মাঘের শীতে বাঘ কাঁপে—আমাদের দেশের এক প্রাচীন প্রবচন। অমন যে দুর্ধর্ষ প্রাণী বাঘ, তারও নিস্তার নেই এই ঋতুর হিমশীতল আলিঙ্গন থেকে, এ অবশ্যই এক নিদারুণ বাস্তবতা। শীতঋতু বাঙালির হাড় অবধি কাঁপিয়ে দেয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কতই বা নিচে নামে তাপমাত্রা! ছয় কি পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামলেই আমাদের মরণদশা প্রায়। বাঙালি চিরকালই আরামপ্রিয় জাতি। গ্রীষ্ম ও বর্ষার সঙ্গেই তার সহজ সখ্য। শীতকে সে দেখে জবুথবু হয়ে থাকার বার্তা হিসেবে। পৃথিবীর অনেক দেশেই শীত অর্থ তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রি এবং তার নিচে ক্রমাগত নেমে বরফ হয়ে থাকার মতো এক ঋতু। আমাদের কাছের দেশ চীনে তাপমাত্রা নেমে যায় মাইনাস নয়-দশ সেলসিয়াসে, সেই ঠান্ডার কথা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। মেরু অঞ্চল বা এন্টার্কটিকার কথা না হয় না-ই বললাম। যা হোক, আমরা অবশ্যই ভাগ্যবান, কারণ শীত ঋতু অনেকটাই ভদ্র চেহারায় আসে আমাদের দেশে, এবং আমরা প্রায় উপভোগই করি শীতের আলিঙ্গন।
শীতের কুয়াশা সবকিছু ঢেকে রাখার পক্ষপাতী, অথবা বলা যায় আমাদের দৃষ্টির আড়ালে সবকিছু রাখতে চায় সে, কিন্তু আমরা তো চিরকালই দেখে আসছি আমাদের মুক্ত প্রকৃতির নৈসর্গিক শোভা। এবং কুয়াশাও দীর্ঘসময় থাকে না। সহসাই আমাদের চোখের সম্মুখ থেকে পর্দা সরে যায়। আমরা দেখতে পাই, রৌদ্রধোয়া ভূ-প্রকৃতি। এবং এই ভূ-প্রকৃতি সারা বছরই স্বচ্ছ ও স্পষ্টতর ব্যাঞ্জনায় ধরা দেয় আমাদের চোখে। আমাদের মুগ্ধতা, জীবনধারণ, আশা-আকাঙ্ক্ষা, হাসি-কান্নার আলেখ্য এই মাটিকে ঘিরে, সেখানে শীত এক বিশেষ ব্যাঞ্জনা। বাংলাদেশের কবিতায় শীতঋতু আসে যেন কিশোরীর শরীর হয়ে। কবিরা তাকে উষ্ণতার পরশ দিতে যত্নবান হন, কবিতাকে পুষ্টি জোগাতে থাকেন পরম্পরায়, এবং আমরা দেখি যে এই ভূ-খণ্ডের লালিত্য ও মাধুর্য পেয়ে সে দারুণ যুবতী হয়ে ওঠে, তাকে আমরা আলিঙ্গনে বাঁধতে অধীর হই। অন্যান্য ঋতুর কবিতার চেয়ে শীতের কবিতা অনেকটাই আলাদা হয়ে প্রতিভাত হয় আমাদের কাছে। বসন্ত বা বর্ষার কবিতা যেমন উচ্ছ্বাসমুখর, শীতের কবিতা তেমন নয়। একেবারেই আলাদা ধরনের চিত্রকল্প, একবারেই ভিন্নবোধ সহজেই পাওয়া যায় এই ঋতুর কবিতায়।
