নিজাম উদ্দিন একজন সফল দালাল। তার দৃঢ় বিশ্বাস, সেক্রেটারিয়েটে ফাইল ওঠানো-নামানোর কাজে অন্য সব দালালের চেয়ে সে শতগুণ বেশি দক্ষ । অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারির হাতে ক্যাশ গুঁজে দিয়ে ফাইলের পাতায় মনমতো নোট ইনিশিয়েট করানোর পর ধাপে ধাপে নিয়মমাফিক বখরা দিয়ে নোটের গায়ে সব অফিসারের সই বাগিয়ে নিতে অন্য দালালদের মতো দিনের পর দিন তাকে কসরত করতে হয় না। সকালে ফাইল ইনিশিয়েট করিয়ে বিকেলে ‘নিম্ন স্বাক্ষরকারী আদিষ্ট হইয়া জানাইতেছে যে’ চিঠি হাতে সেক্রেটারিয়েট থেকে হাসতে হাসতে বেরিয়ে আসার ক্ষমতা থাকলে সেটা নিজাম উদ্দিনেরই আছে। আইনের মারপ্যাচ কষে নিখুঁত করে নোট লিখে অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারির টেবিলে ফাইল এবং টাকা সে একসাথে পেশ করে। নিজাম উদ্দিন নোট লিখে দিলে অফিসাররা তাতে চোখ বুঁজে সই করতে দ্বিধা করেন না।
অবলীলায় কাজ হাসিল করতে জানে বলে দালালির বাজারে সে এখন কামেল মানুষ। আগে সেক্রেটারিয়েটে কাজ আটকে গেলে লোকে নিজাম উদ্দিনের খোঁজ করত কিন্তু এখন মক্কেল তাকে ডেকে নিয়ে এক হাতে কাজ আরেক হাতে টাকার বান্ডিল অ্যাডভান্স গুঁজে দিতে দ্বিধা করে না। দালালি পেশায় শতভাগ সত্ এবং সফল নিজাম উদ্দিন এক বুক গর্ব নিয়ে এত দিন নিজের কাজে মজে ছিল। কিন্তু গতকালের এক ধাক্কায় তার এত বছরের গর্বের জায়গা আচমকা ধসে গেছে।
গতকাল দিনটা তার জন্য এমন কাল হয়ে দেখা দেবে—সে কথা সে পরশুদিন স্বপ্নেও ভাবেনি। পরশু বিকেলে ইম্পেরিয়াল ফাইনান্সের জটিল ফাইলে সেক্রেটারির সই হয়ে যাওয়ার খবর শুনে গতকাল সকাল সকাল নিজাম উদ্দিন হাসিমুখে সেক্রেটারিয়েটে ঢুকেছিল। ভেবেছিল, দুই ঘণ্টার মধ্যে ইম্পেরিয়াল ফাইন্যান্সের নামে চিঠি ইস্যু করিয়ে কেরানি-পিয়নের বখরা মিটিয়ে হাসিমুখে সে বাইরে বেরিয়ে আসবে।
কপালদোষে কাল তার গুড়ের হাঁড়িতে বালু পড়ে গেল। ফাইলের খোঁজে জয়েন্ট সেক্রেটারির পিএ সাহেবের রুমে ঢুকতে সে লোক যত্ন করে চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বলে, ‘নিজাম ভাই, ব্যাপারটা একটু জটিল হয়ে গেল। জয়েন্ট সেক্রেটারি স্যারের বাবার লিভারে ক্যান্সার। উনি সিঙ্গাপুরে মাউন্ট এলিজাবেথে ভর্তি। অপারেশনের লাইগা টাকা পাঠাইতে হইব।’
চোখে প্রশ্ন নিয়ে নিজাম উদ্দিন পিএ সাহেবের মুখের দিকে চেয়ে থাকে। দেশের মধ্যে কোটি টাকা লেনদেন তার কাছে ছেলেখেলা। কিন্তু বিদেশে টাকা পাঠানোর আও-বাও তার অজানা। পিএ সাহেব আবার কথা বলতে শুরু করলে নিজাম উদ্দিন কিছু না বুঝে কপাল কুঁচকে চোখে প্রশ্ন নিয়ে বসে থাকে।
