অবশেষে আর্মস্ট্রংয়ের পাপ স্বীকার

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:৩৩
অনুমান মিথ্যে হল না। গত দিন পনেরো ধরে হাওয়ায় যে গুঞ্জন ভাসছিল, তাই সত্যি হল। স্বর্গ থেকে পতনের সত্যতা স্বীকার করে নিলেন কদিন আগে পর্যন্তও কিংবদন্তী বলে বিবেচিত হওয়া ল্যান্স আর্মস্ট্রং। উইনফ্রে অপরাহ্ শোতে সোজাসাপটা প্রশ্নের জবাবে ক্যান্সারজয়ী এই সাইক্লিস্ট স্বীকার করে নিলেন সাতটি ট্যুর ডি ফ্রান্সই জিতেছিলেন তিনি অসততা করে, ক্যারিয়ার জুড়ে ব্যবহার করেছেন ভয়ানক ও নিষিদ্ধ সব ডোপিং প্রক্রিয়া। সেসঙ্গে শোতে বার বার ক্ষমা চাইলেন তার ভক্তদের কাছে, ক্ষমা চাইলেন দফায় দফায় যারা অভিযোগ করে তার কাছ থেকে কটূবাক্য যারা শুনেছেন তাদের কাছে এবং অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বললেন, এখন সবধরনের আইনি সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত তিনি। গতকাল শুক্রবার সকালে ব্রিটেনের ডিসকভারি চ্যানেলে প্রচারিত ‘অপরাহ্ উইনফ্রে শো’তে এসব কথা স্বীকার করে নেন সাতবারের ট্যুর ডি ফ্রান্সজয়ী এই অ্যাথলেট। আজ সকালে প্রচারিত হওয়ার কথা এই অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্ব। একসময় এই আর্মস্ট্রং ছিলেন ক্রীড়া ভক্তদের কাছে এমনকি ক্রীড়াব্যক্তিত্বদের কাছেও এক অনুপ্রেরণা আর উদ্যমের নাম। দুরারোগ্য ক্যান্সার জয় করে এসে সাতটি ট্যুর ডি ফ্রান্স জিতেছিলেন ল্যান্স আর্মস্ট্রং। সেই সময়ই তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা, সতীর্থরা, এমনকি তার ট্রেনিং স্ট্যাফের অনেকেও বার বার অভিযোগ করেছেন, আর্মস্ট্রং পারফরম্যান্স বর্ধক মাদক গ্রহণ করছেন। কিন্তু আর্মস্ট্রং সবসময়ই বলে এসেছেন, তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে ঈর্ষা থেকে এসব অভিযোগ করা হয়। এমনকি এদের অনেকের বিপক্ষে প্রকাশের অযোগ্য গালিগালাজও করেছেন। মামলাও করেছেন অভিযোগকারীদের বিপক্ষে। বার বার মাদক পরীক্ষাতেও ধরা পড়েননি তিনি। অবশেষে গত বছরের শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্র মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এক হাজার পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে জানায়, ‘সর্বকালের সবচেয়ে বড় মাদক জালিয়াতি’ করেছিলেন আর্মস্ট্রং। অবশেষে তার বিরুদ্ধে প্রমাণ হাজির করে তারা। এই প্রমাণের ভিত্তিতে শুরু হওয়া মামলায় আর্মস্ট্রং হাজিরা দেননি, ক্লান্ত বলে নিজেকে দাবি করে। ফলে একতরফা রায়ে তার সব পদক কেড়ে