প্রথমেই আপনার বর্তমান ব্যস্ততা সম্পর্কে একটু শুনতে চাই—
ব্যস্ততা মানে এই যে দুয়েকটা ছবি করছি, এই তো। আরও দুয়েকটা ছবি সাইন করা আছে, জানি না ওরা কবে শুটিং করবে। হয়তো খুব শীঘ্রই করবে। ‘কি প্রেম দেখাইলাম’ ছবিটির কাজ করছি এখন। ‘মাটি’ নামের আরেকটা ছবিরও কাজ করছি। আরও একটি ছবি নিয়ে কথাবার্তা চলছে এখন। তিনটা ছবির শুটিং শেষ হয়ে গেছে। ‘পুত্র আমার পয়সাওয়ালা’ ছবিটি মুক্তির অপেক্ষায় আছে। ‘জান তুমি প্রাণ তুমি’রও শুটিং প্রায় শেষ, ‘সীমারেখা’রও কাজ শেষ প্রায়, একটুখানি হয়তো বাকি আছে। মোস্তাফিজুর রহমান মানিকের ‘এমনওতো প্রেম হয়’ ছবিতেও কাজ করছি। এই তো এ নিয়েই নিজের ব্যস্ততা চলছে।
আপনি তো জাতিসংঘের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে কাজ করছেন, এ প্রসঙ্গে কিছু বলুন।
এটা তো অনেকেই জানে, এটি ইউএসএ বেজড একটি প্রতিষ্ঠান। এটা সারা পৃথিবীর সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য কাজ করছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ। তাদের প্রতিটি সেমিনারে আমি অংশ নিই, তাদের সামনে আমাদের দেশের অবস্থান ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরি। তারপর তারা ওইসব ইস্যুর উপর ভিত্তি করে এ দেশের জন্য অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রদানের উদ্যোগ নেয়। এর সম্পূর্ণ বিস্তারিত এর ওয়েবসাইটে গেলে যে কেউ দেখতে পারবে। আমরা যেটা করে থাকি যেমন, কিছুদিন আগে নারায়ণগঞ্জ গেলাম, যাদের চোখে সমস্যা তাদের সবাইকে বিনামূল্যে চোখের সব ধরনের চিকিত্সার সুযোগ প্রদান করেছি। সামনে আমরা বরিশাল, কুষ্টিয়াসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কাজ করব। এমনকি আমার গ্রামের বাড়িতেও গরিবদের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার প্ল্যানিং করা হয়েছে। বিশেষ করে তাদের চিকিত্সা, তা ছাড়া এমনিতে আমরা যা করেছি তার অধিকাংশই অসহায় বাচ্চাদের জন্য, এতিমদের জন্য। অসহায় মেধাবী শিক্ষার্থীদেরকে আমরা ভালো পড়াশোনার জন্য বিদেশে পাঠানোরও ব্যবস্থা করছি।
কিছু দিন আগে কলকাতা থেকে কয়েকজন অভিনেতা ও প্রযোজক ঢাকায় এসেছিলেন। ঢাকায় কলকাতার ছবি এবং কলকাতায় ঢাকার ছবি চালানোর বিষয়েই মূলত অলোচনা করতে এসেছিলেন। এ বিষয়টি নিয়ে কিছু বলুন।
আমি একটু শুনেছি। ওই কয়েকদিন শুটিংয়ে প্রচুর ব্যস্ত ছিলাম। তাই এগুলোর খোঁজখবর রাখতে পারিনি। এটা অনেক বড় একটা সিদ্ধান্ত, এর পেছনে ভাববার অনেক কিছু আছে। ভেবে-চিন্তে করা উচিত। আমাদের সরকার, প্রযোজক, শিল্পী, পরিবেশক, নির্মাতা তারা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিবে আসলে ছবি অদল-বদল হবে কি না। তারপর যে সিদ্ধান্তই হোক না কেন, তারা কিন্তু শুধু আর্ট ফিল্ম আনবে না, নিয়মিত মুম্বাইয়ের মতো কমার্শিয়াল ফিল্মগুলোই আনবে। যে যাই বলুক না কেন, টালিগঞ্জ নিজেরা কখনও কথা রাখবে না। কলকাতার ছবিগুলো ম্যাক্সিমাম এখন বোম্বে মার্কা হয়ে থাকে। আগের যেই কলকাতার ছবি হতো সেটা হলে আমি বলতাম যে আমার কোনো আপত্তি নেই। এখন যে গানটান দেখি, সংক্ষিপ্ত পোশাকে, কাপড় নেই বললেই চলে। তারা এসবে এখন বলিউডকেও হার মানিয়ে দেয়। যদি উত্তম-সুচিত্রার মতো ছবিগুলো হতো, ভালো গল্পের ছবি হতো তাহলে মেনে নিতাম। এখন কলকাতার ছবি আনা মানে তারা কমার্শিয়াল ছবিগুলোই পাঠাবে এবং আমরাও আনলে তা-ই আনব। সত্যি কথা বলতে আমার কাছে এটা কোনোদিন ভালো লাগেনি। আমার দেশের এতগুলো শিল্পী, কলাকুশলী থাকতে কলকাতার ফিল্ম আনাটা হবে বোকামি এবং আমাদের দেশের শিল্পীদের সঙ্গে প্রতারণা করা। আর এখন যখন আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে ভালো ছবি হওয়া শুরু হয়েছে তখন কেন এই ছবি আনতে হবে? যখন আমরা নিজেরাই এত পরিশ্রমের পর এগিয়ে যাচ্ছি তখন কলকাতার ছবি নিয়ে ভাববার বিষয়টিও আমি বুঝি না।
আমাদের দেশে বিগত বছরগুলোতে সিনেমা হল বন্ধ হয়েও এখনও প্রায় সাড়ে ৪ থেকে ৫ শত হল আছে। অন্যদিকে কলকাতায় আছে মাত্র দেড় থেকে দুইশত সিনেমা হল। সে বিচারে তারাই কি লাভবান হবে না?
