ওয়ান ইলেভেন সংঘটিত করে সেনা সমর্থিত জরুরি অবস্থার সরকারের প্রথম অর্থবছরে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান অনিয়মে জড়িয়ে প্রায় পৌনে দুইশ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতি করেছে। ইতিমধ্যে পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও অনিয়মের সাথে জড়িত ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। বিষয়টি বাংলাদেশের কম্পট্রোলার এন্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) বার্ষিক অডিট রিপোর্টে ধরা পড়েছে। এরপরই তা জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির নজরে আসে।
কমিটির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান দায়ি ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণসহ ফৌজদারি মামলা দায়েরের জন্য দু’মাস সময় দেয়া হয়েছে। সূত্র জানায়, ফখরুদ্দীন-মইনের সরকারের সময় দেশের প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের ধরে নিয়ে মোটা অংকের টাকা আদায় করার বিষয়টি ছিলো সে সরকারের মেয়াদে ওপেন-সিক্রেট। এর বাইরে এমন কোন সেক্টর নেই যেখানে অনিয়মের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নেয়া হয়নি। বড় ধরনের অনিয়মের পাশাপাশি ছোটখাটো অনিয়ম সর্বত্রই হয়েছে।
সংসদ সচিবালয়সূত্র জানায়, ওয়ান ইলেভেনের সরকারের প্রথম অর্থবছরে (২০০৭-২০০৮) মাত্র তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকে ১০টি অনিয়মের ঘটনা ধরা পড়েছে। আর এর মাধ্যমে সরকারের আর্থিক ক্ষতির অংক হচ্ছে ১৬৫ কোটি ১৪ লাখ চার হাজার ৪৬১ টাকা। বাংলাদেশের কম্পট্রোলার এন্ড অডিটর জেনারেলে তাদের যে বার্ষিক অডিট রিপোর্ট দিয়েছে তাতে এসব অনিয়মের কথা বলা হয়েছে। একইসাথে অনিয়মের বিষয়ে রিপোর্টে অডিট আপত্তির উল্লেখ রয়েছে। তাছাড়া অপরাপর রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে যে অনিয়ম হয়নি সে কথা নিশ্চিত করে কেউই বলতে পারছে না। ফলে উল্লেখিত ঘটনা ধরা পড়ার পর অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নেয়া শুরু হয়েছে।
অডিট রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০০৭-২০০৮ অর্থবছরে সোনালী ব্যাংক সাতটি, রূপালী ব্যাংক দু’টি এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক একটি বিষয়ে অনিয়ম করেছে। সোনালী ব্যাংকের ক্ষেত্রে অডিট আপত্তির অনুচ্ছেদ হচ্ছে ১, ৩ থেকে ৬ এবং ৯ ও ১০। রূপালী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট অডিট আপত্তির অনুচ্ছেদ ২৬ ও ২৯ এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট অডিট আপত্তির অনুচ্ছেদ হচ্ছে ৩০।
সূত্র জানায়, ব্যাংক যে প্রচলিত বিধিবিধানের মধ্যদিয়ে পরিচালিত হয় অনিয়ম করার সময় তার কোন তোয়াক্কা করা হয়নি। আর্থিক সুবিধা যারা নিয়েছে তাদের সাথে হাত মিলিয়ে ব্যাংকের লোকজন আইনকে উপেক্ষা করে একের পর এক অনিয়ম করেছে। ব্যাক টু ব্যাক এলসি খোলা এবং রফতানি এলসি’র মেয়াদ উত্তীর্ণের পরও রফতানি বিল ক্রয় ও দায় আদায়ে ব্যাংক কোন ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। অপরদিকে ঋণ খেলাপি হওয়ার পরও ব্যাংক আমদানি এলসি খোলার সুযোগ করে দিয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, ওয়ান ইলেভেনের সরকারের প্রথম অর্থবছরে অভিযুক্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক অনিয়মিতভাবে আমদানি এলসি খোলার বিষয়ে উদার ছিলো। তাছাড়া রফতানি এলসি’র মেয়াদ উত্তীর্ণের পর বিল ক্রয় ও পুনঃ তফসিলীকরণের পরও ব্যাংকগুলো ঋণের দায় আদায় করেনি। একইসাথে ব্যাংকঋণের আসল টাকা সুদবিহীন ব্লক ঋণ হিসাবে স্থানান্তর এবং ব্লক ঋণের টাকা আদায় না করে নিশ্চুপ ছিলো।
অন্যদিকে রফতানির নামে ব্যাক টু ব্যাক এলসি খোলার মাধ্যমে ব্যাংক থেকে টাকা উঠিয়ে অন্যত্র স্থানান্তর করার ঘটনাও ঘটেছে। আর এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নিয়ম থাকার পরও তার প্রধান কার্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদনও নেয়নি। বিদ্যমান ওভার ডিউ দায় এবং বার বার রফতানিতে ব্যর্থ হওয়ার প্রেক্ষিতে ফোর্সড লোন সৃষ্টি হওয়ার পরও অনিয়মিতভাবে বিটিবি ঋণপত্র খোলা হয়।
সূত্র জানায়, মন্দ ও ক্ষতি হিসাবে শ্রেণি বিন্যাসিত হওয়ার পরও ব্যাংক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। উল্টো পার্টির প্রতি আনুকূল্য প্রদর্শন করে। বার বার পুনঃ তফসিলীকরণের মাধ্যমে ঋণের টাকা আদায় না করায় ব্যাংকের অবস্থান রহস্যজনক বলে মনে করা হচ্ছে। বাড়ি নির্মাণ অগ্রিমের পাওনা আদায় না করে ব্যাংক অবসর গ্রহণকারীদের নামে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ দেখিয়েছে। বিনিয়োগ করা অর্থের আয় থেকে বাড়ি নির্মাণ অগ্রিমের পাওনা সমন্বয়কে অডিট রিপোর্টে গুরুতর অনিয়ম হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অডিট আপত্তির প্রেক্ষিতে আপত্তিকৃত অর্থ দায়ি ব্যক্তিদের নিকট থেকে আদায় করার কথা বলা হয়েছে। সংসদীয় কমিটি এসব অনিয়মের সাথে ব্যাংকের যে বা যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে দু’মাসের মধ্যে ফৌজদারি আইনে মামলা দায়েরসহ ব্যাংকিং আইনে ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা বলেছে। সে সাথে ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার জন্য কমিটি সুপারিশ করেছে।