দালাল নিজামউদ্দিনের সামনে নিজের বড়ত্বের মাপ মেলে ধরার তাগিদে পিএ সাহেবের মুখে গাম্ভীর্যের আলগা মিশেল। পিএ সাহেব ভারিক্কি গলায় নিরাসক্ত ঢংয়ে বলে, ‘ফাইল উপর থেকে সই হয়ে নিচে নামার সময় পার্টির কাছে টাকা চাওয়া সরকারি অফিসের নিয়ম না। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে নিয়ম ভেঙে কিছু কাজ বিশেষ বিবেচনায় করণ লাগে। জয়েন্ট সেক্রেটারি স্যারের বর্তমান অবস্থা আপনাগো বিশেষ বিবেচনার দাবি রাখে। কারণ, এইটা একটা মানবিক বিপর্যয়।’
‘আরে, এটা কী বলেন, ভাইজান! এই ফাইলে স্যারের পাওনা আমি ইমানের সাথে কড়ায়-গণ্ডায় মিটিয়ে দিয়ে আজ চিঠি নিতে এসেছি। সিঙ্গাপুরে টাকা পাঠাতে হলে ফাইল উঠার সময় যে টাকা দিয়েছি, সেখান থেকে থোকা ধরে পাঠিয়ে দেন। ইম্পেরিয়াল ফাইন্যান্স কেমন জাঁদরেল পার্টি, এইটা আপনি খুব ভালো করে জানেন। তারা এক ফাইলের পিছনে দুইবার টাকা ঢালবে—এইটা আপনি আশা করেন? আপনি জানেন, ফাইল উপরে হাঁটার সময় ফাইলের সঙ্গে টাকা হাঁটে। ফাইল নিচে নামার সময় নতুন করে লেনদেন করার কোনো সুযোগ আছে?’
‘সরকারি নিয়ম-কানুন আমি খুব ভালো কইরা জানি। কিন্তু তাতে লাভ কী ভাই? আমার বাপ তো আর মাউন্ট এলিজাবেথ চিনত না, আর তার জন্য আমার টাকা খরচের দরকারও পড়ে নাই। আমার বাপ বেচারা বাড়ির কাছে বিষ্ণুপুরের হরিপদ ডাক্তারের হোমিওপ্যাথির ফোঁটা খাইয়া অনেক আগেই পরপারে পাড়ি জমাইছে। আপনি খাস দিলে বুইঝা দেখেন ভাই, এইটা স্যারের বাপের কেস। এইটা কোটি টাকা দামের মানবিক ব্যাপার। মাউন্ট এলিজাবেথে কোটি টাকা জোগান দেওনের লেইগা স্যারের হাতে জুইতের ফাইল আছে মোটে ছয়খান। তার মধ্যে আপনার ফাইলখানা সব চাইতে দামি। কাজেই আপনে যদি এক কোটিরে ছয় দিয়া ভাগ দিয়া স্যারের বখরা হিসাব করেন, তাইলে হিসাবে একটা বড় ভুল হইয়া যাইব। আমার হিসাবে এক কোটির অর্ধেক মানে পঞ্চাশ লাখ। স্যারের বাপের রুহের উপর আপনারে একলা বখশে দিতে হইব। বিষয়টা আপনার অপছন্দের হইলেও আমার কিছু করণের নাই। আমি হুকুমের চাকর।’
নিজাম উদ্দিনের মাথায় আসমান ভেঙে পড়ে। ইম্পেরিয়াল ফাইন্যান্স জাঁদরেল পার্টি। এই ফাইলের পেছনে তারা পরান খুলে একবার টাকা ঢেলে দিয়েছে। চিঠি হাতে হাতে বুঝে নেবে বলে কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার নিজে প্রেসক্লাবের পাশে গাড়িতে বসা। লেনদেনের গুমোর খোলাশা করতে চায়নি বলে নিজামউদ্দিন তাকে কড়ই গাছের ছায়ায় গাড়িতে বসিয়ে রেখে সেক্রেটারিয়েটে ঢুকেছিল। এখন মনে হচ্ছে, কাজটা মস্ত ভুল হয়ে গেল। চিঠি ছাড়া খালি হাতে সেক্রেটারিয়েট থেকে বের হলে লোকটা তাকে ভুল বুঝবে। বলবে, ‘দালাল বেটা চালাকি করে বাড়তি টাকা খাওয়ার ফিকির করছে।’
