চিত্রপ্রদর্শনী

বর্ণিল আত্মানুসন্ধান

আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:১৩
দলবদ্ধ প্রদর্শনীর গুরুত্ব দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। এর কারণ, একাধিক শিল্পী এক সাথে কাজ করলে যেমন পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থানকে স্পষ্ট করা যায়, তেমনি কাজ নিয়েও তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিজেদের পারফেকশনের একটা বিন্দুতে এনে স্থির করানো সম্ভব হয়। ‘ইজম’-ভিত্তিক আন্দোলন এবং চারুকলার বাঁকবদলে দলবদ্ধ প্রদর্শনীর গুরুত্ব তাই সম্ভাবনাময়। ‘Junction’ শিরোনামে ঢাকা আর্ট সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয়েছে ছয় তরুণ শিল্পীর প্রদর্শনী, যেখানে তরুণেরা ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যমে তাঁদের নিজস্ব শৈলী উদ্ভাবন ও আঙ্গিকগত দিক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন। সফলতার চূড়ান্ত অবস্থায় হয়তো আমরা তাঁদের এখনও দেখতে না পেলেও সকলের কাজই অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। এবং নান্দনিকতার বিচারে কারও কারও কাজ শিল্পোত্তীর্ণ। গ্রুপের সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ছাত্র। মনোজাগতিক বাস্তবতার সাথে দৃশ্যজগতের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং দমন-অবদমনের বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন আমজাদ আকাশ। শিল্পের রাজনৈতিকতা এবং রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিকতার ভেতর পারস্পরিক ডায়ালগ সৃষ্টিকে কেন্দ্র করে অন্তঃস্থিত অভিব্যক্তির স্ফূরণ ঘটেছে কোথাও। ‘ক্রাইং ফর পলিটিক্স’ পেপারে ড্রাই প্যাস্টেলে আঁকা। নমনীয় এবং ঠিক তার বিপরীত রেখার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই ছবির কেন্দ্রভূমি বা ফোকাল পয়েন্ট ততটা স্পষ্ট নয়। হাত, আঙুল, গ্রন্থ ইত্যাদির সাথে সার্কেল ভেঙে যে শক্তিশালী ফর্ম সৃষ্টি হয়ে ক্যানভাসের বাইরে চলে যাচ্ছে—এসব বিবিধ আকার-আকৃতির সংস্থাপনে নতুন কোনো অর্থ সৃষ্টি করল কি? চিত্রকলা বা দ্বিমাত্রিক সারফেসে ক্যালিগ্রাফির ব্যবহার বোধকরি এখন অনেকটাই ক্লিশে! আকাশের একই মাধ্যমে আঁকা ‘ট্রি প্ল্যানটেশন ইন হেড’ অনেক বেশি অর্থবহ কাজ। কোথাও অ্যাকাডেমি সুলভ রেখার ধরন এলেও সম্পূর্ণটা মিলিয়ে একটা পটুয়া অ্যাটমোসফেয়ার আছে কাজটিতে—উপবেশিত দেহ, বিচ্যুত মাথা; পাশেই তার ভেতর হয়তো আবাদ চলছে বৃক্ষের। অর্থাত্ বুদ্ধি ও প্রয়োগের দ্বিমিক বৈপরিত্যের খেলা। আনিকা মরিয়ম আহমেদের কাজের