শীতের কবিতায় মৃদু উচ্চারিত শব্দগুলোও ঠিকই কাজ করে কনকনে ঠান্ডা হাওয়ার মতো। যেন তা পৌঁছে যায় চামড়া থেকে একেবারে হাড় পর্যন্ত। প্রকৃতিকে ভালো লাগার অনুভবের বর্ণনার সঙ্গে কখনো কখনো শীতের কবিতায় সহজাত হয়ে ওঠে কষ্ট আর সংগ্রামের অনুভবও। কবি একাত্মতা প্রকাশ করেন দীর্ঘ শীতের রাতে একাকী জেগে থাকা বৃদ্ধের সাথে, কিংবা উপযুক্ত উত্তাপের বন্দোবস্তে ব্যর্থ মানুষজনের সাথে। রুগ্নতার কথা বিস্মৃত হন না কবি, হিম হিম শীতলতা যেন মৃত্যুর ছায়া হয়ে নড়ে ওঠে কবিতার জানালার ওপাশে। কবির অবচেতনে ক্রমাগত বরফ পড়ে শীতলতর আস্তরণ তৈরি হয়, অথবা কুয়াশা প্রাচীরের মতো ঘিরে রাখে দর্শনীয় সকল কিছুকে, কবি তাঁর প্রতিবাদলিপি লিখতে থাকেন, তাঁর মধ্যে তখন আগুন জ্বলে, সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে অনত্র, যুগে যুগে মানুষের মধ্যে নতুন চেতনার উন্মেষ ঘটে। মেধাবী কবি শুষ্কতা, মৃত্যুর মধ্যে চাষ করেন অমৃতের। শীতের কবিতা সার্থক হয়ে ওঠে তাঁর কলমের শক্তিতে।
গ্রামের মানুষ সন্ধ্যার পর হয়তো কিছুটা সময় আগুন জ্বালিয়ে উষ্ণতার সঞ্চরণ ঘটায় দেহমনে, তারপর সেই স্মৃতি বা আমেজ নিয়ে বিছানায় যায়, লেপ বা কাঁথার আশ্রয়ে ঢোকে। এবং তলিয়ে যায় ঘুমের রাজ্যে। তার জীবন সহজ। সে জানে রাতের ঘুম তার দরকার, কারণ তাকে উঠতে হবে খুব ভোরে—সারাদিনের জন্য রয়েছে তার অজস্র কাজ। কবিরা শীতকে নিয়ে কবিতা লেখেন, সেই কবিতা শব্দের খেলা, তাঁর চিত্রকল্প হয়তো মানুষের মনে বিবিধ ব্যাঞ্জনায় ধরা দেয়—কিন্তু প্রকৃতির নিজের হাতে লেখা কবিতা! সেই কবিতা তুলনাহীন। যার দেখবার চোখ আছে, সুন্দরের রং-রূপ-ঘ্রাণ আস্বাদনের অভ্যাস যার আছে, সে পাঠ করতে পারে সেই কবিতা। অনাদিকাল থেকে এই কবিতার ডালি সাজিয়ে উপস্থিত হয় পৃথিবীর এক-একটি অঞ্চল। আমাদের এই বাংলাদেশ নৈসর্গিক সজ্জায় তুলনাহীনা। গ্রামবাংলায় ছড়িয়ে থাকা শীতের এই কবিতাগুলো খানিকটা পাঠ করা যাক ভাষার সাহায্যে—
কুয়াশায় ঢেকে থাকে গ্রাম, ফসলের ক্ষেত, ছোট্ট নদীটি। এই কুয়াশা যেন শিশিরের আদি মাতা, আবার সে দিগন্তব্যাপী ছড়ানো নিকটজনের ছায়াও যেন। দৃষ্টি ও হূদয় দিয়ে স্পর্শ করতেই হয় তাকে। কুয়াশার কোমল স্পর্শ আমাদের সর্বাঙ্গ ভরিয়ে দিতে থাকে, হূদয়ের গভীর প্রদেশে তাকে আমরা জায়গা করে দিই। কুয়াশায় ঢেকে থাকা কাছে ও দূরের পাহাড় ও বনভূমির দৃশ্যকল্প অসাধারণ। সারারাত আকাশে চাঁদ থাকে, কিংবা কোনো কোনো রাত কৃষ্ণপক্ষের। কুয়াশায় জ্যোত্স্নার মিশে যাওয়ার দৃশ্য অকল্পনীয় সুন্দর। বিশাল মাঠের মধ্যে বা ক্ষেতের পাশে দাঁড়িয়ে থাকলে তার যে রূপ ধরা দেবে, সেই রূপ ভুলবার নয়। কোনো কোনো রাতে কুয়াশা গাঢ় হলে বেশি দূর দেখা যাবে না। কিন্তু যেটুকু দেখা যাবে, তার বর্ণনাই বা কে দিতে পারবে! মনে হতে থাকবে, সমস্ত গ্রাম্য প্রকৃতি প্রেয়সীর মতো ধরা দিয়েছে সেই রূপের মোহনীয়তার কাছে। খেলায় মেতেছে যেন কুয়াশা আর জ্যোত্স্নার কণা। ওরা মিশছে একে-অন্যের ভেতর। অবিরাম, সারারাত মিশতে থাকবে, নৈঃশব্দ্য ছড়িয়ে ছড়িয়ে বাতাসে ভাসবে দুগ্ধধোয়া জলকণা। প্রেমিকার ভেজা ভেজা ঠোঁট আর গভীর কৌতুকময় হূদয়ের মতো, কিংবা বালিকার ভেজা চোখের মতো হয়ে বহু মাইল ছড়িয়ে আছে মমত্ব—এ রকম মনে হবে। আর নৈঃশব্দ্যের সঙ্গে জেগে থাকা রহস্যময়তা কেবলই টানতে থাকবে। মনে হবে মাঠ পেরিয়ে দূরের দিগন্ত পেরিয়ে কোনো এক স্থানে যেতে পারলে কী এক অজানার সাথে ঘটবে মিলন।
