মু খো মু খি
এ দেশের প্রখ্যাত গীতিকার-সুরকার হাসান মতিউর রহমান। দেশের শীর্ষস্থানীয় একাধিক শিল্পীর কণ্ঠে তার অসংখ্য গান পেয়েছে শ্রোতাপ্রিয়তা। চেনাসুর নামের একটি অডিও প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী। পাশাপাশি অডিও প্রযোজকদের একমাত্র সংগঠন এমআইবি’র সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সমসাময়িক গান ও সংগীত শিল্পের বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলেছেন বিনোদন প্রতিদিন-এর সাথে। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন সরলা সৈয়দ
কেমন আছেন?
যেভাবে কোনোমতে বেঁচে থাকা যায়, তেমনটাই আছি।
গানের মানুষদের ভেতরে এই হতাশাটা আর কতদিন থাকবে?
যতদিন আমরা একতাবদ্ধ না হবো, ততদিন। কারণ আমাদের এখনকার গানের চর্চার তো কোনো মা-বাপ নেই। কেউই কাউকে মানছেন না। কারও ভেতরে সহনশীলতা তৈরি হচ্ছে না।
কিন্তু এই অবক্ষয়ের কারণটা কী?
দেখুন আগে অডিও ক্যাসেট ছিল। যা নকল করতে হলেও অনেক দামী মেশিন কিনতে হতো। সেটা নষ্ট হলে মেরামতেরও তেমন একটা সুযোগ ছিল না। কিন্তু এই সিডি প্রযুক্তি আসাতে সবাই অতি সহজে তা নকল করার সুযোগ পাচ্ছে।
কিন্তু প্রযুক্তিকে দোষ দেওয়া তো আরও বোকামি। এটা তো সারাবিশ্বেই চলছে। বিশ্বের কোথাও তো এতটা অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে না...
কারণ সেই সব জায়গায় সবাই তো নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলে। প্রযুক্তির সাথে তারা নিজেদের বদলাতে পেরেছে।
সেটা তো তাহলে আপনাদের ব্যর্থতা যে, আপনারা প্রযুক্তির সাথে সাথে আধুনিক হতে পারেননি। কোনো অডিও কোম্পানির প্রফেশনাল ওয়েবসাইট নেই। তেমন কারোরই আলাদা কনটেন্ট প্রভাইড এজেন্সি নেই। ফলে শিল্পীরা দেখছেন এখন একজন প্রকাশকের কয়েক কপি সিডি কিছু দোকানে পৌঁছানো ছাড়া কোনো কাজ নেই...
এটা আপনি অনেকটা ঠিকই বলেছেন। আমরা সময়ের সাথে আধুনিক হতে পারিনি। কিন্তু প্রকাশকদের বাঁচানোর জন্য শিল্পীদেরও তো সাথে থাকতে হবে। বিচ্ছিন্ন হয়ে কী লাভ হয়েছে বলুন? কার লাভ হয়েছে? আলাদা হয়ে মোবাইল কোম্পানির সাথে চুক্তি গড়ে কেউ কী তাদের টাকা ওঠাতে পেরেছে? আর যারা মোবাইল কোম্পানিতে গান দিচ্ছে, তারা তো নিজেদের খরচে মিউজিকটা তৈরি করে দিচ্ছে। আমার কথা হচ্ছে র্িশল্পীরা কেন নিজের টাকা খরচ করে গান করতে যাবে।
কিন্তু গত ৫ বছরে একটি অডিও কোম্পানি কি কোনো অ্যালবাম সেই অর্থে টাকা দিয়ে কিনেছেন। দুয়েকজনের অ্যালবাম কিনলেও নামমাত্র মূল্যে কিনে পরে রয়্যালিটির আশ্বাস দিয়েছেন, পরে সেই রয়্যালিটিও পায়নি শিল্পীরা। এই অবস্থায় প্রকাশকদের কে বিশ্বাস করবে?