তারা কিন্তু অনেক থেকেই চেষ্টা করছে আমাদের চলচ্চিত্র চালানোর। কেননা, তাদের চেয়ে আমাদের ইন্ডাস্ট্রিটা অনেক বড়, বাজারটাও বড়। তারা এটা চেষ্টা করবে স্বাভাবিক। কিন্তু যখন সুযোগ পায়নি তখন কিন্তু নিজেরাই নিজেদের ঠিক করে নিয়েছে। সরকার অনেক সহযোগিতা করেছে। ভিডিও পাইরেসি বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু আমরা এটা করতে পারিনি। সিনেমা হলে না গিয়ে ঘরে বসে দেখার বিষয়টি তাদের ওখানে নেই বললেই চলে, আর এ কারণেই তারা অনেক এগিয়ে গিয়েছে। তাদের হলগুলোর পরিবেশ অনেক অনেক ভালো। আমাদের ঢাকা শহর দিয়ে তো পুরো দেশ বিচার করা যাবে না। ঢাকার কয়েকটা ভালো সিনেমা হল দিয়ে কী আর পুরো দেশ চলে! তারপরও এখন বোধহয় হল সংস্কারের বিষয়টি শুরু হয়েছে। শুনেছি এক-দেড়শত ডিজিটাল অর্থাত্ মাল্টিপ্লেক্স সিনেমা হল নির্মাণ শুরু হয়েছে। তাহলে তো আমরা এগিয়েই যাচ্ছি, এই মুহূর্তে আরেকজনকে ব্যবসার সুযোগ করে দেওয়ার কোনো মানে খুঁজে পাই না।
তাদের দেশের ড্রেসআপ, কস্টিউম, প্রপস এবং কালচার যেই ঘরানার, সেদিক থেকে আমাদের সেন্সর এগুলো গ্রহণযোগ্যতা দেয় না। এই প্রতিযোগিতায় যদি বিচারের মাপ এক না হয় তাহলে তো দর্শকরা এমনিতেই সেই ছবি দেখবে। এর সমাধান কী বলে আপনার মনে হয়?
একটা কথা বলি, তারা কিন্তু বেশি মাত্রায় করে, বললাম না বলিউডও তাদের কাছে ফেল। তাদের ধর্মে বলেন যাই বলেন সবকিছুতেই নাচ গান, মাতলামি, সংক্ষিপ্ত পোশাক এবং এগুলো তাদের সেন্সর অ্যালাউ করে। আমরা কিন্তু অতটা নিচে নামতে পারি না। শুধু মুসলমান দেশ হিসেবেই আমি বলছি না, একজন নাগরিক বলেই বলছি। ঠিক আছে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে কিন্তু এরও তো একটা সীমা আছে। তাদের এমনসব পোশাক দেখি যা বলিউডেও দেখা যায় না। এই জায়গায় দুই মাপকাঠির সেন্সর বোর্ড দিয়ে বিচারে জয়ী হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব না।
দুই দেশের অভিনয়শিল্পী, প্রযোজক-নির্মাতারা যৌথ উদ্যোগে কাজ করার জন্য আলোচনা হয়েছে সম্প্রতি। এ বিষয়টি যদি কার্যকর হয় তাহলে আমাদের ইন্ডাস্ট্রির জন্য কতটুকু লাভ হবে বলে আপনার মনে হয়?
সেটাতো প্রমাণ হিসেবেই রয়েছে। বাংলাদেশের যারা যারা বাইরের ছবিতে কাজ করেছে অভিনয় শৈলী দিয়ে সম্মান ছাড়া দুর্নাম বয়ে আনেনি। সেই কবে আমি কলকাতায় ছবি করেছি, কলকাতায় ছবি করে সারা পৃথিবীর চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে সম্মান পেয়েছি। আমাদের রাজ্জাক ভাই তো একটা বড় জায়গাই দখল করে নিয়েছিলেন। আমি বলব, তার পাশে ওইখানের কোনো জাঁদরেল অভিনেতারা টিকে থাকতে পারেনি। তো অভিনয়ের মান দিয়ে তারা কখনও আমাদের সাথে টিকে থাকতে পারবে না। সেখান থেকে দু’চারটা প্রোডাকশন যৌথ উদ্যোগে হতেই পারে, এতে আবারও প্রমাণিত হবে। আমাদের ছেলেমেয়েরাও তাদের এখানে যাবে তাদের ছেলেমেয়েরা আমাদের এখানে আসবে। দেখুক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে, কারা সফল বেশি। এর উপরে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুক কর্তৃপক্ষ।
অনেকেই হিন্দি ছবি আমাদের দেশে চালানোর অনেক চেষ্টা করছেন। যদি হিন্দি ছবি আমাদের দেশে প্রবেশ করে তাহলে আমাদের ইন্ডাস্ট্রি সেই প্রতিযোগিতায় কি টিকতে পারবে?
