এসিড সন্ত্রাসের মামলায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হলেও গত ১০ বছরে এসিড সন্ত্রাস মামলার একজন আসামিরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি। তবে মামলার রায়ে ১৩ জন আসামির মৃত্যুদণ্ড দেয়ার আদেশ রয়েছে এবং ১০২ জন আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। এসিড অপরাধ দমন আইন অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে এসিড সন্ত্রাস মামলার বিচারের নিষ্পত্তি হওয়ার কথা থাকলেও গত এক বছরে বিচারাধীন ৪৪টি মামলার একটিরও বিচার নিষ্পত্তি হয়নি।
শারমিন আখতার আঁখিকে গত ১৫ জানুয়ারি এসিড নিক্ষেপকারী দুই আসামি মনির ও মাসুদকে এখনো পুলিশ গ্রেফতার করতে পারেনি। আসামিদের গ্রেফতার বিষয়ে বংশাল থানার ওসি আবুল হাসান বলেন, আসামিদের ধরতে থানা পুলিশের পাশাপাশি ডিবি পুলিশ কাজ করছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী গতকাল শুক্রবার এসিডে ঝলসে যাওয়া আঁখির খোঁজ-খবর নিতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটে যান। এ সময় ডা. দীপু মনি বলেন, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সরকার, জনগণ ও সুশীল সমাজ—বিশেষ করে গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।
এসিড সন্ত্রাসের শিকার ইডেন কলেজের বাংলা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী শারমিন আখতার আঁখি আর আগের চেহারা ফিরে পাবে না বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটের প্রধান সমন্বয়কারী ডা. সামন্ত লাল সেন। তিনি বলেন, এসিডে ঝলসে যাওয়া ক্ষতের পরিমাণ বেশি হওয়ায় মেয়েটি আর আগের চেহারায় ফিরে যেতে পারবেন না। এ ধরনের অবস্থাকে আমরা ‘ডিপ বার্ন’ বলে থাকি। মেয়েটি অবস্থা এখনো আশঙ্কামুক্ত নয়।
এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মনিরা রহমান ইত্তেফাককে বলেন, ১৯৯৯ সাল থেকে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি নারীর ওপর এই সন্ত্রাস হয়েছে। এর মধ্যে শতকরা ৯৯ ভাগ মামলা হচ্ছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এসিড সন্ত্রাসের শিকারে একজন নারীর শরীরে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয় তা জীবনভর তার শরীরে থাকে। অথচ সেই মামলায়ও ভিকটিমকেই প্রমাণ করতে হয়—তিনি এসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, এসব মামলায় তদন্তের দুর্বলতার কারণেই আসামি শাস্তি পায় না। কিংবা অনেক সময় পাবলিক প্রসিকিউটর ঠিকমত তার দায়িত্ব পালন না করায় এসব আসামি ছাড়া পেয়ে যায়। ভিকটিমের দায়িত্ব নয় অপরাধী খুঁজে বের করা। এ বিষয়ে মনিটরিং সেলকে সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা এসিড সন্ত্রাসের মূলে এসিডের সহজলভ্যতাকেই দায়ী করে বলেন, এসিড সহজলভ্যতার জন্য কোন বিক্রেতাকেও শাস্তি পেতে দেখা যায়নি। আইন অনুযায়ী লাইসেন্সের শর্ত পালন না করে কোনো এসিড উত্পাদনকারী, পরিবহনকারী, মজুতকারক, আমদানিকারক, বিক্রেতা এসিড ব্যবহার করলে শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন এলাকায় লাইসেন্স ছাড়াই এসিডের কেনাবেচা চলছে। যার কারণে হরহামেশাই হাতের নাগালে সহজেই এসিড পাওয়া যাচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত ১১ বছরে অর্থাত্ ২০০২ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত এসিড সন্ত্রাসের ঘটনায় সারাদেশে মামলা হয়েছে এক হাজার ৭৭৯টি। এর মধ্যে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি দাবি করে ৬৯৫টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। ৪৮৮টি মামলায় আসামিরা খালাস পেয়েছে। আর সাজা হয়েছে এমন মামলার সংখ্যা মাত্র ১৭০টি। বর্তমানে ১৮টি মামলার তদন্ত চলছে। বাকি ৪০৮টি মামলা স্থগিত আছে। এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ বছরে এসিড সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে দুই হাজার ১৮২ টি। এসব ঘটনার প্রতিটিরই মামলা হয়েছে।