নিজাম উদ্দিনের মনের অবস্থা বুঝে পিএ সাহেবের মায়া লাগে। নিজাম উদ্দিন লোক খারাপ না। ঠ্যাকা-বেঠ্যাকা হাত পাতলে লোকটা পকেট ঝেড়ে যা পারে, দিয়ে যায়। নিজাম উদ্দিনকে সান্ত্বনা দেওয়ার তাগিদে পিএ সাহেব বলে, ‘দেখেন ভাই, স্যাররে আমি দোষ দেই না। স্যারের স্কুল মাস্টার বাপ কি জানে না, তার পুত কয় টাকা মায়না পায়? তুই ব্যাটা স্কুল মাস্টার লিভারে ক্যান্সার রোগ নিয়া ঢাকা শহরে একটা মাঝারি দামের ক্যান্সার হাসপাতালে শুইয়া দিন গুনতে থাক। স্কুল মাস্টার ব্যাটা সেই পথে না হাঁইটা আমাগো দেশের পলিটিশিয়ানগো মতো সিঙ্গাপুরে মাউন্ট এলিজাবেথে দামি মরা মরতে গেছে। মানুষের বাঁচার জেল্লা বাড়ার সাথে মরার জেল্লা দেখি হ্যাজাক বাতির মতো জ্বইলা উঠতাছে। আপনাগো জ্বালা আমি বুঝি। অহন আপনারা মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিত্সার বিল গুনতাছেন। দুই-চার দিন পরে আসল খবর শুইনা ইন্নালিল্লা পড়ারও সময় পাইবেন না। উড়াজাহাজে চড়াইয়া মাস্টার ব্যটার লাশ দেশে আননের খরচবাবদ আরও দুই লাখ জোগাড় করার ধান্ধায় কাছা খুইলা দৌড়াইতে হইব।’
২.
কাল সারা রাত জেগে থেকে নিজাম উদ্দিন সব হিসাব শেষ করেছে। এই ফাইলের জন্য যদি তার পঞ্চাশ লাখ টাকা খরচ করতে হয়, তাহলে বাকি জীবন তাকে দিন এনে দিন খেতে হবে। বউয়ের নামে ফিক্সড ডেপোজিট আর নিজের নামে কেনা প্রতিরক্ষা সঞ্চয়পত্র ভাঙালে তার ভবিষ্যত্ বলে আর কিছু থাকবে না। নিজাম উদ্দিনের মনে দুঃখ, তার এত কষ্টে জমানো টাকা-পয়সা একটা বেকুব স্কুল মাস্টারের সাথে গোরে চলে যাবে। জয়েন্ট সেক্রেটারির বাপের মরার খরচের জোগান দিতে গিয়ে ভবিষ্যতে তার নিজের ছেলেমেয়ে দুটোর লেখা-পড়া লটকে যাবে।
ঠান্ডা মাথায় অনেক ভেবে নিজাম উদ্দিন খেলা শেষ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জয়েন্ট সেক্রেটারির বাপের প্রায় মরা রুহের ওপর পঞ্চাশ লাখ টাকা বকশে দেওয়ার আগে সে নিজেই নিজের জান কবচ করে ফেলবে। কারণ, তার সারা জীবনের সঞ্চয় জয়েন্ট সেক্রেটারির বাপের মরণ-বিলাসে ব্যয় করে টাকার শোকে মরে যাওয়া কোনো বুদ্ধিমানের কাজ না। আর, ইম্পেরিয়াল ফাইন্যান্স-এর মালিককে এ দেশের প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে রিকশাওয়ালা পর্যন্ত সবাই চেনে। তার ফাইল পাশ করার জন্য টাকা নিয়ে তাকে এক দিনের বেশি দুদিন ঘুরান্টি খাওয়ানো যায় না। ওদের রোয়াবের সামনে প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রী সব নস্যি। ইম্পেরিয়াল ফাইন্যান্স নিজাম উদ্দিনের মতো দুই পয়সার দালালের লাশ গুম করার ঝক্কিতে যাবে না। ওরা নিজামউদ্দিনের বুকের বাম পাশে ফট্টুশ করে একটা বুলেট ঢুকিয়ে দিয়ে ফুটপাত ধরে নিশ্চিন্তে হেঁটে চলে যাবে।
