[একদিন এক লোক হেঁটে যাচ্ছিল পথ দিয়ে। দুপুর হবারও অনেক আগে লোকটি হেঁটে যাচ্ছিল। যেতে যেতে সে কটি কথা শুনতে পায় এবং বিস্মিত হয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে পড়ে। সে দেখতে পেল একটা পিঁপড়ের বাসা। বাসার ভেতরে-বাইরে বহু পিঁপড়ে। সে যখন তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল এবং তাদের ওপর তার ছায়া পড়ছিল তখন পিঁপড়েরা বলছিল—‘এই দেখো গো, রাত হয়েছে।’ আর যখন ছায়া নিয়ে লোকটি তাদের বাসা পার হয়ে গেছিল, তখন পিঁপড়েরা বলে—‘এই দেখো গো, ভোর হয়ে গেছে।’ এমন অদ্ভুত ব্যাপার দেখে লোকটি চিন্তা করে, মানুষের বা যেকোনো কিছুর ছায়া পড়লেই সেটাকে তাদের রাত নেমেছে বলে মনে হয়েছে। তবে মানুষ যখন মনে করে এখন রাত লেগেছে, তখন নিশ্চয়ই কারও ছায়া পড়ে। বিশাল কিছুর ছায়া যখন পড়ে তখন রাত নামে। রাত নামলেই লোকটা চিন্তা করত, ‘কারও শরীরের ছায়া পড়েছে পৃথিবীর ওপর, এইখানে।’ কদিন পরেই মানুষদের মধ্যে আতাউর নামের এ লোকটা দশ গাঁয়ে আতা পাগলা বলে পরিচিত হয়ে ওঠে। তাকে পাগলা বললে সে ভীষণ রেগে যেত আর যে তাকে পাগল বলত, তার ভুল ভাঙানোর জন্য সে প্রথমে বলত—‘আমি পাগল নই, বিশ্বাস যদি তোমার না হয়, চলো দেখি পিঁপড়েদের বাসার কাছে।’ কোনো কোনো মানুষ মজা পেয়ে তার সাথে পিঁপড়ের বাসার কাছে যেত। পিঁপড়ের বাসায় নিজের ছায়া বা দেখতে যাওয়া লোকটির ছায়া পড়লে পিঁপড়েরা বলে উঠত—‘এই দেখো গো, রাত নেমেছে’। আতা পাগলা এগুলো শুনতে পেত কিন্তু অন্য কেউ শুনতে পেত না। তারা হাসতে হাসতে চলে আসত। আতা বুঝতে পারত না, তারা কেন হাসতে হাসতে চলে যাচ্ছে।]
‘সবাই সুখে থাকতে চায়’—এমন কথা যেমন বিশ্বাস করতে ইচ্ছে নাই একবিন্দু, তেমনভাবে ‘সবাই দুঃখ পছন্দ করে না’—এমন কথাও বিশ্বাস করতে চায় না বেলাল বিল্লাহ। এমন মানুষ কি কেউ আছে, যে কোনোদিন হত্যা করার কথা ভাবেনি অন্য কাউকে বা কোনো খুনিই কি ভালবেসে উদ্ধার করেনি কোনো মানুষকে? কোনো মানুষ কি এমন আছে, যে একবারও নিজকে হত্যার কথা ভাবেনি কোনো কারণেই? পৃথিবীর জন্য গভীর এবং প্রশস্ত ছায়া নিয়ে রাত নামে। মানুষজন ঘরে ঢোকে। নামাজ পড়ার পর ঘুমিয়ে পড়ে কেউ, কেউ কেউ বিভিন্ন আর্থিক হিসাব সেরে বিছানায় যায়। মন চাইলে বউকে পাশ ফেরায়, নইলে ঘুম। প্রকৃতির এত বড় দান, গভীর দান, বিশাল ছায়ার ময়দান রাতকে বছরের পর বছর, জীবনের পর জীবন এভাবেই নষ্ট করে বেশির ভাগ মানুষ। বেলাল বিল্লাহ ছাদের ওপর উঠে বসে আছে, হাঁটছে, কখনো কখনো গুনগুন করছে গান, আবৃত্তি করছে কবিতা। চোখ দিয়ে খুব গভীরভাবে মনোযোগ দিয়ে দেখতে চেষ্টা করছে অন্য বাড়ির ছাদ, বাইরে দূরে নদীর দিকে, চারপাশের বিভিন্ন বৃদ্ধ, তরুণ, শিশু, মৃত, জীবন্ত গাছগুলো। ফিতের মতো পড়ে থাকা রাস্তা। রোডটা বেশ জীবন্ত। সারারাত ট্রাক চলে ২০-২৫ মিনিট পর পর। দূর থেকে ভারী ট্রাকের চাকার জন্তুর মত গোঁ গোঁ শব্দ তুলে চলে আসা মনোযোগ কাড়ে কখনও। ছুরির মতো অন্ধকারের মাংস কেটে এগিয়ে আসে। বেলাল বিল্লাহ সিগারেট জ্বালায়। সিগারেট জিনিসটা একটা মারাত্মক আবিষ্কার মানুষের। ঘুমকে হত্যা করতে পারে