‘তোমার অনামিকায় কামড় দিয়ে আমি হঠাত্ আবার/ ‘যাহ্-কী-দুষ্টু ওষ্ঠে তোমার ওষ্ঠ ছোঁবো সকাল বেলায়/ সূর্যোদয়ের কাছে কেবল শান্তি চাইবো, বুঝলে কনক।/ তোমার মাথা ধরাও আমি এক চুমোতে সারিয়ে দেবো।’ কবি আবুল হাসানের ‘শীতে ভালবাসার পদ্ধতি’ কবিতার এ কটি পঙিক্ত আমার যৌবন-জীবনের শীতে উষ্ণতা জুগিয়েছে ঢের। চুমুতে মাথা ধরা সারে! এই অবাক ভাবনার ভেতরেই কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে চুম্বন ধরেছিলাম কোনো এক অজানা প্রেয়সীর উদ্দেশে। তবে শীতের প্রকৃত বাস্তবতা টের পেয়েছি আরও অনেক আগে, শৈশবের দাঁড়িয়াবান্দা দিনগুলোতে। একবার শীতসন্ধ্যায় চার বন্ধু খেজুরের রস চুরি করতে ফন্দি আঁটলাম। প্রথমে গাছে উঠব আমি। এরপর একে একে বাকিরা। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। প্রতিবেশীর একটি ছোট্ট খেজুর গাছে উঠে পাটকাঠির নল দিয়ে রস খাওয়া শুরু করেছি। তখনই ঘটনাটি ঘটে। ‘পড়বি তো পড় মালির ঘাড়ে’র মতো অবস্থা আমার। গাছি হরেণ কাকাকে আসতে দেখে যে যার মতো দে ছুট! আমি তখনও রসে মত্ত। হঠাত্ নিচে তাকিয়ে দেখি কেউ নেই। ভূতের ভয় তখনও মনের মধ্যে ক্রিয়াশীল। ঘোরসন্ধ্যার অন্ধকারের মধ্যে পরক্ষণেই দেখি, কে একজন গাছের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। আমি গাছটাকে জড়িয়ে ধরে নিজেকে অন্যপাশে আড়াল করতে সক্ষম হলেও ভয়ে শরীরটা কাঁপছিল। এরপর ছায়ামূর্তিটি সরে যেতেই গাছ থেকে এক লাফে নেমে বাড়ির পথে ছুট।
শীতসকালে তরুণ রোদ জানালায় উঁকি দেওয়ার আগেই মা এসে লেপটা সরিয়ে দিতেন। এটা মায়ের দৈনন্দিন কাজ। লেপটা সরিয়ে রাগত স্বরে বলতেন, না উঠলে জল ঢেলে দেব। অগত্যা কী আর করা, আমাদের দু-ভাইকে চোখ কচলাতে কচলাতে সাতসকালে উঠেই পাঠ্যপুস্তকে মনোনিবেশ করতে হতো। অথচ, সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘হে সূর্য! শীতের সূর্য!/ হিমশীতল সুদীর্ঘ রাত তোমার প্রতীক্ষায়/ আমরা থাকি’ কবিতার মতো সূর্যের জন্য অপেক্ষা করলেও খুব একটা ভোরের সূর্যের মুখদর্শন করা হতো না।
শীতকন্যার আগমনে বাড়িতে বাড়িতে পিঠা-পুলি-পায়েসের ধুম পড়ে যেত। নানা শীতের সবজি আর ফটকির পুঁটি মাছের স্বাদটাই ছিল আলাদা। এসময় নদীর জল কমে যাওয়ায় জেলেরা ঘের দিয়ে মাছ ধরত। ঘেরে তারা ব্যবহার করত চান (বাঁশ দিয়ে তৈরি), যার ভেতর দিয়ে ছোট মাছও বেরিয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। জল বেশি থাকতে জেলেরা ভাসমান লম্বা দাম (কলমি গাছ) দিয়ে ঘেরের স্থান নির্বাচন করত। সেখানে পাতাসহ অনেক হিজলশাখা ভিজিয়ে রাখত। এটা জলে পচে মাছের খাবার হয়। এরপর জল কমে এলে একদিন ঘের দিত। আমাদের নদীঘাটের দু-পাশে দুটো ঘের দেওয়া হতো প্রতি শীতে। জেলেদের ঘেরের দাম টেনে ডাঙায় তুলে আমরা মাছ ধরতাম। টেংরা, ফলুই, সরপুঁটি, পুঁটি, বেলে, শোল, ভেদা (রয়না), শিং, কই, পাবদা—ইত্যাদি মাছ, যেগুলো এখন আর দেখা যায় না। একবার