কাজেই, সর্ব বিবেচনায় নিজাম উদ্দিনের সিদ্ধান্ত একটি—বেঘোরে মারা পড়ার আগে তাকে বুদ্ধিমানের মতো মরতে হবে। মরতেই যখন হবে, টাকার শোকে মরার চেয়ে টাকা না দিয়ে আত্মহত্যা করাই বুদ্ধিমানের কাজ। মরণকালে সে জানবে, টাকাগুলো সে ছেলেমেয়েদের পড়া-লেখার জন্য জমিয়ে রেখে গেছে। সারা দুনিয়ায় মহা মন্দা দেখা দিলে কত বড় বড় মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির মালিক মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে ঠুস করে মরে গেল। কাজেই নিজের টাকা অন্যের হাতে তুলে দিয়ে আপ্পই-তাপ্পই করে তিলে তিলে মরে লাভ কী? তার চেয়ে ঘরের টাকা ঘরে রেখে নিজাম উদ্দিন তার জান কোরবান করে দেবে—এটাই তার মনের জিদ।
মরে যাওয়ার ব্যপারে নিজামউদ্দিনের মনে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে তার মাথা থেকে চিন্তার ঝক্কি শেষ। তার এখন প্রস্তুত হওয়ার পালা। মোবাইল ফোনের সুইচ বন্ধ করে দিয়ে ফোনের কালো স্ক্রিনের দিকে সে অনেকক্ষণ চোখ মেলে চেয়ে বসে থাকে। বন্ধ ফোন ড্রয়ারে রেখে সে বউ স্বপ্নাকে বিষয়টা জানানোর ফিকির আঁটতে বসে। স্বপ্নাকে জানানোর কাজটা বেশ জটিল। ট্রেনের তলে মাথা পেতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্বপ্নাকে বুঝিয়ে বলে পারমিশন পাওয়া সম্ভব না। আবার পরিকল্পিত মৃত্যুর মতো বিশাল বড় একটা বিষয় স্বপ্নাকে আভাস দিয়ে না রাখলে আচানক বিধবা হওয়ার শোকে সে ভেঙে পড়তে পারে। পত্রিকাওয়ালারা লিখে বসতে পারে, দাম্পত্য-কলহের জের ধরে নিজাম উদ্দিন আত্মহত্যা করেছে। পত্রিকার কাটতি বাড়ানোর ধান্দায় তারা পরকীয়া প্রেমের গল্প তৈরি করে বসলেও অবাক হওয়ার কিছু নাই। তেমন একটা নোংরা গল্পের পালে একবার হাওয়া লেগে গেলে তার ছেলেমেয়ে দুটোর জীবন শেষ। সব দিক ভেবেচিন্তে নিজাম উদ্দিন স্বপ্নাকে গল্পের ছলে তার মৃত্যুর আভাস দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। বউকে সরাসরি কিছু না জানিয়ে সে গল্পের ছলে বউকে তার আত্মহত্যার কারণ আগাম জানিয়ে যাবে। আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে বউ গল্পের সারমর্ম নিজের মনে মিলিয়ে নিলে কেউ আর নতুন করে গল্প ফাঁদার সুযোগ পাবে না।
কিন্তু স্বপ্নাকে আস্ত একটা গল্প পুরোপুরি বলার চেয়ে বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধা অনেক সোজা। স্বপ্না গল্পের প্রথম দুই লাইন শুনে পেছনের বারান্দায় যাবে কাপড় শুকাতে দিতে। ফিরে এসে আর দুই লাইন শুনে রান্নাঘরে ঢুকবে ডাল ঘুঁটতে। মরণের আভাসে ঠাসা গল্প বউকে শোনানোর আশায় নিজামউদ্দিন নাস্তার টেবিলে বসে আছে। আত্মহত্যা করার আগে এটা তার অতি জরুরি কাজ।