সিগারেট, ক্লান্তিকে আর একাকিত্বকে হত্যা করে সিগারেট। টবে থাকা একটা ফুলের মুখে নাক গুঁজে গন্ধ খেয়ে নিল একটু। তারপর পাতাতে সিগারেটের আগুন চেপে ধরে গাছটাকেই প্রশ্ন করে—‘নিশ্চয়ই লাগছে তোমার? ঠিক আছে, তুমি বলছ না। আমিও বলিনি। তুমি কোনোদিন বলবে না জানি, আমিও কোনোদিন বলব না জেনে রেখে দাও। আর মস্তিষ্ক দিয়ে চিন্তা করো। হ্যাঁ, বৃক্ষদের চিন্তা করার ক্ষমতা আছে, মগজ আছে বৃক্ষের শরীরেরই কোনো এক অংশে। মানুষ ভাত খায়, অন্য খাবার খায়। ক্ষিধে লাগে বলে খায়। আর মস্তিষ্কের কারণেই ক্ষিধের বোধ থাকে। মানুষদের, জন্তুদের। বৃক্ষরা খেয়ে বেঁচে থাকে। না খাবার পেলে মরে যায়। অর্থ দাঁড়াচ্ছে—বৃক্ষের ক্ষিধে লাগে; আর অর্থ দাঁড়াচ্ছে—গাছের মস্তিষ্ক আছে।’ বুড়ো সজনে গাছটার দিকে তাকাল সে দার্শনিকের মতো। বুড়ো সজনে গাছটা একটা স্তূপ মাথায় করে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে বলল—‘তুমি চিন্তা করো এই সব কথা, আমাদের পৃথিবীর কথা, আমার কথা, আমাদের কথা। আমি কষ্ট পেয়েছি, যেমনভাবে এই ছোট ফুলের গাছ কষ্ট পেল।’ এরপর ‘আমি ক্ষমা চাইছি’ বলেই সে ফুলের গাছের গোড়া পা ধরার মতো ধরে ক্ষমা চাইল। একটা ছোট ডাল ধরে হ্যান্ডশেক করে, মানুষেরা যেমন শেষে হাত ঝাঁকি দেয়, তেমন করে ঝাঁকি দিয়ে ছেড়ে দিল। একসঙ্গে বেশ কটা ট্রাক আসছে পোর্টের দিক হতে। অন্ধকারগুলো ত্রাসে চোখ বন্ধ করল। রাতের মাংস ছিন্নভিন্ন করে চলে গেল ট্রাকগুলো। নিস্তব্ধতার মতো কাতরে কাতরে ব্যথা দূর হলে আবার আঁধারগুলো সজীব হলো। বেলাল বিল্লাহ খেয়াল করল, রাতের গা অনেকটা ফ্যাকাশে হয়ে আসছে। ভোর হতে অনেক সময় আর নাও লাগতে পারে। হাতঘড়িটার দিকে তাকাল। রেডিয়াম ডায়ালে তিনটা বাজছে মাত্র। তিনটা হচ্ছে রাতের সবচেয়ে চরম সময়। এ সময় মানুষেরা সবচেয়ে বেশি ঘুমায় অথবা সবচেয়ে বেশি জীবন্তভাবে জেগে থাকে। নদীর দিক হতে ন্যাংড়া ফকিরের মতো বাতাস ল্যেংচে ল্যেংচে আসছে। রাতে বাতাস বয়ে যাবার তেমন কোনো প্রয়োজন নাই। তারপরেও বাতাস বয়। কারণ, ফুলের গন্ধগুলো এক ছাদ থেকে অপর ছাদে নিয়ে যেতে হবে। বেলাল বিল্লাহ ঘড়িটা খুলে একটা টবের মাটির গভীরে পুঁতে দিল। তারপর কান পেতে শুনতে চেষ্টা করল, ঘড়িটা চলছে কি না। হ্যাঁ, একটা প্রায় শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে না ঘড়ির না মাটির হূদিপণ্ডের শব্দ, না কি গাছের শেকড়ের স্পন্দন। যা-ই হোক, চিন্তা করার সময় তেমন নাই। কারণ সময়কেই মাটির নিচে পুঁতে ফেলা হয়েছে। এ বৃক্ষের শেকড় শুনুক সোনালি ঘড়ির কাঁটার শব্দ, কাঁটার আঁচড় পাক। ঘড়ির সোনালি কাঁটা আঁচড়ে দেয় বিড়ালের মতো মানুষের শরীর। এবার এ গাছের শেকড় পাক ঘড়ির কাঁটার আঁচড়। তার মনে পড়ে, এক খুনি হত্যা করেছিল বহু মানুষকে, যে মানুষকে হত্যা করত তারই ঘরের ঘড়ি ভেঙে সবচেয়ে তীক্ষ আর বড় কাঁটাটা গলায় বিঁধিয়ে দিয়ে। যার ঘরে ঘড়ি থাকত না, তাকে হত্যা করত না সে। আর খুনিটা তার নিজের মৃত্যুর জন্যেও বেছে নিয়েছিল ঘড়ির কাঁটা। এবার বেলাল বিল্লাহ একটা কবিতা আবৃতি করে—
হূত্কান পাতো—শুনতে পাচ্ছ শব্দ কোনো?
