্ত্বাবধানে অনেক গল্প ও নভেলার সিরিজ লিখেছিলাম, যার মধ্যে ছিল ‘অটাম ফ্লাডস’, ‘ড্রাই রিভার’, ‘দ্য ট্রানসপারেন্ট ক্যারট’ ও ‘রেড শরগাম’। উত্তর-পূর্বের গাওমির কথা প্রথম, এসেছিল ‘অটাম ফ্লাডস’ নামের লেখায় এবং সেই মুহূর্তে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ানো একজন কৃষকের একখণ্ড জমি খুঁজে পাওয়ার মতো একটি জায়গা খুঁজে পেলাম। আমাকে অবশ্যই বলতে হবে, উত্তর-পূর্বের গাওমি শহরতলীতে আমার সাহিত্যরাজ্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমেরিকান ঔপন্যাসিক উইলিয়াম ফকনার এবং কলাম্বিয়ান ঔপন্যাসিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। তাঁদের কারও লেখাই আমি খুব বেশি পড়িনি, কিন্তু তাঁদের বলিষ্ঠ ও বাধাহীন লেখার মধ্য দিয়ে সাহিত্যের যে নতুন সীমানা সৃষ্টি করেছিলেন, তা থেকে উদ্দীপ্ত হয়েছিলাম। তাঁদের কাছ থেকেই শিখেছিলাম—একজন লেখকের একান্তভাবেই নিজস্ব একটি জগত্ থাকা দরকার। বিনয় আর ছাড় দেওয়া ব্যক্তিগত জীবন কারও আদর্শ হতে পারে কিন্তু সাহিত্য সৃষ্টিতে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস আর নিজস্ব সহজাত প্রবৃত্তিকে অনুসরণ করা জরুরি। তাঁদের প্রভাব থেকে আমাকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে—এটা বোঝার আগে প্রায় দুই বছর আমি তাঁদের অনুসরণ করেছিলাম। একটি নিবন্ধে এই ঘটনাটিকে আমি সংজ্ঞায়িত করেছি এভাবে, ‘তাঁরা একজোড়া জ্বলন্ত উনুনের মতো ছিলেন। আর আমি একখণ্ড বরফ, যদি তাঁদের খুব কাছে যেতাম, আমি বাষ্পের মেঘ হয়ে মিলিয়ে যেতাম। আমার উপলব্ধি হলো, একজন লেখক আরেকজন লেখককে প্রভাবিত করেন তখনই, যখন তাঁদের মধ্যে যোগাযোগ থাকে। বলা যায়—দুটি হূদয় একই ছন্দে স্পন্দিত হয়।’ আমার পথ গল্পের সেই গল্পকথকের পথ, যার সঙ্গে আমার অনেক দিনের পরিচয়—যেভাবে আমার পিতামহ, মাতামহ আর গ্রামের অন্যান্য প্রৌঢ়রা গল্প বলেন। আমি অকপটভাবে বলতে পারি, যখন গল্প বলি, তখন শ্রোতাদের কথা ভাবি না। সম্ভবত তাদের মধ্যে আমার মায়ের মতো শ্রোতাই বেশি এবং সম্ভবত আমিও সেখানে একা থাকি। প্রথম দিককার লেখাগুলো আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বয়ান। উদাহরণস্বরূপ: ‘ড্রাই রিভার’ গল্পে একটি ছেলে যে বেতের বাড়ি খায়, তার গল্প আছে। আর ‘দ্য ট্রানসপারেন্ট ক্যারট’ গল্পে একটি ছেলের গল্প আছে, যে কথা বলতে পারে না। আমি বাবার হাতে বেতের বাড়ি খাওয়ার মতো খারাপ কাজ করেছিলাম এবং ব্রিজের কাছে কামারখানার হাঁপর চালানোর কাজ করতাম। স্বাভাবিকভাবেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা—তা যতই অনন্য হোক না কেন—ঠিক যেভাবে ঘটে, সেভাবে সাহিত্যে আসে না। ফিকশনকে ফিকশনাল হতে হবে। আমার অনেক বন্ধুর কাছেই ‘দ্য ট্রানসপারেন্ট ক্যারট’ আমার সবচেয়ে ভালো গল্প। এ বিষয়ে আমার কোনো মতামত নেই। আমি শুধু বলতে পারি, আমার অন্যসব লেখা থেকে এই গল্পটি অনেক বেশি প্রতীকী ও গভীর। কালো ছেলেটির কষ্ট-সহিষ্ণুতার অতিমানবীয় ক্ষমতা আর সূক্ষ্ম