স্বপ্না ন্যাকড়া হাতে নাস্তার টেবিল মুছতে এলে নিজাম উদ্দিন বউকে নরম সুরে ডেকে বলে, ‘শোনো স্বপ্না, আমার যখন জন্ম হলো তখন আমার আব্বা দাদিজানকে ডাক দিয়ে বললেন, “মা, আমি আমার ছেলের নাম রাখলাম নিজাম উদ্দিন।” দাদিজান বললেন, শোকর আলহামদুলিল্লাহ। আউলিয়া-দরবেশের নামে নাম। নাতিকে ডাকার সাথে সাথে একজন আউলিয়াকে ডাকতে পারলে দমে দমে তেনার দোয়া পাওয়া যাবে।’
‘না, মা। আপনার চিন্তার সাথে আমার চিন্তার একটু বেমিল আছে। বিষয়টা আপনাকে ভেঙে বলি। আউলিয়া নিজামউদ্দিন নয়, হায়দারাবাদের নিজামের নামে আমি আমার ছেলের নাম রাখলাম। আমার মনোবাঞ্ছা, ছেলে হায়দারাবাদের নিজামের মতো ধনী হোক। আপনি দোয়া করেন।’
স্বপ্না টেবিল মোছা ছেড়ে ঘাড় ঘুরিয়ে জানালার দিকে চেয়ে বলে, ‘এহ রে, সাতসকালে কেমন আষাঢ়ে বৃষ্টি। তোমাকে আজিরা বসে থাকতে দেখে ভাবছিলাম একবার বাজারে পাঠাব। আচ্ছা বৃষ্টি থামুক। পরে যেয়ো।’
নিজাম উদ্দিনের ঠোঁটে মারফতি হাসি। সে ভাবে, স্বপ্না গল্পের মোর্তবার ধারে-কাছেও যেতে পারেনি। এটা তো আমার গল্পের শুরু। এই গল্পে মরনের ইঙ্গিত পর্যন্ত যাওয়ার এখনও অনেক দেরি।
নিজাম উদ্দিন মূল গল্পে ফিরে যাওয়ার আশায় খাবার টেবিলে গ্যাঁট হয়ে বসে থাকে। বাইরে বৃষ্টি ধরে এলে স্বপ্না রান্না ঘর থেকে বাজারের ব্যাগ হাতে বেরিয়ে আসে। সেই সাথে সে হড়বড় করে বাজারের ফিরিস্তি দিতে শুরু করে।
নিজাম উদ্দিন ভাবে—সেই তো মরেই যাব। সংসারের শেষ বাজার করে দিয়েই মরি।
দুপুরে খাবার টেবিলে বউয়ের সাথে খেতে বসে নিজাম উদ্দিন তার গল্পের দ্বিতীয় অংশ শুরু করে। লম্বা ভূমিকা করতে গিয়ে ঝামেলায় পড়তে হবে জেনে সে সোজাসুজি তার গল্পের মূল অংশে ঢুকে পড়ে।
‘শোনো স্বপ্না, প্রথমজীবনে হায়দারাবাদের নিজাম খুব গরিব ছিল। তার যখন দিনহীন অবস্থা, তখন একদিন নিজামের মা গোলাঘরে ঢুকে দেখে, মাচাঁর তলে একটা মহিলা জবুথবু বসে আছে। নিজামের মা অবাক চোখে মহিলার দিকে চেয়ে থাকতে গিয়ে দেখে, তার সোনা-রং পা-দুখানায় আলতার পুরু দাগ।’
‘ওহ হো ভালো কথা মনে করছ গো। সানিয়ার বিয়ের মোটে সাত দিন বাকি। বুবু তোমাকে ফোন করেনি? গায়ে হলুদে ওর পা দুইখান ভালো করে রাঙিয়ে দেওয়ার ব্যাপারটা পার্লারকে আগেই বলে দিতে হবে। হলুদের সময় কনের পা আলতারাঙা না হলে হাতের সাথে পা বেমানান দেখায়। দেখি, খেয়ে উঠে ওদেরকে ফোন করি।’
নিজাম উদ্দিন হতাশ বোধ করতে থাকে। তার মনে হয়, অনন্তকাল চেষ্টা করেও সে এই মহিলাকে গল্পের ছলে তার মৃত্যুর ইশারা বোঝাতে পারবে না। এদিকে সময় ঘনিয়ে আসছে। মোবাইল ফোন বন্ধ আছে, তো কী হয়েছে? ইম্পেরিয়াল ফাইন্যান্সের লোক কী বসে থাকবে? তারা বাসার দরজায় এসে বেল টিপবে না?