শিং মাছের কাঁটায় হাত রক্তাক্ত করে বাড়ি এলাম। কী যন্ত্রণা! মনে হচ্ছে ডান হাতটি অবশ হয়ে আসছে। মায়ের হাতে মার খাওয়ার ভয়ে কাঁদতে পারছি না, আবার চোখের জলও ঠেকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। অবশেষে শারীরিক শাস্তি থেকে রক্ষা পেলেও বকুনি থেকে আর রেহাই মিলল না। ‘পৌষপার্বণে পিঠা খেতে বসে খুশিতে বিষম খেয়ে,/ আরো উল্লাস বাড়িয়াছে মনে মায়ের বকুনি খেয়ে।’ আসলে মায়ের বকুনি না খেলে শীতটা যেন পানসে মনে হতো।
যাহোক, কিশোরবেলার শীতযাপন আর দুষ্টুমি আজও আমি সমার্থক হিসেবে দেখি। বন্ধুদের মধ্যে উচ্চতায় সবচেয়ে ছোট আমি। আবার সমবয়সীদের চেয়ে ইমিডিয়েট বড়দের সাথে চলতে পছন্দ করতাম। এতে সুবিধা-অসুবিধা দুটোই ছিল। তবে বুদ্ধিমত্তা দিয়ে অসুবিধাগুলো দূর করতে সচেষ্ট থাকতাম। আমি একটু একটু বুঝতাম যে, প্রকৃতিই মানবমনের ভাবের সম্প্রসারণে নিয়ামকের ভূমিকা পালন করে। প্রকৃতির সান্নিধ্যে গিয়েই মানুষ নিজেকে আবিষ্কার করতে সমর্থ হয়। প্রকৃতির বিচিত্র উপাদান ও অনুষঙ্গ মানবহূদয়ের গোপন উপলব্ধি প্রকাশে সহায়ক। শীতঋতু এই অনুষঙ্গ নিয়ে হাজির হয় বলে আমার মনে হয়। মনে পড়ে কাজী নজরুল ইসলামের বক্রোক্তি— ‘একি হাড়-ভাঙা শীত এলো মামা।/ যেন সারা গায়ে ঘ’ষে দিচ্ছে ঝামা।/ হইয়া হাড়-গোড় ভাঙা দ’/ ক্যাঙারুর বাচ্চা যেন গো,/ সেঁদিয়ে লেপের পেটে / কাঁপিয়া মরি, ভয়ে থ!’
শহরে বসে শীতের যথার্থতা ঠিকমতো উপলব্ধিতে আসে না। সেই ঠান্ডা জলের মধ্যে মাছ ধরার টান টান উত্তেজনা। শিং মাছের কাঁটা ফুটে কত ক্ষত হয়েছে হাত-পা। বিষকাঁটালী, নীল কচুরির পাতা-ডগা দিয়ে কত ঘষেছি ক্ষতস্থান, মায়ের অগোচরে। গামছার আঁচলে মাছ বেঁধে এনে উঠোনে ছড়িয়ে দিয়েছি। মায়ের চাদরের তলে বসে রামায়ণ শুনে কেঁদে ফেলা। কিংবা মরা লাউয়ের কাণ্ড দিয়ে সিগারেট বানিয়ে চুপি চুপি সুখটানে মগ্ন হওয়া। মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে পিতা-মাতার চোখ ফাঁকি দিয়ে যাত্রা দেখা। ভোরে বাড়ি ফিরে খড়ের গাদায় আগুন জ্বালিয়ে শরীর গরম করা। আবার সন্ধ্যায় গাঁদা, দাঁড়িয়াবান্দা খেলার পর চাষির অজান্তে ক্ষেত থেকে ছোলা, মটরশুঁটি তুলে এনে আগুনে পুড়িয়ে খাওয়ার মজাদার সব স্মৃতি। অন্ধকারে ছোলাপোড়া খেতে গিয়ে কতবার যে ছাগলের বিষ্ঠাদানা মুখে পুরে দিয়েছি, তার ঠিক নেই।
এখন গ্রামে আর ছোলা, মটরশুঁটির চাষ তেমন একটা দেখতে পাই না। শিশু-কিশোরদেরও তেমন চঞ্চলতা চোখে পড়ে না। পিঠা-পুলি তৈরির ধুম নেই বললেই চলে। নদীও মরে গেছে, নেই আগের মতো মত্স্যসম্ভার। দেশি মাছের দেখা মেলা ভার। গ্রাম থেকে উজাড় হয়েছে খেজুর গাছ। হারিয়ে যাচ্ছে ব্রত, পার্বণ ইত্যাদি বাঙালির চিরচেনা ঐতিহ্য। গ্রামে লেগেছে শহরের ছোঁয়া। তবু গ্রামের পথে পথে কুয়াশার কুহক বিছিয়ে শীত আসে, হুল ফুটিয়ে যায় দেহের অনাবৃত অংশে, স্মৃতিতে। আমরা স্মৃতি নিয়ে শীতকীর্তন করি।