সংবেদনশীলতা আমার তাবত্ সাহিত্যকর্মের আত্মাকে প্রতিনিধিত্ব করে অথবা যদি অন্যভাবে বলি, একজন লেখকের একটি চরিত্র সব সময়ই অন্য চরিত্রগুলোকে অতিক্রম করে যায়। সেই স্বল্পভাষী ছেলেটি এমনই একটি চরিত্র। যদিও সে কিছুই বলে না, কিন্তু সে অন্যদের পথ দেখিয়েছিল। উত্তর-পূর্বের গাওমি শহরের রঙ্গমঞ্চে সে মুক্তভাবে বিভিন্ন কাজ করে যাচ্ছিল। একজন মানুষের সীমিত কিছু অভিজ্ঞতাই থাকতে পারে এবং একবার যখন আপনার নিজের গল্প ফুরিয়ে যাবে, আপনাকে অন্যদের গল্প বলতে হবে। সুতরাং স্মৃতির গভীর থেকে আমার পরিবারের সদস্যদের, গ্রামবাসীদের এবং আমার পূর্ব-পুরুষদের কাছ থেকে শোনা গল্প বাধ্যতামূলকভাবে নিয়োজিত সেনাদের মতো আবির্ভূত হতে থাকে। তারা আশা নিয়ে অপেক্ষা করছিল, যাতে আমি তাদের গল্প বলি। আমার পিতামহ, মাতামহ, বাবা, মা, ভাই, বোন, স্ত্রী, কন্যা—সবাই আমার গল্পে আছে। আমার সাম্প্রতিকতম উপন্যাস ‘ফ্রগস’-এ আমার এক খালা কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে আছেন। আমার নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তির সংবাদে সাংবাদিকেরা ভিড় করেছেন তাঁর সাক্ষাত্কারের জন্য। প্রথমে তিনি ধৈর্যের সঙ্গে ব্যাপারটির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পরে সবার মনোযোগ থেকে দূরে সরার জন্য প্রাদেশিক রাজধানীতে তাঁর ছেলের বাসায় পালালেন। আমি স্বীকার করব ‘ফ্রগস’ লেখার সময় তিনি আমার মডেল ছিলেন। কিন্তু তাঁর এবং গল্পের কাল্পনিক খালার মধ্যে অনেক পার্থক্য বিদ্যমান। গল্পের খালা একরোখা আর আধিপত্যবাদী, দৃশ্যত কঠোর; অথচ সত্যিকারের খালা দয়ালু এবং মার্জিত, যত্নশীল স্ত্রী আর স্নেহপরায়ণ মা। আমার সত্যিকারের খালার সোনালি দিনগুলো ছিল সুখের আর পূর্ণতার। কিন্তু গল্পের কাল্পনিক খালা শেষের দিনগুলোতে ইনসমনিয়ায় ভুগত এবং রাতে একটা কালো লম্বা পোশাক পরে ভূতের মতো ঘুরে বেড়াত। আমার সত্যিকারের খালার কাছে আমি কৃতজ্ঞ যে, তাঁকে গল্পে এভাবে পরিবর্তিত করার জন্য রাগ করেননি। মা মারা যাওয়ার পর মুষড়ে পড়া দুঃখের মধ্যেও আমি তাঁর জন্য একটি গল্প লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। ‘বিগ ব্রেসটস অ্যান্ড ওয়াইড হিপস’ হলো সেই উপন্যাসটি। আমি এমন আবেগে তাড়িত হয়েছিলাম, যে আধা মিলিয়ন শব্দের একটি খসড়া আমি মাত্র ৮৩ দিনে দাঁড় করিয়েছিলাম। এতে আমি মায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত সত্যিকারের অভিজ্ঞতা নির্লজ্জভাবে ব্যবহার করেছি। কিন্তু ফিকশনাল মায়ের আবেগের দিকটি হয় পুরোটাই কাল্পনিক, নয়তো গাওমির অনেক মায়েদের চরিত্রের সমাহারকৃত রূপ। যদিও উত্সর্গপত্রে লিখেছিলাম, ‘আমার মায়ের চৈতন্যকে’। উপন্যাসটি লেখা হয়েছিল সব জায়গার সব মায়ের উদ্দেশে। সৃষ্টির প্রক্রিয়াটি প্রত্যেক লেখকের জন্যই অনন্য। আমার উপন্যাসগুলোর একটি অন্যটি থেকে তাদের প্লট ও প্রেরণায় স্বতন্ত্র। কিছু কিছু লেখা যেমন, ‘দ্য ট্রানসপারেন্ট ক্যারট’ স্বপ্নে জন্ম নিয়েছিল আর