আমাদের আনন্দমেলা

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০১৩, ১৭:১৬
বইমেলার ঐতিহ্য এখন অনেক দেশেই গড়ে উঠেছে; কিন্তু প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলা একাডেমীতে অনুষ্ঠিত বইমেলার আবেগ ও চেতনা সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের। বাংলাদেশের বাঙালিদের ভাষা ও সাংস্কৃতিক চেতনার সঙ্গে এই মেলার ঐতিহ্য মিলেমিশে এক হয়ে গেছে। পদ্মা-মেঘনা-যমুনার মতো আমাদের চেতনার অন্তঃস্রোত থেকে প্রবাহিত শত শত নদীপ্রবাহ যেন এখানে এসে স্থির হয়ে গেছে। একুশের শহীদের স্মরণে আয়োজিত এই বইমেলা আমাদের সাংস্কৃতিক জাতীয়তার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। প্রতিবছর এই মেলাকে কেন্দ্র করে সাহিত্যসাধক, সংস্কৃতিপ্রেমী ও বইপ্রেমিকদের ঢল নামে বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে। গত তিন দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের সাহিত্যের প্রবহমান ধারাকে ধারণ করে আছে এই বইমেলা। সারাবছর ধরে কবি-সাহিত্যিক, পাঠক ও প্রকাশকেরা অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করেন¬—কবে এই বইমেলা বসবে। বেশিরভাগ বইমেলার পেছনে যে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য থাকে, বাংলা একাডেমীর ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ ঠিক তেমনটি নয়। এখানে বইবিক্রির বাণিজ্য হয়তো আছে; তবে সেইসঙ্গে আছে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি একটি আলাদা আবেগ এবং মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার গৌরব। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসে একুশের বইমেলায় সমবেত হয়ে আমরা টের পাই, এ শুধু বিকিকিনির মেলা নয়— এ রীতিমতো উত্সব; আমাদের সব ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উত্সবের পাশাপাশি সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক এক উত্সব। মাঘ-ফাল্গুনজুড়ে এই উত্সব—শীত ও বসন্তের আনন্দমেলা। সারাবছর ধরে বাঙালি সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মননশীলতার যে চর্চা হয়, তারই একটি হিসাব মেলানোর পালা জমে ওঠে বইমেলায়। লেখক-কবিরা যার যার কবিতা, গল্প, উপন্যাস আর প্রবন্ধের পাণ্ডুলিপি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন মেলার কয়েক মাস আগে থেকে। প্রকাশকদের ব্যস্ততার সীমা থাকে না, আর ব্যস্ততা ছাপাখানায়। শিল্পীরা নিত্য-নতুন প্রচ্ছদের পরিকল্পনা করেন। বাইন্ডাররা নতুন বই বাঁধাই করতে প্রস্তুত হন। গত শতাব্দীর আশির দশকের শুরু থেকে এক নিয়মিত চিত্র বাংলা একাডেমী বইমেলাকে ঘিরে। এই সুদীর্ঘ সময়ে কত তরুণ লেখক জীবনের পথপরিক্রমায় প্রবীণ হলেন; কত প্রবীণ লেখক পরপারে পাড়ি দিলেন—সবই আমাদের চোখের সামনে। সত্তর দশকের একজন কবি হিসেবে তুলনামূলকভাবে আমার বই বেরিয়েছিল কিছুটা দেরিতে—১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে। নিজের বই নিয়ে অনিন্দ্য প্রকাশনীর স্টলে বসে থাকতাম বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত। সে সময় আমাদের প্রায় সব প্রবীণ লেখকই জীবিত। শওকত ওসমান, আবু রুশদ, রশীদ করিম, শামসুর রাহমান প্রমুখ লেখক নিয়মিত বইমেলায় আসতেন। ১৯৮৬ সালে একুশের বইমেলায় এসেছিল হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস ‘এইসব দিনরাত্রি’। সম্ভবত সে বছর থেকে বই যে কতখানি বাণিজ্যিক উপকরণ হতে পারে, সেই বোধের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল বাংলাদেশের পাঠক। কবিদের মধ্যে শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ বা মহাদেব সাহার বইয়ের কাটতি ছিল সবচেয়ে বেশি। তবে একবার হঠাত্ করে কবি হেলাল হাফিজ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ নামে একটি কবিতার বই প্রকাশ করে কাটতি ও জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। বাংলা একাডেমীর বইমেলা লেখকদের জীবনের অনেক আনন্দবেদনা এবং উত্থান-পতনের সঙ্গী। একদিন মনে আছে, বইমেলায় একপাশে দু-তিনজন জনপ্রিয় লেখকের বই দেদারসে বিক্রি হচ্ছে; পাঠক দল বেঁধে লুটোপুটি করে সেসব বই কিনছেন। মাঠের অন্য পাশে দেখলাম, আমাদের দুজন কৃতী লেখক শওকত আলী ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াস মুখভরা ঔদার্যের হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন দু-একজন ভক্ত নিয়ে। এখন সশরীরে অনেকেই আমাদের মাঝে অনুপস্থিত। তবে এঁদের লেখা বই বলে দেবে, সময়ের বিচারে কারা স্থায়ী হবেন। সাহিত্যের বহমান ধারাকে ধারণ করে আছে একুশের বইমেলা। তবে লক্ষ রাখতে হবে, বই-ব্যবসায়ীদের লোভের কাছে আমদের প্রেম ও ঐতিহ্য যেন পরাজিত না হয়। একুশের গ্রন্থমেলাকে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা এখন পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। কিন্তু ঢাকা শহর ও বাংলাদেশের বর্তমান আর্থসামাজিক বাস্তবতার কথা সবাইকে গুরুত্বসহকারে ভাবতে হবে। ১৯৮৩ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ২০ থেকে ৩০ লক্ষ; বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় দেড় কোটি। শিক্ষিতের সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে। তাই অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে, ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ আরও সম্প্রসারণের মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্থানান্তর সম্ভব কি? বাংলা একাডেমী আমাদের জাতীয় মননশীলতার প্রতীক। একাডেমীর মূল ঐতিহাসিক ভবন ‘বর্ধমান হাউসে’ ইতিমধ্যে বাঙালি জাতির ভাষা সাহিত্য ও লেখক জাদুঘর স্থাপিত হয়েছে। এসব কিছুই সংরক্ষণ করতে হবে আমাদের ‘ডিজিটাল আগামী প্রজন্মের’ জন্য। বাংলা একাডেমীর বটতলার নজরুল মঞ্চ, ভাষা শহীদ কর্নার, বহেরাতলার লিটলম্যাগ চত্বর কিংবা বহু স্মৃতিবিজড়িত পদ্মপুকুর এখন বাঙালির ভাষাভিত্তিক সংস্কৃতির অন্যতম প্রেরণা। এর সঙ্গে শীতের শিশিরে ভেজা আমাদের প্রেম-ভালোবাসা গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। ১৯৮৪ সালে বাংলা একাডেমী বইমেলায় যে আশ্চর্য লাবণ্যময়ীকে দেখেছিলাম, সে এখন প্রৌঢ়া। কিন্তু বাংলা একাডেমীর বইমেলার তারুণ্য কোনোদিন ম্লান হবে না; বরং তা ক্রমেই উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে ধরা দেবে বাঙালির মনের মনিকোঠায়।