চিন্তাটা শেষ হওয়ার আগেই দরজায় বেল বেজে ওঠে। স্বপ্না ভাত খাওয়া রেখে গজগজ করতে করতে দরজা খুলতে যায়। নিজাম উদ্দিন মনে ভয়ানক অস্বস্তি নিয়ে দরজার দিকে চেয়ে আছে। দরজা থেকে স্বপ্নার গলা ভেসে আসছে, ‘ডিশের বিল চাইতে আসো লজ্জা করে না? দেখো, জি-সিনেমা চ্যানেলের কী অবস্থা।’
নিজাম উদ্দিন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। কিন্তু এমন বাঁচা বেঁচে তার লাভ কী। বাইরে থেকে মরন ঘনিয়ে আসছে অথচ ঘরের মধ্যে সে তার মরার ব্যাপারটা গুছিয়ে উঠতে পারছে না!
সেদিনের পরে আরও দুদিন কেটে গেল কিন্তু নিজাম উদ্দিন গল্প শেষ করার মওকা পেল না। চতুর্থ দিনে নাস্তার টেবিলে মরিয়া গলায় চোখ গরম করে সে স্বপ্নাকে বলে, ‘এখন হায়দারাবাদের নিজামের গল্পটা তোমাকে বলে শেষ করে আমি বেরিয়ে যাব। চুপচাপ বসে গল্প শোনো। গল্পের মাঝখানে একটা কথাও বলতে পারবে না।’
স্বামীর গলার মরিয়া সুর স্বপ্নার কানে বাজে। সে খ্যাক করে উঠতে গিয়ে নিজেকে সামলে নেয়। ‘গোলাঘরের মাচাঁর নিচে দেবি লক্ষ্মীকে বসে থাকতে দেখে নিজামের মা বলে, “মা লক্ষ্মী, আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত তুমি বসো। আমি ঘাটে যাচ্ছি।”’ এ কথা বলে সে দড়ি-কলসি হাতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। নিজামের মা সেই যে গেল, আর কোনো দিন ফিরল না।
‘দড়ি-কলসি হাতে বেরোনোর কথা শুনেই বুঝেছি, বুড়ি আর আর ফিরবে না। কিন্তু মা লক্ষ্মীকে ঘরে বসিয়ে রেখে বুড়ির পুষ্কুনিতে ডুবে মরার শখ হল কেন?’
‘আরে, ব্যাপারটা বোঝ নাই? নিজামের মা ফিরে না আসা পর্যন্ত মা লক্ষ্মীকে ওখানেই বসে থাকতে হবে। মহিলা অনন্তকাল না ফিরলে মা লক্ষ্মী নিজামের ভিটা থেকে আর সরতে পারবে না। মা লক্ষ্মী ভিটায় বাঁধা পড়ল বলেই তো নিজাম পরদিন থেকে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ!’
