খনি নিয়ে স্বপ্ন দেখছে আফগানিস্তান

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০১৩, ১৮:৫৭
এটি শুধু ধারণা নয়, মোটামুটি নিশ্চিত যে, আফগানিস্তানে সঞ্চিত তেল, তামা ও লিথিয়ামের পরিমাণ বিশাল, যার মূল্যমান হয়তো ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। এগুলো সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে আফগানরা পরিণত হতে পারে সমৃদ্ধ জাতিতে। সেরকম প্রত্যাশাও করছে তারা। এমন হলে অবশ্য আফগানিস্তানের রক্ত শোষিত মৃত্তিকার দুর্নাম কিছুটা হলেও ঘুচবে। তবে স্বপ্ন পরিণত হতে পারে দুঃস্বপ্নে। সরকারি কর্মকর্তাসহ অনেক বিশেষজ্ঞের অভিমত, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ উত্তোলন ও ব্যবহার নাও ঘটতে পারে। ব্যাপক দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও সংঘর্ষের কারণে এটি থেকে যেতে পারে আশা হিসেবেই। উপরন্তু সার্বিক পরিস্থিতি হয়ে উঠতে পারে আরো জটিল। উল্লিখিত তিনটি কারণেই শান্তিতে নেই হামিদ কারজাই সরকার। সাচ্চা দেশপ্রেমিক হিসেবে নিজেকে প্রমাণের চেষ্টা করলেও প্রেসিডেন্ট কারজাইয়ের বিরুদ্ধে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা পর্যন্ত করা হচ্ছে। ক্ষেপে থাকা লোকজনের হাত থেকে কয়েকবারই তিনি বেঁচে গেছেন সৌভাগ্যবশত। ২০১৪ সালে ন্যাটো বাহিনী সম্পূর্ণরূপে চলে যাওয়ার পর দেশটিতে কী ঘটবে, তা নিয়ে স্থানীয়দের পাশাপাশি বহির্বিশ্বের মানুষ চিন্তিত, বিশেষত যারা আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামান। তাদের ধারণা, তখন গৃহযুদ্ধের প্রধান কারণ হয়ে উঠতে পারে প্রাকৃতিক সম্পদ। এতে আরো চাঙা হয়ে উঠবে আঞ্চলিক ও জাতিগত দ্বন্দ্ব। শক্তিশালী আঞ্চলিক যুদ্ধসম্রাট ও আঞ্চলিক নেতারা এরই মধ্যে খনিজ সম্পদ ইস্যুতে চোখ পাকাতে শুরু করেছে, বসে নেই তালেবানরাও; যেখানেই চলছে উন্নয়ন কার্যক্রম, সেখানেই তারা চালাচ্ছে হামলা। দাবি— ন্যায্য ভাগ তাদের দিতেই হবে, না দিলে বাঁধিয়ে দেবে লংকাকাণ্ড। রাজধানী কাবুলের কয়েকটি খনিতে কাজ চলছে পুরোদমে। অভিযোগ রয়েছে প্রত্যেকটিরই আকর্ষণীয় অংকের ঠিকাদার হচ্ছে হামিদ কারজাইয়ের আত্মীয়-স্বজন। আফগানিস্তানে খনি আইনের বাস্তবায়ন জরুরী। দেরি হওয়ায় কয়েকটি প্রকল্প পড়ে গেছে হুমকির মুখে। আফগান সরকার পশ্চিমাদের বাণিজ্যিক স্বার্থকেই প্রাধান্য দিচ্ছে— এ অভিযোগ অবশ্য গেল গ্রীষ্মে প্রত্যাখ্যান করেছে করেছে তার কেবিনেট। তবে এতে পশ্চিমারা অন্য কিছুর গন্ধ পাচ্ছে। তাদের অভিমত— আসলে তারা তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও চীনের কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চুক্তি করতেই বেশি আগ্রহী,এমনকি দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে হলেও। বামিয়ান প্রদেশে কৃষ্ণ পর্বতের ছায়ায় কালু গ্রামবাসীর ধারণা, ভারত ও কানাডীয় কোম্পানিগুলোর আকরিক লোহা উত্তোলন