বইমেলা দেশে বিদেশে

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০১৩, ১৭:১৬
শুরু হয়ে গেল অমর একুশে গ্রন্থমেলা। চারিদিকে শুধু বই বই রব। কাগুজে পাতায় কালো কালো অক্ষরে লেখা জীবনের গল্প বা ইতিহাসে ছেয়ে যাবে বাংলা একাডেমী চত্বর। সাধারণত বাংলাদেশে শুধু ফেব্রুয়ারি মাস এলেই বইমেলা আর বই নিয়ে উদ্গ্রীব হয়ে ওঠেন পাঠকেরা। অন্যান্য বইমেলার প্রতি তেমন একটা আগ্রহ নেই পাঠকদের। কিংবা কখনো প্রচার-প্রচারণার অভাবে অন্যান্য বইমেলার খবর পাঠকদের কাছে পৌঁছায় না। খোদ বাংলাদেশেই বছরে চার থেকে পাঁচটি বইমেলা হয়। ঢাকা আন্তর্জাতিক বইমেলা, হেমন্তের বইমেলা, বর্ষার বইমেলা ছাড়াও বছরে গোটা পাঁচেক বইমেলা হয়ে থাকে। ঢাকা আন্তর্জাতিক বইমেলা :স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম আন্তর্জাতিক বইমেলার আয়োজক ছিল দেশটির জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, এবং সেই মেলা অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭২সালের ২০ ডিসেম্বর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে। বাংলাদেশের প্রকাশনাসংস্থা ছাড়াও আটটি দেশের প্রকাশনাসংস্থা অংশ নিয়েছিল সেই মেলায়। তবে বর্তমানে ঢাকা আন্তর্জাতিক বইমেলা নামের যে আসরটি আয়োজিত হয়, সেটি শুরু হয় ১৯৯৫ সাল থেকে। তখন থেকে ঢাকা বইমেলা নামে এই মেলা আয়োজিত হয় ১৪ বার। ২০০৮ সাল থেকে বর্ধিত পরিসরে ঢাকা আন্তর্জাতিক বইমেলা নামে এই মেলার আয়োজন চলছে। ডিসেম্বর মাসের এক তারিখ থেকে মাসব্যাপী এই মেলা চলে। অন্যান্য দেশের মধ্য থেকে ইরান, ভারত, পাকিস্তান ও চীনসহ বেশ কয়েকটি দেশ এই মেলায় অংশ গ্রহণ করে আসছে। হেমন্তের বইমেলা:বছরের প্রতিটা ঋতুতে পাঠকের হাতে পৌঁছে যাক বই—এমন প্রত্যাশায় আয়োজন করা হয় হেমন্তের বইমেলা। ২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি, শাহবাগ শাখা ও শাহবাগের বইপাড়া সংঘ যৌথভাবে এ মেলার আয়োজন করে আসছে। শাহবাগের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের মূল মিলনায়তনের সামনের উন্মুক্ত চত্বরে এই মেলার অনুষ্ঠিত হয়। হেমন্তের যেকোনো এক বিকেলে ১০-১৫ দিনের জন্য বইয়ের জগতের দ্বার উন্মুক্ত করে দেন প্রকাশকেরা। ২০১২ সালে এই মেলায় ৩৯টি প্রকাশনাসংস্থা অংশ নিয়েছিল। মেলাকর্তৃপক্ষ আশা করে, বাংলা একাডেমী আয়োজিত অমর একুশে গ্রন্থমেলার মতো এই মেলাও একদিন লেখক-পাঠকদের কাছে সমাদৃত হবে। হেমন্তের একটি দিনও কাটবে না বই ছাড়া। বর্ষার বইমেলা: কাঁটাবনের কনকর্ড অ্যাম্পোরিয়ামের নিচে ২০০৯ সাল থেকে আয়োজিত হয়ে আসছে বর্ষার বইমেলা। ১ আগস্ট থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত ১০ দিনব্যাপী মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। প্রতিবছর অর্ধশতাধিক প্রকাশনী মেলায় অংশ নেয়। শুধু বইমেলা নয়, মেলায় আগতদের জন্য বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনও করে থাকে আয়োজক কমিটি। বাইরে মুষলধারা বৃষ্টি আর কনকর্ড অ্যাম্পোরিয়ামের নিচে বইয়ের সমাহার। এই বর্ষাও কাটুক বই আর সৃজনশীলতার সঙ্গে; তাই এই মেলা। বন্দরনগর চট্টগ্রামও বইমেলার আয়োজন থেকে পিছিয়ে নেই। প্রতিবছর মার্চ মাসে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় চট্টগ্রাম বইমেলা। মুসলিম হল প্রাঙ্গণ বা ডিসি হিলে আয়োজন করা হয় এই