নেয়া হয়। তখনও আর্মস্ট্রং নিজেকে নির্দোষ বলে যাচ্ছিলেন। কিন্তু নতুন বছরের শুরু থেকেই আলোচনায় আসে, আর্মস্ট্রং স্বীকার করবেন তার সব পাপ। আলোচনা শুরু হয় বিখ্যাত টেলিভিশন শো ‘অপরাহ্ উইনফ্রে শো’তে তার অংশগ্রহণ নিয়ে। গত সপ্তাহে তিনি শোতে রেকর্ডিংও করে ফেলেন। অবশেষে গতকাল প্রচারিত অনুষ্ঠানের একেবারে শুরুতেই আর্মস্ট্রং স্বীকার করে নেন সব পাপ। শুরুতে অপরাহ্ ঐতিহ্যগতভাবে একটা ‘ইয়েস-নো’ পর্ব রেখেছিলেন। এখানে ছয়টি প্রশ্নের জবাবে হ্যা অথবা না বলতে হয়। এর প্রতিটি জবাবে আর্মস্ট্রং নিজেকে অপরাধী বলে প্রমাণিত করেছেন। সেসঙ্গে অনুষ্ঠানের সাত মিনিটের মাথায় প্রথম ‘স্যরি’ উচ্চারণ করেন। এরপর অনেকবার বলেছেন—দুঃখিত। যদিও প্রথম পর্বে আর্মস্ট্রংকে খুবই আত্মবিশ্বাসী ও দৃঢ় মনে হয়েছে। এই আত্মবিশ্বাস নিয়েই বর্ণনা করেছেন, ‘সে সময় আমি এটাকেই সঠিক বলে মনে করতাম। তাই যে অভিযোগ করেছে, তাকেই আমি আক্রমণ করেছি। সে সময় আমার মানসিকতা ছিল যে, যেকোনো মূল্যে জিততে হবে।’ আর এই মানসিকতা থেকে যে কাজ করেছেন তাকে এখনও অনেক বড় অন্যায় বলে মনে করছেন না আর্মস্ট্রং। বিস্ময়করভাবে এই কাজের পক্ষে তিনি এখনও যুক্তি দিচ্ছেন। তিনি বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ডোপিং বিরোধী অধিদপ্তরের দাবিমতো এটা মোটেও ইতিহাসের ভয়ঙ্করতম ডোপিংয়ের ঘটনা নয়, ‘আমি তো ডোপিং আবিষ্কার করিনি। আমি ব্যবহার করেছি মাত্র। আর এটা মোটেও ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ উদাহরণ না। পূর্ব জার্মানরা যা করেছিল, সেটা তাহলে কী?’ অবশ্য এরকম দৃঢ়তা তিনি সবক্ষেত্রে দেখাননি। যে বন্ধুপত্নীকে এবং যে ট্রেনারকে অভিযোগ করায় গালিগালাজ করেছিলেন, তাদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু আর্মস্ট্রংয়ের কাছে এরকম অপমানিত হয়েছিলেন যারা, তারা এই ক্ষমায় সন্তুষ্ট হতে পারছেন না। আর্মস্ট্রংয়ের টিম-স্ট্যাফ ইমা ও রলি যিনি অভিযোগ করে মামলার শিকার হয়েছিলেন এবং যাকে কুিসততম গালি দিয়েছিলেন আর্মস্ট্রং; তিনি বলছেন, ‘আমি কোনো প্রতিহিংসা থেকে অভিযোগ করিনি। তারপরও আমাকে যাচ্ছেতাই কথা সহ্য করতে হয়েছে। এর সমাধান কেবল ‘স্যরি’ হতে পারে না।’ আর্মস্ট্রংয়ের সাবেক সতীর্থ ফ্রাঙ্কির স্ত্রী বেস্টি অ্যান্ড্রুও এরকম অভিযোগ করেছিলেন। তখন তিনিও আক্রমণের শিকার হওয়ায় এখন ক্ষমা করতে অস্বীকার করেছেন। প্রায় একই ধরনের কথা বলছেন সবাই। অনেকে আবার আর্মস্ট্রংয়ের এখনও ‘চালাকি করার’ একটা চেষ্টা দেখছেন। অবশ্য সানডে টাইমসের সাংবাদিক ডেভিড ওয়ালশ, যিনি আর্মস্ট্রংয়ের ব্যাপারে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে মামলার শিকার হয়েছিলেন, তিনি সত্য প্রকাশ পাওয়াতেই খুশি। তিনি অবশ্য বলছেন, আরও সত্য আছে আর্মস্ট্রংয়ের কাছে। সাবেক অলিম্পিয়ান, বর্তমান অ্যাথলেটরা অনেকেই হতভম্ব। নোভাক জোকোভিচ যেমন বলছেন, ‘এটা অবিশ্বাস্য। আমি এটুকু বলতে পারি টেনিসে এমন কোনো সমস্যা নেই।’ আর ওয়াডা ও ইউএসএডিএ আর্মস্ট্রংয়ের বিরুদ্ধে অধিকতর তদন্ত করার কথা বলেছে। নিষিদ্ধ সেই ওষুধ ইপিও: ইরিথ্রোপোটিন। এই ড্রাগ রক্ত কণিকার উত্পাদন বাড়িয়ে দেয়। ফলে শরীরের অক্সিজেন সংবহন ক্ষমতা বেড়ে যায় এবং বেড়ে যায় দীর্ঘ সময় ধরে পরিশ্রম করার ক্ষমতা। টেস্টোসটেরোন: পুরুষ হরমোনের উপাদান। শরীরে স্টেরয়েডের মতো কাজ করে। ফলে শরীরে মাংসপেশী বেড়ে যায়। সেই সঙ্গে দেহ অনেক বেশি কঠিন পরিশ্রম করার উপযোগী হয়ে ওঠে। এর ফলে দ্রুত সেরে ওঠে শরীরের ক্ষয় ও ক্লান্তি কমে যায়। কর্টিসোন: মানব শরীরে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া একটি স্টেরয়েডের একেবারেই সমান প্রকৃতির উপাদান। এটি শনাক্ত করা সবচেয়ে কঠিন। অতিরিক্ত কর্টিসোনের একটি ইনজেকশন শরীরের ব্যথা বোধ, ক্লান্তি ও অস্থিসন্ধির ফুলে ওঠা কমিয়ে দেয়। ব্লাড ট্রান্সফিউশন: এখনও পর্যন্ত এই ডোপিং সনাক্ত করার কোনো উপায় নেই। এখানে অ্যাথলেটের নিজের শরীর থেকে রক্ত বের করে বাইরে সংরক্ষণ করা হয়। এই সময়ে গবেষণাগারে নির্দিষ্ট পরিমাণ ওই রক্তে কৃত্রিমভাবে কয়েকগুণ অক্সিজেন বাড়িয়ে দেয়া হয়। ফলে ইপিও-এর চেয়েও দ্রুত এবং কার্যকরভাবে শরীর দীর্ঘ সময় ধরে পরিশ্রম করতে পারে, বেড়ে যায় মাংসপেশীর শক্তি। ডোপিং ইতিহাসের ভয়ঙ্করতম সংযোজন। সেই সব প্রশ্নোত্তর অপরাহ উইনফ্রে: আপনি কী কখনো সাইক্লিং পারফরম্যান্স বাড়ানোর জন্য কোনো নিষিদ্ধ মাদক গ্রহণ করেছেন? ল্যান্স আর্মস্ট্রং: হ্যাঁ অপরাহ উইনফ্রে: এর মধ্যে কি ইপিও ছিল? ল্যান্স আর্মস্ট্রং: হ্যাঁ অপরাহ উইনফ্রে: পারফরম্যান্স বাড়ানোর জন্য কখনো ‘ব্লাড ট্রান্সফিউশন’ করেছেন? ল্যান্স আর্মস্ট্রং: হ্যাঁ অপরাহ উইনফ্রে: কখনো টেস্টোরন, কর্টিসোনের মতো নিষিদ্ধ হরমোন ব্যবহার করেছেন? ল্যান্স আর্মস্ট্রং: হ্যাঁ অপরাহ উইনফ্রে: সাতটি ট্যুর ডি ফ্রান্সের প্রতিটিতেই কী কোনো না কোনো নিষিদ্ধ কাজ করেছেন? ল্যান্স আর্মস্ট্রং: হ্যাঁ অপরাহ উইনফ্রে: কোনো মানুষের পক্ষে নিষিদ্ধ মাদক গ্রহণ না করে কি সাতটি ট্যুর ডি ফ্রান্স জেতা সম্ভব। ল্যান্স আর্মস্ট্রং: না