তবু বিশ্বাসযোগ্যতা আনতে হবে, দু’ পক্ষের ভুল শুধরে একসাথে কাজ করতে হবে। প্রকাশকদের বিশ্বাস করছেন না শিল্পীরা কিন্তু মোবাইল কোম্পানি যে তাদের এতভাবে ঠকাচ্ছে তা নিয়ে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছে না। এটা কি ঠিক হচ্ছে। কয়েকটা বিলবোর্ডে নিজেদের ছবি ঝুলিয়েই তাদের খুশি রাখছেন। এটা হলে তো হবে না। যেমন ধরুন, কেউ একজন গান ডাউনলোড করলে, তা কিন্তু শুধু একমাস না। কয়েকমাস ধরে তার মোবাইলে ওয়েলকাম টিউন করে রেখে দেয়। কিন্তু প্রতি মাসেই সমান হারে টাকা কেটে রাখে। অথচ গানের মালিক সে অডিও কোম্পানি বা শিল্পী যেই হোক না কেন, সে পান প্রথম ডাউনলোডের পয়সাটুকুই। এ নিয়ে একজন শিল্পীও কি মোবাইল কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে? আপনি বলতে পারবেন না। অর্থাত্ একটা গান থেকে ৫০০ টাকা আয় হলে শিল্পী পাচ্ছেন ৫০ টাকা। অথচ শিল্পীর পাওয়া উচিত ৫৫০ টাকা।
কিন্তু এত ঠকার পরও তো কোনো শিল্পী আপনাদের অর্থাত্ প্রকাশকদের বিশ্বাস করতে চাইছেন না। এমআইবি আর শিল্পীদের সংগঠন এলসিএস-এর এই দ্বন্দ্বের অবসান কবে হবে ?
এটা তো গুটি কয়েকজনের জন্য হচ্ছে না। আলাউদ্দিন আলী ও এন্ড্রু কিশোর তাদের দুজনকে কোনোভাবেই বোঝানো তো দূর, আমাদের সাথে বসতেও চাইছেন না তারা। অথচ দেখুন, তাদের এই একগুঁয়েমিতে তারা কয়েকজন লাভবান হয়তো হচ্ছেন, কিন্তু আগামী প্রজন্ম তো অন্ধকারে। তাদের নিজেদের দেওয়ার তো কিছু নেই। কিন্তু নতুন প্রজন্মের জন্য কিছু করার একটা সুযোগ থাকত। তারা নতুন একজন শিল্পীর জন্যও করছেন না, সমসাময়িক শিল্পীর জন্যও কিছু করছেন না।
কিন্তু নতুন শিল্পীরাই বা এভাবে আর কতদিন লেজার ভিশন বা জি সিরিজে টাকা দিয়ে অ্যালবাম তৈরি করবে? প্রকাশকরা তো নতুনদের জন্যও কিছু করছেন না। সব তো শিল্পীদেরই করতে হচ্ছে...
এটার পরিবর্তন হবে। মোট কথা একটা সমন্বয় দরকার। এবং তা অবশ্যই একজন প্রডিউসারকে বাঁচিয়ে রেখে। একজন সৃজনশীল মানুষ কেন টাকা খরচ করে গান তৈরি করবে! যার যা দায়িত্ব, তার সেটিই পালন করা উচিত। নইলে, বিশৃঙ্খলা হবেই।
তাহলে আপনি বলতে চাইছেন শিল্পী আর প্রকাশকের সমন্বয় ছাড়া কারও উন্নতিই সম্ভব না। এবারে আপনার ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কথা বলুন। নতুন কি গান করেছেন?
বেশ ক’জন নবাগত শিল্পীর গান করছি। যেমন শাহনাজ বাবুল নামে একজনের অ্যালবাম করছি। এ ছাড়া মমতাজের জন্য ১২টি নতুন গান বেঁধেছি। সর্বশেষ রাজীবের গাওয়া ‘কি ক্ষতি করলা আমার’ গানটি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
আচ্ছা একটা কথা বলুন, এত চ্যানেল, মিউজিক ভিডিওর পরও কেন গান হিট হচ্ছে না?
কীভাবে হবে বলুন! আগে কালচার কী ছিল—পাড়ায়, মহল্লায়, সিডি দোকানে বড় বড় স্পিকারে গান বাজত। এখন সবাই গান শুনছে মোবাইলে কানে কানে। ফলে এখন গান কানে কানে হিট হচ্ছে, জনে জনে পৌঁছাচ্ছে না।
আপনার লোকো সুরে সেরা কয়েকটি গানের কথা বলুন।
এটা তো বলা মুশকিল। কোনটা রেখে কোনটা বলি। প্রথমে বলতে হয় ‘যদি রাত পোহালে শোনা যেত বঙ্গবন্ধু মরে নাই’ মলয় কুমার গেয়েছিলেন গানটি, রুনা লায়লার গাওয়া ‘রাঙামাটি পাহাড়ে’, দিলরুবা খানের গাওয়া ‘দেখা আরিচা ঘাটে’, ‘আমার লাইন হয়ে যায় আঁকাবাঁকা’ বিখ্যাত এই গানটি গেয়েছিলেন আশরাফ উদাস আর মমতাজের গাওয়া অসংখ্য গান হিট হয়েছে। আরেকটার কথা বলি ‘এবার না আসিলে বাড়িতে, আগুন লাগাইয়া দিমু আমার শাড়িতে’ গানটি সুপার ডুপার হিট গান।
