ছয় মাস বয়সে বাবা এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যায় না ফেরার দেশে। তখন কিছু বুঝতাম না। শুধুই কাঁদতে জানতাম। তবে নানা বলতো তখন আমি নাকি সবার অজান্তেই অনেক কেঁদেছিলাম। মায়ের বুকে মাথা রেখে যখন আমি কাঁদছিলাম তখন পাশের বাড়ির খালা এসে আমায় কোলে তুলে নিয়ে বলেছিল, একদিন আমি অনেক বড় মাস্টার হব। যেদিন মায়ের আর কোন অভাব থাকবে না। এভাবেই নানার মুখে শোনা কথাগুলো বলছিলেন আব্দুর রহিম।
আমি নাকি সবার থেকে একটু বেশি পারতাম, তাই মায়ের কথা শুনে নানা গিয়ে সোজা হাজী দানেশ এতিমখানা ও পাঠাগারে ‘ক্লাস টু’-তে ভর্তি করে দেয়। শুরু হয় আমার পড়া। চলতে থাকে দুবেলা খেয়ে পরে আনন্দ নিয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা। তবে এতিমখানায় পেট পুরে খাওয়া হতো না কোনদিন। তবু ক্লাসে কখনো প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় হয়নি। এভাবেই পার হয়ে যায় এসএসসি পর্যন্ত। সেখানে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ২০০২ সালে ৩ পয়েন্ট সাত তিন পেয়ে তিনি এসএসসি পাস করেন।
বাড়ির পাশের গ্রামের এক কলেজ থেকে এইচএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগে ২০০৪ সালে ৪ পয়েন্ট ৪ পেয়ে যাই। এইচএসসি পাসের পর আমাকে নিয়ে বিপাকে পড়তে হয় সবাইকে। ইচ্ছা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। কিন্তু কোচিং করতে যে টাকা লাগতো তা আমাদের ছিল না। তাই কোচিং না করেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য পরীক্ষা দেই বলছিলেন রহিম।
২০০৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব ও খনি বিদ্যা বিভাগে পড়ার সুযোগ হয় আমার। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর স্যার খুঁজে দেন টিউশনি। টিউশনি করে ভালোভাবেই চলে যাচ্ছিল সময়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে একটা ইচ্ছা ছিল বড় হয়ে একদিন মায়ের গলায় ‘গোল্ড মেডেল’ দেব। পূরণও হয়েছে। নবাব আব্দুল লতিব হলের সমাপনিতে আমার মাকে নিয়ে এসেছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপস্থিতিতে আমাকে যখন মেডেল দেয়া হয়েছিল তখন ভেবেছিলাম আমার স্বপ্ন আজ পূণ হলো। কারণ ওই মেডেল মায়ের গলায় পরিয়ে দিতে পেরেছিলাম।
তবে প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষে আমি বিভাগে দ্বিতীয় ছিলাম। তখন নানা বলেছিলেন, ‘রহিম তো জীবনে কোনদিন প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় হয়নি। তাহলে এখন কেন সে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে দ্বিতীয় বা তৃতীয় হবে?’ নানার প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে এসে গিয়েছিল তৃতীয় বর্ষে। এ বছর ১২৯ নম্বর লিড রেখেই প্রথম স্থানে বিভাগে প্রথম হই আমি। তখন মনে হচ্ছিল যে, বিভাগ বা হল থেকে মেডেল নিয়ে মায়ের গলায় দিতে পারবো।
সেই উচ্ছ্বাস নিয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে প্রথম স্থান হওয়ার ভাগ্য হয়েছিল তার। বিভাগে প্রথম হওয়ার পাশাপাশি জীব ও ভূ-বিজ্ঞান অনুষদেও তিনিই প্রথম হয়েছিলেন। সাথে এনে দিয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে ‘গোল্ড মেডেল’। ২০১২ সালের ৩ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে হাতে নিয়েছিলাম সেই ‘গোল্ড মেডেল’। ওইদিনও মায়ের ইচ্ছা পূর্ণ হয়েছিল পুরাদমে।
আব্দুর রহিম বর্তমানে শহীদ ক্যাপ্টেন মনসুর আলী সরণী কাকরাইলে কর্মজীবনে আছেন। মায়ের নাম রহিমা খাতুন। টেনা গ্রামের বোসাগঞ্জ উপজেলার দিনাজপুরে জন্ম তার। তিনি এখন জুনিয়র হাইড্রোলজিস্ট হিসাবে মাটি ও পানির নমুনা নিয়ে কাজ করছেন। তবে তার ইচ্ছা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার। মায়ের ইচ্ছাও তাই।