মেলার। কলকাতা বইমেলা: ভারতের কলকাতায় আয়োজিত কলিকাতা পুস্তকমেলা সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাংলা বইয়ের মেলা। এই মেলাটি কলকাতা বইমেলা নামেই অধিক পরিচিত। ১৯৭৬ সালে শুরু হওয়া এই বইমেলা ১৯৮৪ সালে আন্তর্জাতিক বইমেলার স্বীকৃতি অর্জন করে। প্রতিবছর জানুয়ারি মাসের শেষ বুধবার বারো দিনব্যাপী এই বইমেলার আয়োজন করা হয়। এই বইমেলাকে ‘বাঙালির চতুর্দশ পার্বণ’ বলে অভিহিত করা হয়। কলকাতা বইমেলা আন্তর্জাতিক বইমেলা হলেও মেলার সিংহভাগ জুড়ে বাংলা বইয়ের আধিপত্যই বেশি। তবে প্রচুর ইংরেজি গ্রন্থপ্রকাশক ও বিক্রেতা এই মেলায় অংশগ্রহণ করেন। এ ছাড়া হিন্দি, উর্দু, সংস্কৃত ইত্যাদি অন্যান্য ভারতীয় ভাষার বইও এ মেলায় পাওয়া যায়। এ ছাড়া ২০০৫ সাল থেকে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার আদলে প্রতিবছর মেলায় অংশগ্রহণকারী একটি বিদেশি রাষ্ট্র ‘ফোকাল থিম’ ও অপর একটি রাষ্ট্র ‘সম্মানিত অতিথি রাষ্ট্র’ নির্বাচিত হয়। ২০১৩ সালের কলকাতার থিম কান্ট্রি নির্বাচিত হয়েছে বাংলাদেশ। কলকাতা বইমেলায় বই ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে আয়োজিত হয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান, সেমিনার, পদযাত্রা, প্রতিযোগিতা ও গ্রন্থপ্রকাশ অনুষ্ঠান। এই মেলার সাফল্যে উজ্জীবিত হয়ে পশ্চিমবঙ্গে ও পশ্চিমবঙ্গের বাইরেও ভারতের অন্যান্য স্থানে বাংলা বইয়ের মেলা চালু হয়েছে। গোটা ভারতে বাংলা বই ছড়িয়ে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকেই আয়োজিত হচ্ছে কলকাতা বইমেলা। আগরতলা বইমেলা:বাংলা বইয়ের আরেকটি জম্পেশ বইমেলা হয়ে থাকে ভারতের ত্রিপুরার আগরতলায়। বহু বছরের ঐতিহ্যবাহী এই বইমেলায় প্রতিবছরই বাংলাদেশি প্রকাশকেরা অংশ নিয়ে থাকেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মার্চ এই মেলা প্রথম শুরু হয়েছিল; প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ বা মার্চ মাসে হয়ে থাকে। মেলাটি আগরতলা শিশু-উদ্যানে অনুষ্ঠিত হয়। কলকাতার অত্যন্ত সমাদৃত মেলা আন্তর্জাতিক কলিকাতা পুস্তকমেলার মতোই আগরতলা বইমেলা ত্রিপুরাতে খুব জনপ্রিয়। ১৯৮১ সালে আগরতলা বইমেলা সরকারিভাবে শুরু হলেও অনেকের মতে ১৯৬১ সালে বিলোনীয়া বিদ্যাপীঠ স্কুলের মাঠে প্রথম এই বইমেলার আযোজন হয়েছিল। ১৯৬৪ সালে সোনামুড়া এন সি ইনস্টিটিউশনে এই বইমেলার আযোজন করা হয়, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বই বিক্রয়ের জন্য একটি স্টলের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তা ছাড়া ১৯৭৮ সালে বিশ্ব যুব উত্সব উপলক্ষে কয়েকটি স্টলের মাধ্যমে ক্ষুদ্র বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৮১ সালের ৩০ মার্চ সরকারি সহায়তায় রবীন্দ্রশতবার্ষিকী ভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই মেলার উদ্বোধন করা হয়। ফ্রাংকফুর্ট বইমেলা:বই কোনো নির্দিষ্ট দেশের নয়, কোনো নির্দিষ্ট ভাষার নয়; বই সবার। এই বিশ্বাসে বিশ্বাসী হয়ে প্রতিবছর জার্মানির ফ্রাংকফুর্টে আয়োজিত হয় ফ্রাংকফুর্ট বইমেলা। এই বইমেলার ইতিহাস প্রায় ৫০০ বছরের। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় বইমেলা। প্রতিবছর অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়ে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। মেলায় একশটির বেশি দেশ থেকে প্রায় ১৫ হাজার প্রকাশক অংশ নেন মাত্র পাঁচ দিনের এই মেলায়। আয়োজক কমিটি শুধু বই বিক্রির জন্যই মেলার আয়োজন করে না। নানা উত্সব, আলোচনা, প্রকাশনাবিষয়ক চুক্তিও হয়ে থাকে মেলায়। বিভিন্ন দেশের লেখক ও প্রকাশকেরা বিশ্বের অন্য দেশের লেখক ও প্রকাশকদের সঙ্গে এই মেলাতেই বই নিয়ে চুক্তিবদ্ধ হন।শুধু সৃজনশীল বই নয়, পাঠ্যপুস্তক বা গবেষণাগ্রন্থ থেকে হেন কোনো বই নেই, এই মেলায় পাওয়া যাবে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফ্রাংকফুর্ট মেলার ভাবধারাও পাল্টাচ্ছে। যেহেতু গোটা বিশ্বে প্রযুক্তিগত আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে, তাই ২০১২ সালের বইমেলায় প্রযুক্তির সমাহার ছিল। ই-বুক, বিভিন্ন কোম্পানির বুকরিডারসহ নানা ধরনের অ্যাপ্লিকেশনের প্রদর্শনীও ছিল। ছাপার অক্ষরে মলাটে বাঁধা বইয়ের পাশাপাশি কিন্ডলের বুকভার্শনও ছিল। লন্ডন বইমেলা:ফ্রাংকফুর্টের পরই আন্তর্জাতিক মহলে সমাদৃত ও সর্বাধিক পরিচিত বইমেলার নাম লন্ডন বুকফেয়ার বা লন্ডন বইমেলা। ব্রিটেনের রাজধানী লন্ডনের এই মেলাকে বইমেলা না বলে পুস্তকবিষয়ক বাণিজ্যমেলা বললেই সবচেয়ে ভালো হয়। কারণ পাঠকেরা মেলায় এসে বই কিনবে—এমন কোনো ধারণা থেকে এই মেলা আয়োজিত হয় না। বরং বিশ্বের সব দেশে কী করে ভালো বই ছড়িয়ে দেওয়া যায়, সেই নীতি নির্ধারণ করতেই বিশ্বের দেড় শতাধিক দেশের ২০ হাজারেরও বেশি প্রকাশক, গ্রন্থবিক্রেতা, লিটারারি এজেন্ট, গ্রন্থাগারিক, গণমাধ্যম ও শিল্প সরবরাহকারী এই মেলায় অংশ নেন। প্রকাশকেরা লন্ডনে এসে তাঁদের প্রকাশিতব্য বইয়ের প্রচার চালান এবং অন্যান্য প্রকাশনী থেকে বইয়ের পরিবেশনা ও অনুবাদ-স্বত্ব কেনেন। ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার তুলনায় লন্ডন বইমেলায় জনসাধারণের ভূমিকা কমই থাকে। ২০০৬ সালের আগে এই মেলাটি আয়োজিত হতো লন্ডনের অলিম্পিয়া প্রদর্শনী কেন্দ্রে। কিন্তু সে বছর থেকে এটি লন্ডন ডকল্যান্ডের এক্সেল প্রদর্শনী কেন্দ্রে স্থানান্তরিত হয়। তবে মেলার দর্শকেরা নতুন স্থানের ব্যাপারে আপত্তি জানালে ২০০৭ সালে পশ্চিম লন্ডনের আর্লস কাউন্ট প্রদর্শনী কেন্দ্রে এটি অনুষ্ঠিত হয়। এর পর থেকে এখানেই লন্ডন বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এককথায় বলা যায়, এটি একটি বৃহত্ গ্রন্থপ্রকাশন-সংক্রান্ত বাণিজ্যমেলা। কায়রো আন্তর্জাতিক বইমেলা:আরবি ভাষার সবচেয়ে বড় বইমেলা অনুষ্ঠিত হয় মিসরের রাজধানী কায়রোতে। মিসরের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আয়োজিত এই বইমেলা শুধু আরবি ভাষা নয়, ইসলামি সাহিত্যের সবচেয়ে বড় বইমেলা। প্রতিবছর জানুয়ারির শেষ দিকে শুরু হয়ে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বইমেলাটি চলে। প্রায় এক হাজার আরবি ভাষার প্রকাশনী এই মেলায় অংশ নেয়। ১৯৬৯ সাল থেকে মিসরের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এই মেলার আয়োজন করে আসছে। এই মেলার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণ। মেলাচত্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনাবিষয়ক স্টল থাকে। এ ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এর মধ্যে মিয়ামি, ম্যানিলা, দুবাই আন্তর্জাতিক বইমেলা উল্লেখযোগ্য।