যে কবি কিংবা প্রকৃতি নামক কবিতার পাঠক বা প্রেমিক, সে কিন্তু দেখবে নিজের মতো করে। তার সম্মুখে দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছড়ানো আছে মাটির অপরূপ ক্যানভ্যাস। শুকিয়ে যাওয়া বিলের ভেতর নরম মাটির পায়ে চলা পথের রেখা ধরে হেঁটে যেতে যেতে খুব কাছ থেকে দেখে নেওয়া যাবে প্রতিটি ফসলের চারার কেমন অদ্ভুত অদ্ভুত রঙে সেজে ওঠা, সৌন্দর্যের সিংহাসনে বসে থাকার খেলা যেন তাদের। দেখা যাবে রসুন গাছের শরীরজুড়ে রঙের কেমন বর্ণিল বিভাজন। পাওয়া যাবে বিশাল বিশাল সবুজ পাতায় সমৃদ্ধ তামাক ক্ষেত। দেখা যাবে খেসরি-কলাইয়ের সবুজ সমারোহ, তার মধ্যে ফুটে আছে ছোট ছোট নীল ফুল, অসংখ্য, সমস্ত সবুজ লতার শরীর ঘিরে—এসব সুন্দরকে একত্রে একটি ল্যান্ডস্কেপের মতো দেখে নেওয়া যেতে পারে। আবার চাইলে দেখা যেতে পারে খুব কাছ থেকে মাটিতে চোখ ও কান পেতে ইঞ্চি ইঞ্চি করে। এই কাছ থেকে দেখে নেওয়াটা হবে প্রেমিকের মতো। যখন সে প্রেমিকার শরীরকে দেখে নেওয়ার অধিকার ভোগ করে, সমস্তটা সে দেখে নেয়, একটুখানি স্থানও বাদ না দিয়ে সে দেখে নেয় নানা কৌণিক অবস্থান থেকে। এভাবেই দেখতে হবে ভূমির রূপকে। খুঁটে খুঁটে দেখতে হবে। কবি হাঁটবেন, দাঁড়াবেন, আবার হাঁটবেন, চাইলে বসে পড়বেন কিংবা আবেগতাড়িত হয়ে শুয়ে পড়বেন মাটির শরীরকে আলিঙ্গনে বেঁধে। তিনি দেখবেন মৌমাছি, প্রজাপতি ও পাখিদের। দেখা যাবে সমস্তটা জুড়েই বাস করছে সহজ সতেজতা। মাটি ও জলাশয়ের গন্ধভরা শীতল বাতাস, মিষ্টি রৌদ্র, দূরের দিগন্তে পূর্বপুরুষের স্মৃতিময় গ্রামের সবুজ রেখা—সমস্ত কিছু গাঁথা পড়বে এক সুতোয়। ভেতরকার কবিসত্তা জাগ্রত হবে। অতৃপ্ত, দুঃখী মনে হতে থাকবে নিজেকে, আবার একইসঙ্গে হঠাত্ পাওয়া বিপুল বৈভবের অধিকারী সত্তার, অথবা হয়তো কোনো সম্রাটেরই সত্তার পরস্ফুিটন ঘটবে নিজের অচেনা গভীরে।
প্রকৃতি সকল প্রাণীকেই প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে যথাযথ প্রস্তুতি নেওয়ার শিক্ষা দেয়। উপযুক্ত আশ্রয় খুঁজে নেওয়া, একে-অন্যকে আক্ষরিক অর্থেই উষ্ণতার ছোঁয়া দিয়ে, মমত্ব দিয়ে বুকের কাছে রাখার কথাই বলতে চায় শীত। শীতের কবিতাও সে রকমই। শব্দেরা একে-অন্যের সঙ্গে নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ। সে চায় আরও উত্তাপ সঞ্চারিত হোক মানুষের হূদয় থেকে।