কলকাতার ছবি এলে এমনিতেই হিন্দি ছবি ঢুকে যাবে। তখন কেউ ঠেকাতে পারবে না, যতই আইন করুক না কেন। হিন্দি ছবির মার্কেট আফ্রিকাতেও আছে, আফ্রিকানরা হিন্দি বুঝুক আর নাই বুঝুক তারাও হিন্দিতে গান গাইতে পারে। আজকের স্যাটেলাইট যদি বলা হয়, বাসার কাজের লোকরাও হিন্দি ছবি দেখে এবং তারা ভালো হিন্দিও বলতে পারে। হিন্দি ছবি ওইভাবে আনব কেন আমরা। ফেস্টিভ্যালের বিষয় আলাদা। যদি সুপারহিট ছবিগুলো আসে তাহলে আমাদের দর্শকরা দেখবেই। যতই বলুক কমার্শিয়াল ছবি আনা হবে না শুধুই আর্টফিল্ম আনবে। তাহলে আমি বলব তারা জনগণের সঙ্গে ধোঁকাবাজির চেষ্টা করছে। হিন্দি ছবি আমাদের দেশে এলে আমাদের সংস্কৃতির স্বকীয়তা নষ্ট হয়ে যাবে।
এখন তো আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে অনেক ভালো ছবি হচ্ছে। দর্শকরাও হলমুখী হচ্ছে। তারপরও এর সংখ্যা খুবই কম। দেখা যায় বছরে দুয়েকটা ছবি ভালো হচ্ছে। কিন্তু ছবি তো মুক্তি পাচ্ছে অনেকগুলোই। বাকিগুলো গ্রহণযোগ্যতা না পাওয়ার কারণ কী বলে মনে হয় আপনার কাছে?
এমনিতে মাঝখানে আমাদের চলচ্চিত্রের যে অবস্থায় চলে গিয়েছিল তা থেকে যে আমরা ফিরে এসেছি এটাই অনেক বড় কথা। এত জঘন্য একটা জায়গা থেকে ভালো জায়গায় এসে অবস্থান শক্ত করতে একটু সময় তো দিতেই হবে। অনেকেই বলে কেন ভালো হচ্ছে না, কী হচ্ছে না, দু-চারটা ভালো কেন হচ্ছে, বাকিগুলো কেন ভালো হচ্ছে না ইত্যাদি ইত্যাদি। আরে ভাই, যখন ভালো ছবি শুরু হয়েছে তখন নিয়মিতই হবে। আমরা এখন এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের ইন্ডাস্ট্রির ভবিষ্যত্ এখন অনেক উজ্জ্বল। তবে সময় একটু দিতেই হবে।
আরেকটা জিনিস জানতে চাই, গল্প হচ্ছে মুম্বাই বা লন্ডনের প্রেক্ষাপটে, অথচ এই মুম্বাই বা লন্ডনের শুটিংটুকু এফডিসিতেই স্বল্প খরচে সেট বানিয়ে করা হচ্ছে। এই বিষয়টা কী হাস্যকর মনে হয় না আপনার কাছে?
এটা টেকনিক্যাল ব্যাপার, যারা ছবি বানায় পরিচালক-প্রযোজক, তাদের উপর নির্ভর করবে। যদি লন্ডনের আউটডোরের কাজ হয় তাহলে লন্ডনে গিয়েই তাকে করতে হবে বলে আমি মনে করি। আর যদি বাড়ির ভেতরে কাজ হয় তাহলে সে টেকনিক্যালি লন্ডনের মতো বানিয়ে করতেই পারে। পুরো ছবি যে লন্ডনেই করতে হবে এমন কথা নেই। তবে আউটডোরের কাজটা যথাস্থানে গিয়েই করা উচিত বলে আমি মনে করি। আর সেই পরিচালক যদি মুম্বাইয়ের আউটডোরের কাজ অল্প কিছু পয়সা বাঁচানোর জন্য এফডিসিতে সেট বানিয়ে শুট করে তাহলে সে এর উত্তর রিলিজের সময়ই পেয়ে যাবে। এখনকার দর্শকরা অনেক স্মার্ট। আমি জানি না কে এরকম ছবি বানাচ্ছে। আমি আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে বলছি যে সুন্দর করে বানালে তার ফলও সুন্দর হয়। পরিশ্রমের মূল্য সব সময়ই আছে। দর্শকদের সঙ্গে প্রতারণা করে কখনও ভালো ফলাফল পাওয়া যায় না।
