ব্যান্ডবাদ্যি

নেমেসিস পুরাণ

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০১৩, ১৮:৫১
এ দেশের ব্যান্ডের গানের কোলাহলে জোরালো এক কণ্ঠস্বরের নাম নেমেসিস। নিজেদের অস্তিত্বের সবটুকু দিয়ে গাইতে পারেন বলেই তারা হয়েছেন শ্রোতাপ্রিয়। এই ব্যান্ডের পথচলার গল্প নিয়ে লিখেছেন মুহম্মদ কবীর ‘নেমেসিস, আমাদের নাম নেমেসিস...’ শুনে অদূরে দাঁড়িয়ে নিয়তি মুচকি হেসেছিলেন। মঞ্চে উঠার আগে দলের নাম জানতে চাওয়া হয়েছিল। কোনো কিছু না ভেবেই তারা দলের নাম বলেছিলেন নেমেসিস। তখন কেউ বুঝতেই পারেননি, নিয়তি তাদের কোথায় নিয়ে যাবে... বোঝেননি, গানের শখ ধীরে ধীরে তাদের অস্তিত্বের নেশা হয়ে দাঁড়াবে আর ব্যান্ড দল নেমেসিস পরিচয়ে পাড়ি দিতে হবে এতটা পথ। এখান থেকেই শুরু হয়েছিল ব্যান্ড নেমেসিসের মিথ। এটা সেই ১৯৯৯ সালের কথা। তখন সাউথ ব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ছাত্র ছিলেন জোহাদ, রাতুল ও মাহের খান। গান ভালোবাসতেন তারা। পড়াশোনার ফাঁকে সময় সুযোগ মিললে ডুবে যেতেন গিটার আর গানে। এই গানের সাধনায় মাহের ছিলেন এগিয়ে। কারণ, তার একটি ব্যান্ড দল ছিল, তিনি ছিলেন এর ফাউন্ডার মেম্বার। বিভিন্ন স্টেজ শোতে পারফর্ম করে বেড়াতেন তিনি। এই দলে একসময় যোগ দিলেন জোহাদ ও রাতুল। ব্যান্ডটির এই শুরুর লগ্নে আরও ছিলেন ইয়ামার ও নন্দিত। কিন্তু মাঝপথে পড়াশোনার জন্য হঠাত্ করে বিদেশে চলে যান তারা। দল থেকে চলে গেলেও দেশে এলে শোতে অংশগ্রহণ করতেন ইয়ামার। অন্যদিকে একই স্কুলের জুনিয়র ছাত্র ছিলেন ডিও ও ওমায়ের। তারাও বেশ ভালো বন্ধু এবং গানের মানুষ। ইয়ামার চলে যাওয়ার পর তারা দু’জন ব্যান্ডে জায়গা করে নেন। এবার পুরোপুরি প্রস্তুত হয় নেমেসিস ব্যান্ডদল। ব্যান্ডের এই নামটি সেই আকস্মিক ঘটনার মুখে প্রথম উচ্চারিত হয়েছিল দলের এক সময়ের কি-বোর্ডিস্ট ফারিয়ার কণ্ঠে। এরপর এই নাম নিয়ে দলটি ছুটে বেড়িয়েছে বিভিন্ন কনসার্টে। অস্তিত্বের রক্তে মাংসে যাদের গানের নেশা তারা নিজেদের ব্যতিক্রম অবস্থান তৈরি করবেন এটাই স্বাভাবিক। নেমেসিসের বেলাতেও তাই হয়েছে। শ্রোতাদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। সেই সাহসেই তারা প্রথম অ্যালবামটি প্রকাশ করেন ২০০৫ সালে। যার শিরোনাম ‘অন্বেষণ’। এই অ্যালবামে প্রকৃত অর্থে গানের জগতে নেমেসিস নিজেদের অস্তিত্বের অন্বেষণই করেছে। খুঁজতে চেয়েছে নিজেদের নিয়তিকে। এ প্রসঙ্গে মাহের খান বলেন, ‘প্রথমে এক ধরনের পরীক্ষামূলক অ্যালবাম তৈরি করেছিলাম। ভয়েস ও সাউন্ডে সামান্য সমস্যা ছিল। অর্থহীনের সুমন ভাইয়ের সহযোগিতায় তার বাসায় গিয়ে গান রেকর্ড করতে হয়েছে। এজন্য তার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।’ নিজেদের সৃষ্টির প্রতি এমনই অকপট নেমেসিস। আর এই বৈশিষ্ট্যই তাদের গানে মিশেছে। তাই প্রথম অ্যালবাম দিয়েই শ্রোতাদের মনে স্থান করে নেয় নেমেসিস। অ্যালবামটির ‘বিবর্ণস্রষ্টা’ ও ‘অবচেতন’ গান দুটি শ্রোতাপ্রিয়তা পায়। এ ছাড়াও কিছু মিক্সড অ্যালবামে প্রকাশিত গানেও নেমেসিস সাফল্য পেয়েছে। এগুলো হলো—‘দিন বদল’ অ্যালবামের ‘দুঃস্বপ্ন’, ‘আন্ডারগ্রাউন্ড ২’-এর ‘জয়ের ধ্বনি’ এবং ‘রঙ’-এর ‘মৃত্যুছায়া’। গানগুলো লাইভ কনসার্টেও তুমুল সাড়া জাগিয়েছে। তবে দ্বিতীয় অ্যালবামটি প্রকাশ করতে নেমেসিস সময় নিয়েছে দীর্ঘ পাঁচ বছর। এ পুরোটা সময় তারা সচেষ্ট ছিলেন শ্রোতাদের হাতে নতুন কিছু তুলে দিতে। সমস্ত প্রস্তুতি শেষে ২০১১ সালে নেমেসিস প্রকাশ করে তার দ্বিতীয় অ্যালবাম। নাম ‘তৃতীয় যাত্রা’। এ নিয়ে জোহাদের ভাষ্য, ‘আমরা অনেক সময় ধরে, অনেক চিন্তাভাবনা করে এ অ্যালবামের গানগুলো টিউন করেছিলাম। চাইছিলাম শ্রোতাদের ভিন্নস্বাদ দিতে।’ নেমেসিসের এত পরিশ্রমের এই অ্যালবামও সাফল্য পায়। এর ‘কবে বীর’ গানটির মিউজিক ভিডিও ইউটিউবে প্রকাশ হলে তুমুল সাড়া মেলে। বাংলা ব্যান্ডের শ্রোতাদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়। তবে নিয়তি তাদের পিছু ছাড়েনি। ব্যান্ডের লাইনআপে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন হয়েছে সময়ের সাথে সাথে। ২০১২ সালে মাহের ও ওমায়ের ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে ব্যান্ড থেকে দূরে সরে যান। তাই বলে নেমেসিস থেমে থাকেনি। নতুন লাইনআপ নিয়েই এগিয়ে চলেছে তারা। নতুন পথচলায় গিটার হাতে তাদের সাথে যোগ দেন জেহিন ও জেরিফ। এখনও গুলশান-১ এর বেঞ্চ ইনকিউরিশন ক্যাফেতে সপ্তাহে দু’দিন সবাই একসঙ্গে প্র্যাকটিস করেন। বিভিন্ন কনসার্টে এখনও বাতাসে সুর তোলেন তারা। আশা করছেন ২০১৪ নাগাদ শ্রোতাদের হাতে তুলে দিতে পারবেন নতুন অ্যালবাম। তারাও বাংলা ব্যান্ডের গানে নতুন ইশারা দেবেন এই আশা আমাদের। কারণ নেমেসিস মানে নিয়তি। ব্যান্ডের লাইনআপ জোহাদ (ভোকাল ও গিটার) ডিও (ড্রামস) রাতুল (বেজ গিটার) জেহিন ও জেরিফ (গিটার)।