গ্লাস ভাঙার শব্দ
চুরচুর করে ভাঙছে গ্লাস...
দীর্ঘতম এক নিস্তব্ধতার পর তার মনে হলো পৃথিবীতে সবচেয়ে ভালো জায়গা, সুন্দর জায়গা হচ্ছে রাতের ছাদ। একটা সিগারেট হলে ভালো হতো কিন্তু কোনো সিগারেট নেই। হিসাব করেই সিগারেট কেনা হয়েছে। বেশিও খায়নি। সিগারেট নাই। কী হলো সিগারেট! স্থির করল—যতক্ষণ জেগে থাকার কথা, তার চেয়ে বেশিক্ষণ সে জেগে আছে যার অর্থ সিগারেট নাই। সময় সিগারেট খেয়ে ফেলেছে। সময়কে হত্যা করা যায় না। বা সময়কে দুধের মতো হাঁড়িতে চাপিয়ে তাপ দিয়ে ঘনও করা যায় না। সুতরাং খালি সিগারেটের প্যাকেটটা নিচে চালিয়ে ফেলল। থপ করে শব্দ হলো, কোন মহাতলে চলে গেল খালি সিগারেটের প্যাকেট। নিচে মকসুদা শুয়ে আছে খাটে। ঘুম যায়নি কিন্তু ভাবখানা—ঘুমের ভেতর সে মৃত্যু ডেকেছে প্রাণে। শুয়োরটা আসবে আর কখন? এতক্ষণ অপেক্ষা সওয়া যায় না। এবার সে একটা গোলাপফুল তুলে আনল, কয়েকটা পাপড়ি খুলে চিবিয়ে দেখল আর গিলে দেখল। ‘এমন সুন্দর গোলাপফুল কিন্তু স্বাদ একটুও ভালো না’—অস্ফুটভাবে উচ্চারণ করল। একটা ইঁদুরের বাচ্চা দৌড়ে গেল পাশ দিয়ে। এক ঝাঁক টাটকা বাতাস তার কাছাকাছি এসে আর এগোল না। তার মনে হলো, তার শরীর থেকে ঠিক আধহাত দূরে রয়েছে বাতাসের ঝাঁকটা, স্ট্যাচু হয়ে। বাতাসটা তার জন্য এখন প্রয়োজন কিন্তু তার থেকে মাত্র আধহাত দূরেই মূর্তি হয়ে থেকে গেল। তার ভীষণ গরম লাগছে। হাত দিয়ে নেড়ে বাতাসের গায়ে গতি দেবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। ‘বাতাস অজ্ঞান হয়ে গেছে’ এমন ভেবে সে জগ থেকে পানি ছুঁড়তে যাবে এমন সময় একটা খরগোশের বাচ্চা আসে আর বলে—‘একটা শুয়োর এসেছে এই পৃথিবীর ভেতর।’ সে নিচের দিকে তাকায়। হ্যাঁ, এসেছে একটা শুয়োর। এই যে দরজার কাছে চলে এসেছে, মকসুদার ঘরের দরজার কাছে। ছাদ থেকে নেমে বেলাল বিল্লাহ দরজার কাছে চলে এল। নামার সময় শুনতে পেল বৃদ্ধ শজনে গাছটা হো হো করে হেসে উঠল। পিস্তলটা পকেট থেকে বের করে টার্গেট ঠিক করছে, মকসুদা এসে ধস্তাধস্তি শুরু করল—‘না, তুমি হত্যা করতে পারো না।’ জোরাজোরির মধ্যেই ট্রিগারে চাপ পড়ল। গুলিবিদ্ধ হবার পর সে বুঝতে পারল ছাদ-টাদ কিছু না, সে নিজেকেই গুলি করেছে স্বপ্নের ভেতর। তার দেখা স্বপ্নটা, তার নিজের স্বপ্নটাও হো হো করে হেসে উঠল। রক্তগুলো হাসতে হাসতে দরজার দিকে যেন মুক্তির আনন্দে গড়িয়ে যেতে লাগল।
মকসুদা বাবার বাড়ি থেকে যখন ফিরে এল, ততক্ষণে পুলিশের লোকজন দরজা ভেঙে গুলিবিদ্ধ বেলাল বিল্লাহর শরীর বের করছে। আর খাতায় লিখে নিল—‘আত্মহত্যা; কারণ অজ্ঞাত।’ মকসুদা কাঁদছে, অঝোরে কাঁদছে!