তাদের জীবনমানকেই পাল্টে দেবে। জীবন নিয়ে সংগ্রামরত এ অঞ্চলের লোকজনের পিছু ছাড়ছে না দারিদ্র্য। এর পেছনে কারণও রয়েছে। উঁচু কালু উপত্যকা বছরে ছয় মাসেরও বেশি সময় ঢাকা থাকে তুষারে। খনন কাজ শুরু হওয়া মাত্রই টমেটো চাষে ইতি টানতে চান ৩০ বছরের কৃষক আব্বাস আলী। যে কোন মূল্যে খনিতে একটা কাজ বাগিয়ে নেবেন বলেই তার ধারণা। অথচ তারা টমেটো চাষ করে আসছিলেন কয়েক প্রজন্ম ধরে। তিনি খোলামেলা ভঙ্গিতেই বললেন, ‘কাঠের ছাদযুক্ত বাড়ি হলেও আমার আর্থিক অবস্থা আসলে খুব ভালো নয়। আমি চাই খনিজ সম্পদের উত্তোলনসহ সব কাজই হোক খুব দ্রুত। এখানে গা ছাড়া ভাব দেখানোর কোন সুযোগ নেই।’ আন্তর্জাতিক সাহায্য গ্রহণের পাশাপাশি স্বনির্ভর হওয়ার চিন্তাটা আফগানদের মাথায় ঢুকেছে বেশ ভালোভাবে। সে জন্যই খনিজ সম্পদবিষয়ক আর্থিক প্রকল্প হাতে নিতে চাইছে সরকার। এ ব্যাপারে খনিজমন্ত্রী ওযাহিদুল্লাহ শাহরানি এক প্রকার মরিয়া। বিশ্বব্যাংকের হিসেব অনুযায়ী, বর্তমানে প্রবৃদ্ধির হার যে পর্যায়ে বয়েছে, তা থেকে ৩-৪ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব ২০০৫ সালের মধ্যে এবং তা শুধু কৃষি ও খনিজ খাত থেকেই। তবে শাহরানি একটা বিষয়ে চিন্তিত, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে যথাযথভাবে প্রকৃত রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারবেন কি-না। না পারলে দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে ব্যাপকভাবে। সে ক্ষেত্রে ভুল চুক্তি হলে বুমেরাং হওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্টই। তিনি মনে করেন, চুক্তিগুলোর ওপর নির্ভর করছে আফগানিস্তানের ভবিষ্যত্। উদ্বেগের আরো কারণ রয়েছে। কিছু কর্মকর্তা একটা বিষয় নিয়ে ভীষণ চিন্তিত। মূল্যবান পাথর, মার্বেল ও ক্রোমাইটের ক্ষুদ্র খনি থেকে সম্পদ চুরি কিংবা পাচার হয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্র এর লাগাম টেনে ধরে রাখতে পারছে না। উল্টো উস্কে দিচ্ছে সহিংসতা। ইউ এস ডিফেন্স ডিপার্টমেন্টের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণ বলছে, ক্রোমাইটকে কেন্দ্র করে একটি অপরাধী চক্র বেশ সক্রিয়। চোরাচালানের মাধ্যমে তারা পাকিস্তানী তালেবান ও হাক্কানি নেটওয়ার্কের জন্য তহবিল গঠন করছে। সীমান্ত প্রদেশ খোস্তের খনি বিষয়ক পরিচালক লাইক মোহাম্মদ জানিয়েছেন, প্রদেশটির অর্ধেক ক্রোমাইট এরই মধ্যে পাচার হয়ে পাকিস্তানে তিনি সরাসরি মন্তব্য করেছেন, ‘ক্রোমাইট উত্তোলনের মাধ্যমে এক আফগানিও (আফগানিস্তানের মুদ্রার নাম) যুক্ত হয়নি আমাদের জাতীয় আয়ে। ‘পেন্টাগনের সিনিয়র কর্মকতারা জানিয়েছেন, তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন আন্তর্জাতিক ক্রোমাইট ক্রেতাদের কাছে এ মূল্যবান সম্পদ বিক্রির, যাতে এটি দেশটির অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে। — আই এইচ টি অনুসরণে