অন্যান্য লেখা বাস্তব ঘটনা থেকে উত্সারিত। একটি আখ্যানের উত্স স্বপ্ন বা বাস্তবতা—যা-ই হোক না কেন, যদি তা স্বতন্ত্র অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশে যায়, চরিত্রগুলো যদি জীবন্ত বর্ণনার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়, সমৃদ্ধ আগ্রহোদ্দীপক ভাষার প্রয়োগ থাকে এবং সংঘবদ্ধ কাঠামো থাকে, তাহলে তা শিল্পোত্তীর্ণ হবে। ‘দ্য গার্লিক ব্যালাডস’-এ আমি বাস্তব জীবনের একজন গল্পকথক ও সংগীতশিল্পীকে উপন্যাসের প্রধান চরিত্রগুলোর একটি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম। আমি চরিত্রগুলোর সত্যিকারের নাম দিয়ে শুরু করি, যাতে তাদের সঙ্গে আমার একটা ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় এবং কাজটা শেষ করলে মনে হয়, নামগুলো বদলানোর ক্ষেত্রে অনেক দেরি হয়ে গেছে। নিজেদের নাম আমার বইতে দেখে অনেকে আমার বাবার কাছে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি আমার হয়ে সর্বদাই ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন এবং এগুলোকে এত গুরুত্ব না দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন। আমি আধুনিক সময়ের একজন গল্পকার, যে তার পূর্ববর্তী গল্পগুলোর পশ্চাদপটের আড়লে ছিল। কিন্তু ‘স্যান্ডেলউড ডেথ’ উপন্যাসে আমি ছায়া থেকে লাফ দিয়ে বাইরে পড়েছি। উপন্যাসটি লেখার সময় আমি মনের চোখে দেখতে পাচ্ছিলাম পাবলিক স্কোয়ারে দাঁড়িয়ে শ্রোতাদের সমাবেশে উদ্দীপ্তভাবে আমার গল্প বলছি। ফিকশনের ক্ষেত্রে এই ঐতিহ্য একটি বিশ্বজনীন বিষয়, বিশেষত চীনের ক্ষেত্রে। এক সময় আমি পশ্চিমা আধুনিকতাবাদী ফিকশনের একনিষ্ঠ ছাত্র ছিলাম। সব ধরনের আখ্যান শৈলীর ওপর নিরীক্ষাও চালিয়ে ছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমার ঐতিহ্যের কাছে ফিরে এসেছিলাম। এই প্রত্যাবর্তন কোনো পরিমার্জন ছাড়াই ঘটেছিল, তা নয়। ‘স্যান্ডেলউড ডেথ’ এবং পরবর্তী সময়ের আরও কিছু উপন্যাস চীনা ক্লাসিক্যাল ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার কিন্তু তা পশ্চিমা সাহিত্য-প্রকৌশলে ঋদ্ধ। এ ফিকশনের সঙ্গে স্থানীয় অপেরার সংমিশ্রণ ঘটেছে আবার প্রথম দিককার কিছু কাজে চারুকলা, সংগীত এমনকি, অ্যাক্রোব্যাটিকসের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। আমার নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তির ঘোষণা একটি বিতর্ক বয়ে এনেছে। প্রথমে ভেবেছিলাম, আমি সেই বিতর্কের লক্ষ্য। পরে উপলব্ধি করলাম, এর সত্যিকারের লক্ষ্য এমন একজন মানুষ, যার সঙ্গে আমার কোনো সংশ্রব নেই। মঞ্চনাটক দেখতে যাওয়া একজনের মতো আমি চারপাশের মঞ্চাভিনয় দেখছিলাম। দেখলাম, পুরস্কারজয়ীকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করা হলো। আবার কাদা ছোড়ার দল আক্রমণ করল। আমার ভয় ছিল, সে হয়তো গুটিয়ে যাবে। কিন্তু সে আবির্ভূত হয়েছিল হাসিমুখে। আর শান্তভাবে একপাশে দাঁড়িয়ে সমাবেশকে উদ্দেশ করে বলছিল, ‘একজন লেখকের