‘হুঁহ! হিন্দুদের যা ছোয়াছুঁয়ির বাতিক! মা লক্ষ্মী মুসলমানের মাচাঁর তলে ঢুকতে যাবে নাকি? মুসলমানের মাচাঁর তলে খোয়াজ খিজিরকে ঢুকাতে পারলে সে বরং বসে থাকতে রাজি হতো।’
মরার প্রস্তুতিপর্ব শেষ। জয়েন্ট সেক্রেটারির পঞ্চাশ লাখ টাকা ঘুষ চাওয়ার গল্প স্বপ্না একদিন শুনবে। নিজামের ভিটায় মা লক্ষ্মীর বাঁধা পড়ার গল্পের মোর্তবা সে কেঁদে কেঁদে সবাইকে বলবে। হায়দারাবাদের নিজামের মায়ের মতো নিজের জীবন দিয়ে নিজামউদ্দিন সংসারের সুখ বেঁধে দিয়ে গেছে—এ কথা বিধবা স্বপ্নার মগজে তখন নিশ্চয়ই ঢুকবে।
মৃত্যুর সূচনাপর্ব গোছানোর পরে নিজাম উদ্দিন এবার নিশ্চিন্ত মনে তার মোবাইল ফোন খুলে দেয়। ফোন চালু হতেই সেটি হাতের মধ্যে আচমকা বেজে ওঠে। ফোনের ওপাশে জয়েন্ট সেক্রেটারির পিএ সাহেবের গলায় ফূর্তির স্বর, ‘আরে, আপনে মানুষটা হাওয়া হইয়া গেছেন না কি? ফোন করি, আপনার ফোন বন্ধ। বাদ আসর বেইলি রোডে স্যারের বাসায় আসেন। আজ উনার বাপের কুলখানি। স্যার আপনার কথা বিশেষভাবে কইয়া রাখছেন।’
‘কুলখানি! স্যারের বাপের?’
সফেদ পাঞ্জাবি-পাজামায় সুসজ্জিত নিজামউদ্দিন কুলখানিতে যাওয়ার পথে এক প্যাকেট মিষ্টি আর এক তোড়া ফুল হাতে করে নিয়ে যাওয়ার লোভ খুব কষ্টে সামলে নেয়। আসলে কুলখানির সাথে ফুল-মিষ্টি ঠিক ম্যাচ করে না। বাদ আসর মিলাদ মাহফিলে নিজাম উদ্দিন আসরের আগেই পৌঁছে পিএ সাহেবের গা ঘেঁষে বসে। পিএ সাহেব গলা নামিয়ে বলে, ‘সেদিন আপনে বাইর হইয়া যাওনের আধা ঘণ্টার মধ্যে সিঙ্গাপুর থেইকা স্যারের পিতার মৃত্যু সংবাদ আইল। স্যার আমারে ডাইকা কইল, বাবার অপারেশনের জন্য ফাইলগুলো আটকে রেখেছিলাম। উনিই যখন চলে গেলেন তাহলে আর দুর্নাম কামিয়ে লাভ কী? ফাইলগুলো নিয়ে যান। বিকালের মধ্যে চিঠি ইস্যু করে দিন।’
এ পর্যন্ত শুনে নিজাম উদ্দিন বুকের মধ্যে আটকে রাখা লম্বা দম আরাম করে ছাড়তে শুরু করে। পিএ সাহেব তার নিজের কথার রেশ ধরে বলে, ‘স্যার বললেন, ওদের বলবেন, টাকা-পয়সার প্রয়োজন হলে আমি পরে জানাব।’
বুক থেকে খালাস করা লম্বা দম মাঝপথে আটকে যায়। সে পিএ সাহেবকে আকুল গলায় জিজ্ঞেস করে, ‘স্যারের মা কি জীবিত?’
মিলাদের আওয়াজে পিএ সাহেবের কথা চাপা পড়ে যায়। খবরটা জানতে না পেরে বুকের মধ্যে আটকে পড়া অর্ধেক দম নিয়ে নিজামউদ্দিন হাসফাস করতে থাকে।
