শীতঘুম ও কার্ডিগানের ওম

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০১৩, ১৭:১৩
‘কনক তুমি শীতে এবার কার্ডিগানটা পরো কেমন?’—কী সহজ এই উচ্চারণ কবি আবুল হাসানের! এ যেন হাওয়ায় উড়িয়ে দেওয়া এক টুকরো কুয়াশারুমাল, যে রুমাল নিরুদ্দেশ ঘুরে ঘুরে লহমায় চলে যায় প্রেমিকার কাছে। আর যাতে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা আছে শীতের এক জমাট রসায়ন, যার পঙিক্ততে পঙিক্ততে বিবৃত হয় ‘শীতে ভালোবাসা পদ্ধতি’! এ কথা জেনে এসেছি যে শীতে জীবনযাপনের বিবিধ নিয়ম আছে; সমূহ-কৌশল আছে শীত থেকে সুরক্ষার। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনে এসব লেখা থাকে। ত্বক রক্ষায় রয়েছে হাজারো সানন্দাসলুভ ত্বককাহন, লিপজেলের বিজ্ঞাপনে জেনে নেওয়া যায় ঠোঁটের ঠিকঠাক পরিচর্যা। কিন্তু কবিতায় যদি লেখা হয়ে যায় শীতে ভালোবাসার সমূহ-পদ্ধতি, তখন সেটা কী রকম হয়? এসব নিরীক্ষা আবুল হাসান বহু আগেই, সেই ষাটের দশকেই করে গেছেন, যা তখন কবিতাপ্রেমীদের মুখে মুখে অনেকটা আপ্তবাক্যের মতো উচ্চারিত হতো। ‘কনক তুমি শীতে এবার কার্ডিগানটা পরো কেমন?/ আমাকে তুমি শিখিয়ে দিও লালঝুটো সেই পাখির নামটি?/ কনক আমরা এবার শীতে নদীর তীরে হো হো হাসবো,/ সন্ধেবেলা তোমার চুলে শিশির ভরে রাখবো লক্ষ্মী/ তোমার অনামিকায় কামড় দিয়ে আমি হঠাত্ আবার/ “যাহ-কী-দুষ্টু” ওষ্ঠে তোমার ওষ্ঠ ছোবো সকাল বেলায়/ সূর্যোদয়ের কাছে কেবল শান্তি চাইবো, বুঝলে কনক/ তোমার মাথাধরাও আমি এক চুমোতে সারিয়ে দেবো!’ (শীতে ভালোবাসা পদ্ধতি) আর কবি আবুল হাসান শুধু কার্ডিগানের কথাই বলেননি; প্রেমিকার মাথাধরাও এক চুমোতে সারিয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন! হাসানের এ চুমো যেন এক অমোঘ দাওয়াই, যা শীতে অ্যান্টিসেপ্টিক চুমো ছুঁড়ে দেয় প্রেমিকার ঠোঁটে; প্যারাসিটামল হয়ে যেন জ্বর উঠিয়ে আবার জ্বর নামিয়ে দেয়! তবে আবুল হাসান এই কার্ডিগানমোহ ছাপিয়ে শীতের অন্য কবিতাগুলোতে কুড়িয়ে নিয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন অনুষঙ্গ। তিনি নারীর ভেতরে চাঁদের ভেতরে কুয়াশার ভেতরে ঝিনুকের মতো যোনির ভেতরে সুখ অন্বেষণ করেই ক্ষান্ত হননি, শীতের গলাবন্ধ ও পশমি চাদরে খুঁজে ফিরেছেন শীতকিশোরীর ওম—‘যখন আমরা শীতে গলাবন্ধে পশমী চাদর জড়িয়েছি/ কিশোরীর কামরাঙা কেড়ে নিয়ে দাঁত বসিয়েছি/ সেই সুখ পশমী চাদরে ছিল, কামরাঙা কিশোরীতে ছিল!’ (সেই সুখ) তবে নিসর্গের মৌন সাধক হাসান শুধু কার্ডিগান-চাদর-গলাবন্ধেই আটকে থাকেননি; শীতের পরিযায়ী সৌন্দর্য খুঁজে ফিরেছেন কবিতায়। শুশ্রূষার সবুজ চুম্বনে ধরা দিয়েছেন ইস্পাতিনী নারীর কাছে, করুণকোমল রোদনরূপসী মিসট্রেসের কাছে, সাদা পোশাকের সেবিকার কাছে, পাতাকুড়োনির কাছে, বলে উঠেছেন—‘পাখি হয়ে যায় এ প্রাণ ঐ কুহেলী মাঠের প্রান্তরে হে দেবদূত!’ আর তিনি এক প্রান্তর থেকে ঘুরে ঘুরে অন্য কোনো প্রান্তরে ছুটে বেড়িয়েছেন; শীতরাতে পউষ পাখির গান শুনেছেন জ্যোত্স্নায়, চাঁদের আগুনে সাদা সিগারেট জ্বালিয়ে বসেছিলেন কুয়াশায়, অরণ্যের সবুজ লন্ড্রিতে খুঁজে ফিরেছেন শীতের পোশাক। এ রকম শীতমোহ এখন আমরা আর কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছি না! কোথায় যেন হারিয়ে ফেলেছি শীতঘুম জড়ানো ওম, হারিয়ে ফেলেছি গভীর কুয়াশায় সাইকেলের পোস্টম্যানকে, জংধরা জংশনে বসে থাকা শীতযাত্রীদের, বনভূমিতে সূর্যাস্তের আড়ালে শাল-গজারির পাতাদের, হাসানের কুয়াশাকোমল চুমোগুলোও আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না; লাল কার্ডিগানপরা প্রেমিকাদের পাশেও আমরা আর নদীতীরে হেসে উঠছি না। তরতাজা-সুগন্ধি-টাটকা শিউলি ফুলের মতো চুমোগুলো এ শীতে আর খুঁজে পাচ্ছি না; বরং চতুর্দিকে ভেসে উঠছে ধর্ষকের বৃশ্চিকদংশন, শুধু ভেসে উঠছে কতিপয় ধর্ষকের উন্মাতাল খণ্ডচিত্র, রমরমা মিডিয়ায় দামিনীদের মৃত্যুদৃশ্য আর কিশোরী ধর্ষণের নারকীয় স্ন্যাপ-শট! ক্ষমা করবেন আবুল হাসান, আমরা সেই কবে থেকে ভালোবাসতেই ভুলে গেছি! চুমো খেয়ে মাথাধরা সারিয়ে দেবার মতো প্রেমময় সত্তা এখন শুধু ষাটীয় কবিতাতেই পাওয়া যায়। আমরা এখন আর কেউ শীতসৌন্দর্যে আচ্ছন্ন কোনো প্রেমিকপুরুষ নই; আমাদের শীতগ্রস্ত মুখে ভেসে উঠছে শুধু হন্তারক ও ধর্ষকদের কীটদষ্ট প্রতিচ্ছবি!