বিষয় ‘বাক’। মূকদৃশ্যায়নের মাধ্যমে তিনি মনের সকল ভাব ব্যক্ত করছেন। এটা চিত্রভাষার সফলতা নিশ্চয়ই। ‘দেয়ার ইজ সো মাচ টু সে অ্যান্ড সো লিটল টাইম’ ইন্টোরিওর পরিপ্রেক্ষিতের ভেতর ফিগার কম্পোজিশন, ব্যাকগ্রাউন্ডের কালার প্রয়োগ, ফিগার উপস্থাপনের সারল্য ও চোখের অপলক দৃষ্টি বিস্ময় ঢেলে দিচ্ছে যেন। এই বিস্ময় আরাও বেশি ঘনীভূত হয়েছে ‘দে ওন্ট লেট মি টক! (অ্যান্ড সো আই পেন্ট)’ ছবিটিতে। মনোক্রমিক কালার কম্বিনেশন একঘেয়েমি থেকে ছাড়িয়ে এনেছে নেত্রবিস্ময়। অন্তর্মুদ্রাবাদী প্রবণতায় সৃষ্টি হয়েছে ফাতিমা মুন্নির শিল্পকর্ম। অত্যন্ত সাবলীল এবং বস্তুর ওপর মানসিক অভিক্ষেপন বেশ রোমান্টিক। রঙের ব্যবহার থেকে শুরু করে বিন্যাসের কেন্দ্রিকতা ছবির স্ট্রাকচারকে অনেক বেশি মজবুত করেছে। কালার ইম্প্রেশনের সাথে বিষয়বস্তুর অভিব্যক্তি একই ছান্দিকতায় চূড়ান্তরূপ লাভ করেছে। ‘ফিগার’-এ পোর্ট্রেট এবং ‘স্টিল লাইফ’-এর ফুলের রং সকাল বেলার কমনীয় রোদ্দুরের স্মৃতি জাগাবে। ইকবাল বাহার তাঁর ক্যানভাসে বিষয়বস্তুর সংস্থাপনে নিজস্ব কায়দায় অভ্যন্তরীণ কাঠামো নির্মাণ করেছেন। বাহ্যভূমির সাথে যে ডিজাইনের সাদৃশ্য নেই! মনোজাগতিক ভুবন সৃষ্টির এই আখ্যান অত্যন্ত মিস্টিক এবং সাঙ্কেতিক। উড ইনট্যাগলিও মাধ্যমের এই ছবি ‘রিলেশন-১৯’ কিংবা ‘সাইলেন্স’ এগিয়েছে স্ট্রাকচার, ইন্টোরিও এবং অন্তর্কাঠামো—এইভাবে। চোখ, ফিগার, এবং ভূমির ওঠা-নামা ফ্রেমের ভেতর স্থিরতাকে ব্যহত করে না। আর ‘সাইলেন্স’ অনেকটা শান্ত—ব্যক্ত থেকে নৈর্ব্যক্তিক। তপন হালদারের এচিং স্বভাবে রৈখিক। কোথাও টোনাল ভেল্যুজও সৃষ্টি হয়েছে। পৌরাণিক চরিত্রের সাথে ঐতিহ্যগত বিষয়াবলির ক্যারেক্টারিস্টিক বয়ান আছে। এই বয়ান বর্ণনামূলক নয়, সাঙ্কেতিক বা রূপকধর্মী।‘ফেস’ ছাপাই ছবিতে মাস্কের সাথে ঐতিহ্যগত মন্দিরের একাংশ যুক্ত করে সম্পর্কটাকে তিনি আরও বেশি আত্মিক করেছেন। উমা সোহাগের কাজ ফিউশনধর্মী; ত্রিমাত্রিক। সিরামিকের ভেতর ভাস্কর্যসুলভ আবহ সৃষ্টির ফলে দৃষ্টির একঘেয়েমিটা কমেয়েছে। সমুদ্রতলের বিবিধ বস্তুর টেক্সচার এবং আকার-আকৃতির সাথে সাদৃশ্য পাওয়া যাবে ‘আনটাইটেলড’ শিরোনামের কাজগুলোতে। মাধ্যম হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে স্টোনওয়ারের সাথে গ্লেজ। লালের ভেতর সবুজের ব্যবহার মোটাদাগে চমত্কার বিন্যাস। কোথাও কোথাও রং ঝাপসা হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও বিষয়বস্তু থেকে প্লাস্টিক-গুণ বিচ্যুত হয়নি। ৯ জানুয়ারি শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী শেষ হয়েছে ১৪ জানুয়ারি ২০১৩ তারিখে।