জন্য কিছু বলার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো তাঁর লেখা। আমার যা বলা প্রয়োজন, তার সবকিছুই আপনারা আমার লেখায় পাবেন। কথারা বাতাসে উড়ে যেতে পারে, লিখিত শব্দ সহজে মুছে ফেলা যায় না। আপনারা আমার বই পড়ার ধৈর্য রাখতে পারলে আমার ভালো লাগবে। আমি আপনাদের তা করতে জোর করতে পারি না এবং আপনারা যদি আমার বই পড়েনও, আমি আশা করি না তা আমার সম্পর্কে আপনাদের ধারণা বদলে দেবে। এমন কোনো লেখক পৃথিবীর কোথাও এখন পর্যন্ত আবির্ভূত হননি, যাঁর লেখা সব পাঠকের ভালো লেগেছে এবং এই কথাটি এই সময়ে এসে বিশেষভাবে সত্য।’ আমি একজন গল্পকথক, সুতরাং আমি কিছু গল্প বলব আপনাদের: ত্রিশ বছরেরও আগে, যখন আমি সেনাবাহিনীতে ছিলাম, তখনকার এক সন্ধ্যায় অফিসে বসে পড়ছিলাম। এমন সময় এক কর্মকর্তা ভেতরে এলেন। তিনি আমার সামনের আসনগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সবাই কোথায় গেছে?’ আমি উচ্চকিত কণ্ঠে বললাম, ‘আপনি কি বলতে চাইছেন যে, আমি কেউ নই?’ প্রৌঢ় মানুষটির কান লজ্জায় লাল হয়ে গেল। তিনি বেরিয়ে গেলেন। এই ঘটনার পর বহুদিন পর্যন্ত এই সাহসী কাজের জন্য আমি গর্ব বোধ করতাম। বহু বছর পর সেই গর্ব পরিণত হয়েছিল বিবেকের তীব্রতর অস্বস্তিতে। এই শেষ গল্পটি শোনার জন্য আপনাদের অনুরোধ করব, যেটি অনেক দিন আগে পিতামহ আমাকে বলেছিলেন। শহরের বাইরে আটজন রাজমিস্ত্রীর একটি দল ঝড়ের মধ্যে একটি জীর্ণ মন্দিরে আশ্রয় নিয়েছিল। বাইরে বজ পাত হচ্ছিল, আর তাদের যাত্রাপথে অগ্নিগোলক ঝরে পড়ছিল। এমনকি তারা ড্রাগনের তীক্ষ্ম ডাকও শুনতে পাচ্ছিল। ভয়ে তাদের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। একজন বলল, ‘আমাদের আটজনের মধ্যে কেউ একজন অবশ্যই আছে, যে ঈশ্বরের অবমাননা করেছে। তার স্বেচ্ছায় বেরিয়ে এসে শাস্তি গ্রহণ করে নির্দোষদের মুক্তি দেওয়া উচিত।’ স্বাভাবিকভাবেই কেউ স্বেচ্ছায় এগিয়ে এল না। একজন প্রস্তাব দিল, ‘যেহেতু কেউ বাইরে যেতে রাজি নয়, সেহেতু চলো, আমরা সবই যার যার খড়ের টুপি দরজার কাছে নিয়ে দোলাই। যার হ্যাটটি মন্দিরের দরজা দিয়ে বাইরে উড়ে যাবে, সে দোষী।’ তখন তারা দরজার কাছে গিয়ে টুপি দোলাতে লাগল। সাতটি টুপি ভেতরের দিকে এসে পড়ল, একটি দরজা দিয়ে বাইরে গিয়ে পড়ল। তারা অষ্টম ব্যক্তিটিকে বাইরে গিয়ে শাস্তি গ্রহণ করার জন্য জোর করতে লাগল। সে বেঁকে বসলে সবাই মিলে তাকে শূন্যে তুলে বাইরে ছুঁড়ে ফেলল। আমি নিশ্চিত, আপনারা সবাই গল্পের শেষটা জানেন—তারা তাকে বাইরে ছুড়ে ফেলতে না ফেলতেই মন্দিরটি তাদের ওপর ভেঙে পড়েছিল। গল্প বলেই আমি নোবেল পেয়েছি। পুরস্কার জয়ের মুহূর্তে অনেক কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা ঘটেছে আমার ক্ষেত্রে। সেগুলো আমার মধ্যে এই প্রত্যয়ের জন্ম দিয়েছে যে, সত্য ও ন্যায়পরায়ণতা এখনো আছে এবং তা মূল্যবান। সুতরাং সামনের দিনগুলোতে আমি আমার গল্প বলা অব্যাহত রাখব। হওয়ার্ড গোল্ডবাটের ইংরেজি অনুবাদ থেকে ভাষান্তরিত ও সংক্ষেপিত।